প্রকাশিত :  ১৮:০৮
০৩ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:১৯
০৩ নভেম্বর ২০২৬

২০২৭–২০৩০ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা, তবে আস্থার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৭–২০৩০ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা, তবে আস্থার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আগামী চার বছরে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির বিকাশ নিশ্চিত করা গেলে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, দুর্বল কোম্পানির আধিক্য, ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা এবং করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শেয়ারবাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক DSEX অর্থবছরটিতে প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে বাজার মূলধন ও লেনদেনের পরিমাণেও উন্নতি দেখা যায়। তবে সূচকের এই উত্থানকে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ বাজারের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং মানসম্মত নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুন মাসের পুঁজিবাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, আগের মাসের তুলনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ৮ শতাংশ এবং মোট লেনদেনের মূল্য ৮৬.৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। একই সময়ে DSE-এর সামগ্রিক মূল্য-আয় অনুপাত (P/E) দাঁড়ায় ৯.২৬। এসব পরিসংখ্যান বাজারে কার্যক্রম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার হবে বাজারের অন্যতম নিয়ামক

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করবে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধনসংকট, ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।

ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার হলে ঋণপ্রবাহ, শিল্প বিনিয়োগ এবং কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারে। এর ইতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা এবং শেয়ারের মূল্যায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

BSEC-এর সংস্কার উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা প্রণয়ন, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (IPO) প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বাজারে ডিজিটাল নজরদারি সম্প্রসারণের উদ্যোগকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে শুধু নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করলেই বাজারের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন, অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বাজার কারসাজি, আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি এবং দুর্বল কোম্পানির অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

কোন খাতগুলোতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি

২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের সময়কালে ওষুধ, টেলিযোগাযোগ, ভোগ্যপণ্য, নির্বাচিত ব্যাংক, প্রকৌশল এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিনিয়োগকারীদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে থাকতে পারে।

ওষুধ খাতে দেশীয় চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। টেলিযোগাযোগ খাতে নিয়মিত আয় ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ভোগ্যপণ্য খাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, ব্যাংক খাতের সম্ভাবনা অনেকাংশে নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত মূলধন নিশ্চিত করা এবং সুশাসনের উন্নতির ওপর।

প্রকৌশল ও শিল্প উৎপাদন খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের কারণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ঋণের চাপ, জ্বালানির ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বকেয়া বিল, ঋণের পরিমাণ এবং নগদ প্রবাহ যাচাই করা প্রয়োজন।

২০২৭–২০৩০: তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি

আগামী চার বছরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের গতিপথ তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা গেলে বাজারে শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সংস্কার কার্যক্রম আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে ধীরগতির উন্নতি ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে সময়ে সময়ে অস্থিরতাও অব্যাহত থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে শেয়ারবাজার দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির থাকতে পারে।

অতএব, আগামী চার বছরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সূচককে নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত হবে না। বরং কোম্পানিগুলোর মুনাফা, বাজারের তারল্য, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে বাজারের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্ক ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল

বাজারে সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক কোম্পানি নির্বাচন। শুধু শেয়ারের দাম কমে যাওয়া কিংবা মূল্য-আয় অনুপাত (P/E) কম থাকার কারণে কোনো কোম্পানিকে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

কোম্পানির গত পাঁচ বছরের মুনাফার ধারাবাহিকতা, পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের জবাবদিহি এবং বর্তমান বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিনিয়োগের অর্থ বিভিন্ন খাতে ভাগ করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করা এবং জরুরি প্রয়োজনের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে রাখা উচিত। গুজবের ভিত্তিতে বিনিয়োগ, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে ছোটা এবং দুর্বল আর্থিক ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি এড়িয়ে চলা জরুরি।

আস্থার পুনর্গঠনই হবে পুঁজিবাজারের প্রকৃত সাফল্য

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য আগামী চার বছর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় হতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে।

এ জন্য BSEC, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE), বাংলাদেশ ব্যাংক, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অধিকার রক্ষা, বাজার কারসাজি প্রতিরোধ এবং মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সংস্কার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের সাফল্য শুধু সূচকের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূলধনের সুরক্ষা, বাজারে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায্য প্রতিদান নিশ্চিত করার মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর