প্রকাশিত :  ১৯:১৭
০৪ নভেম্বর ২০২৬

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বপ্নভঙ্গ ও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় চাঁদাবাজির আগ্রাসন: কার প্রতিকার কে করবে?

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বপ্নভঙ্গ ও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় চাঁদাবাজির আগ্রাসন: কার প্রতিকার কে করবে?

✍️ ওয়াহিদ মুরাদ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) এবং স্টার্টআপ খাত আজ এক সম্ভাবনাময় বিপ্লবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। দেশের তরুণ সমাজ এখন আর গতানুগতিক চাকরির পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে না; বরং নিজস্ব মেধা, সৃজনশীলতা ও সামান্য পুঁজি নিয়ে তারা গ্রামীণ অর্থনীতি, পর্যটন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক নানা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানার ইকো ট্যুরিজমের মতো সম্ভাবনাময় উদ্যোগ কেবল একটি অঞ্চলের চিত্র নয়; এটি আজ সারা দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের খণ্ডিত বাস্তবতার একটি প্রতীকী প্রতিচ্ছবি।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, দেশের এই সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম যখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তখন পদে পদে তাদের এক অদৃশ্য অথচ নির্মম বাধার মুখোমুখি হতে হয়। সেই বাধার নাম স্থানীয় চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতা। পিরোজপুরের উদাহরণটি এখানে একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি মাত্র; এর বৃহত্তর ক্যানভাসজুড়ে রয়েছে পুরো বাংলাদেশের চিত্র।

সম্ভাবনার দিগন্ত বনাম চাঁদাবাজের থাবা

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে পর্যটন, কৃষি ও কুটির শিল্পের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। কোনো উদ্যোক্তা যখন বরিশালের চৌমাথা থেকে পর্যটন উপযোগী বাহন বা ‘চান্দের গাড়ি’ দিয়ে যাতায়াত সেবা চালু করতে চান, কিংবা কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজস্ব নকশার নৌকা বা অন্য কোনো পর্যটন সেবা দিয়ে একটি ইকো ট্যুরিজম প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চান, তখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় চাঁদাবাজরা।

সবচেয়ে অদ্ভুত ও নির্মম সত্য হলো, যারা এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেকের কাছেই হয়তো বৈধ উপায়ে ব্যবসা করার মতো পুঁজি রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বা জনকল্যাণমূলক কোনো উদ্যোগে বিনিয়োগে তাদের আগ্রহ নেই। অন্যের রক্ত-ঘামে গড়া উপার্জনে ভাগ বসানোই তাদের পেশা। তাদের এই অবৈধ দৌরাত্ম্য ও টেন্ডারবাজির মানসিকতার কারণে তরুণ ও সৃষ্টিশীল উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এভাবে প্রতিনিয়ত দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ হারিয়ে যাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে জাতীয় অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করছে।

বিনিয়োগের পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনিক জবাবদিহি

একটি দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি বিনিয়োগকারী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা দেওয়া। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অরক্ষিত। স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী চক্র এবং চাঁদাবাজদের ভয়ে অনেকেই আজ পুঁজি বিনিয়োগের সাহস পান না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি:

 ১. চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি: দলমত নির্বিশেষে যেকোনো স্তরের চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক সুপারিশ যেন অপরাধীকে রক্ষা করতে না পারে।

 ২. নিরাপদ ব্যবসায়িক করিডর তৈরি: দেশের যেকোনো প্রান্তে পরিবহন, পর্যটন বা খুচরা-পাইকারি ব্যবসার ক্ষেত্রে পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের নিয়মিত নজরদারি থাকতে হবে।

 ৩. উদ্যোক্তা সুরক্ষা সেল গঠন: স্থানীয় প্রশাসন বা জেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অভিযোগ শোনা এবং তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ হটলাইন বা ‘উদ্যোক্তা সুরক্ষা সেল’ চালু করা যেতে পারে।

বেকারত্ব দূরীকরণ ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ

আমাদের দেশে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সরকারি চাকরির সীমিত পদ দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অসম্ভব। কেবল বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপগুলোই পারে এই বেকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে।

সরকার যদি আন্তরিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে সুরক্ষা দেয়, তবে হাজার হাজার বেকার যুবক নিজ গ্রামেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। এতে একদিকে সরকারি চাকরির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল ও শক্তিশালী হবে।

যে তরুণেরা নিজেদের মেধা দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চায়, তাদের স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের সময় এসেছে। বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা এবং চাঁদাবাজিমুক্ত অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলেই দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব।


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর