প্রকাশিত : ০৯:৩৪
১৮ আগষ্ট ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলা রানী দেবকে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বিদায় জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। সোমবার ( ১৭ আগস্ট) বিকেলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই ব্যতিক্রমী বিদায়যাত্রায় সামনে ও পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের বহর। সঙ্গে ছিল শিক্ষার্থীদের শোভাযাত্রা। প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর নন্দীউড়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁকে।
প্রায় চার দশক আগে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বেলা রানী দেব, কর্মজীবনের পুরো সময়টাই কেটেছে সেখানেই। ১৯৮৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর ৩৯ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি পড়িয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীর হাতেখড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে প্রিয় শিক্ষিকাকে স্মরণীয় বিদায় দিতে তাই ব্যতিক্রমী এই আয়োজন করেন তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘলা। দুপুরে শুরু হয় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টি। বিদ্যালয়ের সবুজ মাঠ বৃষ্টির পানিতে কাদায় থকথকে হয়ে গেলেও থামেনি আয়োজন। পানি সরাতে নালা কাটা থেকে শুরু করে নানা ব্যবস্থা করেন আয়োজকেরা। প্যান্ডেলের নিচে সাজানো হয় চেয়ার, তৈরি করা হয় মঞ্চ। আর বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের কাছেই রাখা হয় সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িটি।
একপর্যায়ে বিদ্যালয়ে এসে পৌঁছান বেলা রানী দেব। তাঁকে দেখেই ছুটে আসেন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কেউ জড়িয়ে ধরেন, কেউ সালাম দেন। নারী অভিভাবকদের অনেকে তাঁকে আলিঙ্গন করেন। বিদায়ের অনুষ্ঠান হলেও মুহূর্তটি হয়ে ওঠে আনন্দ ও আবেগে ভরা।
ফুল, উপহার আর স্মৃতিচারণ
বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী ও অতিথিরা যোগ দেন আয়োজনে। স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরাঙ্গ চন্দ্র ধরের সভাপতিত্বে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল শিকদার, বিশেষ অতিথি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জলিল তালুকদার, উপজেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক মো. রেজওয়ানুল হক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লেখক মহিদুর রহমান এবং অন্যতম আয়োজক তুহিন জুবায়ের।
অনুষ্ঠানে বেলা রানী দেবকে ফুল ও নানা উপহার দেওয়া হয়। শেষ দিকে শিশুশিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি পড়ে যায়। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে ফুলের মালা, আবার কারও হাতে ছোট-বড় রঙিন বাক্স। দল বেঁধে কিংবা একা এসে তারা প্রিয় শিক্ষিকার হাতে উপহার তুলে দেয়। সহকর্মী ও অভিভাবকেরাও তাঁকে উপহার দেন।
‘ভালো শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা মনে রাখে’
প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লেখক মহিদুর রহমান বলেন, ‘ভালো শিক্ষকের নির্দেশক (ইন্ডিকেটর) হচ্ছেন তাঁর শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষক পাওয়া যায়, কিন্তু মনে থাকে এক-দুজনকে। শিক্ষার্থীরা ওই এক-দুজনকেই স্মরণ করেন। বেলা রানী দেব তাঁর কাজ দিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মনে জায়গা করে নিয়েছেন।’
সংবর্ধনার অন্যতম আয়োজক এবং বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী তুহিন জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তাঁকে দিদিমণি ডাকি। আমরা তাঁর কাছে পড়েছি, আমাদের সিনিয়ররা পড়েছেন। শৈশব থেকেই তাঁকে দেখে আসছি। এত দিন বিদ্যালয়ে শিক্ষা দিয়েছেন, আমরা আমাদের দায় থেকে এই আয়োজন করেছি। তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো কর্তব্য মনে করেছি। আমাদের চেষ্টা ছিল এমন কিছু করা, যাতে অবসর সময়ে এই স্মৃতিটুকু মনে করে তিনি আনন্দ পান, ভালো থাকেন।’
বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং রাজনগর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহনা আক্তার, মেহজাবীন আক্তার ও জান্নাত আক্তারও এসেছিল প্রিয় শিক্ষিকাকে বিদায় জানাতে। তারা জানায়, বেলা রানী দেব খুব আনন্দ দিয়ে পড়াতেন। পাঠ্যসূচির বাইরেও জ্ঞান অর্জনের জন্য নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি।
‘এই স্কুলটা আমার বাড়ির মতো’
বেলা রানী দেবের বাড়ি বিদ্যালয় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে উত্তর নন্দীউড়া গ্রামে। তাঁর স্বামী রবীন্দ্র লাল দেব সরকারি চাকরি করতেন। তিনি মারা গেছেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। মেয়ে এখন মায়ের সেই বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
একই বিদ্যালয়ে ৩৯ বছরের বেশি সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বেলা রানী দেব বলেন, ‘আমার অনেক ছাত্রছাত্রী দেশে-বিদেশে। তারা যে আমাকে এতটা ভালোবাসে, এত আন্তরিক—এটা আমি আগে বুঝিনি। এই স্কুলটা আমার বাড়ির মতো, পরিবারের মতো।’
একটু থেমে তিনি বলেন, ‘এই স্কুলের শুরুতে যারা শিক্ষার্থী ছিল, তাদের সন্তানকে পড়িয়েছি। আজকের যে আয়োজন, এতে কত যে আনন্দ হচ্ছে, এটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’
কথা বলতে বলতে ভারী হয়ে আসে তাঁর গলা। চোখে জমে ওঠে অশ্রু। দীর্ঘ ৩৯ বছরের বেশি সময়ের স্মৃতি, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা এবং পরিচিত বিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট যেন তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর চোখে-মুখে।
শেষযাত্রায় রঙিন ধোঁয়া, সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শোভাযাত্রা
এরপর আসে বিদায়ের সেই মুহূর্ত। বিদ্যালয় ভবন থেকে বেলা রানী দেব বের হওয়ার পথে দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষার্থীরা। ড্রাম ও বাদ্যের তালে চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে। নানা রঙের ধোঁয়ায় ঘোড়ার গাড়িতে ওঠার পথটি হয়ে ওঠে আরও বর্ণিল।
রকিং চেয়ারে বসিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে নেওয়ার পর তাঁকে তুলে দেওয়া হয় অপেক্ষমাণ সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে। ঘোড়ার গাড়ির সামনে ও পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের বহর। পেছনে যুক্ত হয় শিক্ষার্থীদের শোভাযাত্রা।
ঘোড়ার গাড়িতে বসে হাত নেড়ে উপস্থিত সবাইকে বিদায় জানান বেলা রানী দেব। তাঁকে নিয়ে গাড়িটি এগিয়ে চলে উত্তর নন্দীউড়ার বাড়ির দিকে। প্রায় চার কিলোমিটার পথজুড়ে তৈরি হয় ব্যতিক্রমী এক বিদায়যাত্রা।
এই পথ তাঁর অপরিচিত নয়। এত বছর এই পথ দিয়েই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেছেন তিনি। তবে এবার সেই পথে যাত্রার অর্থ ছিল ভিন্ন। আর নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে তাঁকে এই পথে বিদ্যালয়ে ফিরতে হবে না।
১৯৮৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যে বিদ্যালয়ে পা রেখেছিলেন বেলা রানী দেব, ৩৯ বছরের বেশি সময় পর সেখান থেকেই নিলেন বিদায়। মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে বদলেছে প্রজন্ম, বদলেছে শিক্ষার্থীদের মুখ, বদলেছে সময়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর জায়গাটি বদলায়নি।
তাই তাঁর বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এই আয়োজন যেন শুধু একটি ঘোড়ার গাড়ির যাত্রা ছিল না। এটি ছিল শৈশবের শিক্ষককে ফিরে দেখা, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো এবং দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের প্রতি সম্মান জানানোর এক আবেগঘন প্রকাশ।
বেলা রানী দেব অবসরে গেছেন। শেষ হয়েছে তাঁর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। কিন্তু বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর শেখানো পাঠ, স্নেহ ও স্মৃতি থেকে যাবে। ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার সেই বিকেলটিও হয়তো তাঁর মতোই তাঁদের মনে থেকে যাবে—একজন প্রিয় শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসার অনন্য স্মৃতি হয়ে।