প্রকাশিত :  ১৯:৪৩
২৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:৫৩
২৬ জুন ২০২৬

পুঁজিবাজারের সামনে নতুন সুযোগ, তবে পরীক্ষাও কম নয়

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারের সামনে নতুন সুযোগ, তবে পরীক্ষাও কম নয়

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরেই এক ধরনের আস্থার সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো নীতিগত অস্পষ্টতা, কখনো নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা, আবার কখনো অর্থনীতির সামগ্রিক অস্থিরতা বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত করেছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন সরকারের সংস্কারমুখী অবস্থান এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর বাজারে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই আশাবাদ কতটা বাস্তব, আর কতটা প্রত্যাশানির্ভর?

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিঃসন্দেহে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। তবে বাজেটের আকারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর দর্শন। সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি নয়, উৎপাদন ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে আগামী দুই বছর সহজ হবে না। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিতে হলে কিছু কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে হবে।

বাস্তবতা হলো, সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, অন্যদিকে বিপুল ঋণ পরিশোধের চাপ। উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা কিছুটা ফিরে এসেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তার প্রতিশ্রুতি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াবে না, বরং সংস্কার কর্মসূচির প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনেরও ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ব্যবসা সহজীকরণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, আইপিও ব্যবস্থা ডিজিটাল করা এবং বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের উদ্যোগ বেসরকারি খাতে নতুন গতি আনতে পারে।

পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের একযোগে বিদায় এবং নতুন নেতৃত্বের আগমন বাজারে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ ছিল, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কারসাজি দমনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।

সাম্প্রতিক জরিপগুলোও একই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়। বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আগামী বছরগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা কারসাজি, দুর্বল সুশাসন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বড় ঝুঁকি হিসেবেই দেখছেন। অর্থাৎ আশাবাদ রয়েছে, তবে সেটি এখনো সতর্ক আশাবাদ।

খাতভিত্তিক চিত্রেও একই ধরনের বার্তা পাওয়া যায়। ওষুধ খাত এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। স্থিতিশীল আয়, ধারাবাহিক লভ্যাংশ এবং শক্তিশালী মৌলিক ভিত্তির কারণে এই খাত বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ব্যাংকিং খাত নিয়ে মতভেদ থাকলেও অনেকেই মনে করেন, সংস্কার কার্যকর হলে এ খাত আবারও প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে সব ব্যাংক নয়; সুশাসন ও আর্থিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার কিছু ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। অবমূল্যায়িত তহবিলগুলোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। একইভাবে করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড কিংবা ভবিষ্যতের ইটিএফ ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের মতো নতুন পণ্য বাজারকে আরও গভীর ও বৈচিত্র্যময় করতে পারে।

অবশ্য বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, পুঁজিবাজারে টেকসই উন্নতি আসে নীতিগত ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভিত্তিতে। কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি কিংবা স্বল্পমেয়াদি জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে সচল রাখা যায় না।

বিনিয়োগকারীদের জন্যও এটি আত্মসমালোচনার সময়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখনো গুজবনির্ভর বিনিয়োগের প্রবণতা প্রবল। অথচ দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়েছেন তাঁরাই, যারা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং মৌলিক ভিত্তি বিবেচনায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমান বাস্তবতায় ভ্যালু ইনভেস্টিং—অর্থাৎ অবমূল্যায়িত কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সবচেয়ে যুক্তিসংগত কৌশল বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংস্কার সফল হলে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পুঁজিবাজারও সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। কিন্তু সংস্কার ব্যর্থ হলে আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এখন প্রয়োজন অতিরিক্ত আশাবাদ বা অযথা হতাশা নয়; প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনায় ধৈর্য, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।

পুঁজিবাজারের ইতিহাস বলে, বড় সুযোগের আগে প্রায়ই কঠিন সময় আসে। বাংলাদেশের বাজারও হয়তো সেই সময়ের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারকেরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং বিনিয়োগকারীরা সেই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর