প্রকাশিত :  ০৫:৫৯
০৬ নভেম্বর ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে এক মাসে ১৫ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, বাড়ছে লোকালয়ে বিচরণ

শ্রীমঙ্গলে এক মাসে ১৫ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, বাড়ছে লোকালয়ে বিচরণ
সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল উপজেলায় লোকালয়ে চলে আসা ১৫টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এসব প্রাণী উদ্ধার করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর তালিকায় রয়েছে অজগর, বিষধর পদ্মা গোখরা, শঙ্খিনী, দাঁড়াশ, ফণিমনসা, বেত আঁচড়া ও মুখপোড়া হনুমান।
 
চা-বাগান, বসতবাড়ি ও সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে এসব প্রাণীর দেখা মেলে। কোনোটি ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরে, কোনোটি আটকা পড়ে বৈদ্যুতিক তারে। আবার একটি অজগরের সন্ধান পাওয়া যায় মুরগির খামারে। স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীগুলো উদ্ধার করেন।
 
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবর মাসে আমরইলছড়া, উত্তর ভাড়াউড়া, দক্ষিণ রামপুর চা-বাগান, নোয়াগাঁও, সবুজবাজার, রাজু মিয়ার বাড়ি, ভুরভুরি চা-বাগান, সিন্দুরখান সড়ক ও রাধানগর সড়ক এলাকা থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করা হয়।
 
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও রাজদীপ দেব দীপ জানান, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করাই তাঁদের কাজের মূল উদ্দেশ্য। লোকালয়ে সাপ কিংবা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে সেটিকে হত্যা না করে তাঁদের অথবা বন বিভাগকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল গিয়ে প্রাণীটিকে নিরাপদে সরিয়ে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করে।
 
আগের মাসগুলোতেও বেড়েছে উদ্ধার কার্যক্রম
 
শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর মাসে এ অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির ২৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সাপ, অজগর, বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, মুখপোড়া হনুমান ও শালিক।
 
সেপ্টেম্বর মাসে উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে চারটি ছিল বড় আকারের অজগর। এর মধ্যে দুটির দৈর্ঘ্য ছিল যথাক্রমে ১৪ ও ১৬ ফুট। এ ছাড়া ফণিমনসা, পাঁচটি মনোক্লেড সাপের বাচ্চা, খৈয়া গোখরা ও তিনটি পদ্ম গোখরাও উদ্ধার করা হয়।
 
এর আগে আগস্ট মাসেও শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকা থেকে বিষধর শঙ্খিনী ও অজগরসহ অন্তত ১৭টি সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি।
 
আবাসস্থল সংকটে বাড়ছে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত
 
পরিবেশকর্মীদের মতে, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনাঞ্চল, পাহাড়-টিলা, ঝোপঝাড়, হাওর ও জলাভূমি অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। তবে বন উজাড়, বসতি সম্প্রসারণ, রিসোর্ট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। এতে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী।
 
বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। লোকালয়ে এসব প্রাণীর উপস্থিতিতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের হাতে প্রাণী হত্যার পাশাপাশি সড়কে যানবাহনের চাপায় মারা যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
 
পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, উদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ অপরিহার্য। বনাঞ্চল ও জলাভূমি রক্ষার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
 
ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপসহ প্রতিটি বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লোকালয়ে কোনো সাপ বা অন্য বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে হত্যা না করে ফাউন্ডেশন কিংবা বন বিভাগকে জানানো উচিত। এতে প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
 
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু উদ্ধার ও অবমুক্তকরণের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বনভূমি রক্ষা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নিরাপদ রাখা গেলে লোকালয়ে তাদের চলে আসার প্রবণতাও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।


Leave Your Comments




সারাদেশ এর আরও খবর