প্রকাশিত :  ০৫:১৭
৩১ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে কী হয়, কেন প্রেসিডেন্ট অপরিবর্তিত থাকেন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে কী হয়, কেন প্রেসিডেন্ট অপরিবর্তিত থাকেন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পরপর দেশটিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট আয়োজন করা হয়, যা মধ্যবর্তী নির্বাচন বা ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ নামে পরিচিত।

এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না। বরং ভোটাররা কংগ্রেসের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন।

কিন্তু এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল হেরে গেলে কী হয়? প্রেসিডেন্ট কি ক্ষমতা হারান? তাকে কি পদত্যাগ করতে হয়? নাকি নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়?

সহজ উত্তর হলো, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল হারলেও প্রেসিডেন্টকে পদ ছাড়তে হয় না।

তিনি তার চার বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন। তবে নির্বাচনের ফল তার বাকি সময়ের শাসন পরিচালনাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

চলুন, বিষয়টি সহজভাবে বোঝা যাক। মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন বলা হয়?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর।

এই চার বছরের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছর পর যে নির্বাচন হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন। যেমন, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। এরপর ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের অর্ধেক সময় পার হওয়ার পর এই ভোট হচ্ছে। এই নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসে কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা ঠিক করা।

এই নির্বাচনে কাদের নির্বাচন করা হয়?

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি অংশ রয়েছে। একটি হলো প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস), অন্যটি সিনেট। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য নির্বাচিত হন।

১. প্রতিনিধি পরিষদ : এখানে মোট ৪৩৫টি নির্বাচিত আসন রয়েছে। সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। তাই প্রতি দুই বছর পরপর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনেই নির্বাচন হয়।

২. সিনেট : এখানে মোট ১০০ জন সদস্য রয়েছেন। প্রত্যেক অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে একসঙ্গে সবার নির্বাচন হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। এ ছাড়া অনেক অঙ্গরাজ্যে গভর্নর, অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্য এবং স্থানীয় বিভিন্ন পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

তাহলে প্রেসিডেন্টের দল হারলে কী হয়?

এটাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একটি দলের। তার দল কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা বিরোধী দলকে বেশি আসন দিলেন। ফলে কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষেই বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেল। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকবেন ঠিকই, কিন্তু তার দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে। এর ফলে প্রেসিডেন্টের জন্য দেশ পরিচালনা ও নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

প্রেসিডেন্ট কেন পদে থাকেন?

এর উত্তর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নির্দিষ্ট চার বছর। অন্যদিকে কংগ্রেসের সদস্যদের মেয়াদ আলাদা। প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছর এবং সিনেটররা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং কংগ্রেস নির্বাচন দুটি আলাদা বিষয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসের সদস্য পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু শুধু এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল হেরে যাওয়ার কারণে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় না। এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেও প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

তাহলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কি কমে যায়?

সরাসরি নয়। প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা একই থাকে। তবে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আইন পাস করতে কংগ্রেসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধরা যাক, প্রেসিডেন্ট একটি নতুন আইন করতে চান। কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে আইনটি পাস করা কঠিন হয়ে যাবে।

- বাজেট : সরকারের ব্যয় ও অর্থ বরাদ্দ নিয়ে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। বিরোধী দলের সঙ্গে মতবিরোধ হলে বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।

- নতুন আইন : প্রেসিডেন্টের পছন্দের অনেক আইন পাস করতে কংগ্রেসের সমর্থন প্রয়োজন।

- নিয়োগ : গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরকারি পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন সিনেটের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে।

- তদন্ত : কংগ্রেসের বিরোধী দল প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে।

অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট পদে থাকলেও তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হতে পারে।

প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কি অভিশংসন হতে পারে?

অভিশংসন হলো কোনো রাষ্ট্রপতি বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে তাকে পদ থেকে সরানোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করা। সহজভাবে বললে, কোনো প্রেসিডেন্ট দায়িত্বে থাকা অবস্থায় গুরুতর অপরাধ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা হলো অভিশংসন।

এই ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কি অভিশংসন হতে পারে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলেই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিনিধি পরিষদ অভিশংসনের প্রস্তাব অনুমোদন করতে পারে। এরপর সিনেটে বিচার হয়। সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেলে প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো সম্ভব। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দিতে পারে না। অভিশংসনের জন্য আলাদা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে কি নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়?

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলেই নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়না। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো ভোটই হয় না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য আলাদা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রতি চার বছর পরপর। যেমন, ২০২৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল হারলেও তিনি মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর ২০২৮ সালে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

এর কারণ হলো, এই নির্বাচন প্রেসিডেন্টের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোটাররা ঠিক করেন, আগামী চার বছর কে দেশ পরিচালনা করবেন। আর মধ্যবর্তী নির্বাচনে তারা অনেকটা মূল্যায়ন করেন, ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ও তার দলের কাজকর্ম কেমন চলছে। এ নির্বাচনের ফলের মাধ্যমে বোঝা যায়, কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের দলের প্রতি ভোটারদের সমর্থন কতটা রয়েছে। প্রেসিডেন্টের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ বাড়ে। অন্যদিকে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রেসিডেন্টকে অনেক ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হয়।

এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের ওপর ভোটারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। তবে ভোটের ফল শুধু প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না; স্থানীয় ইস্যু, অর্থনীতি, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা এবং অন্যান্য বিষয়ও ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন মানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, বরং কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের নির্বাচন। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল হারলে প্রেসিডেন্ট পদ হারান না। তার চার বছরের মেয়াদ বহাল থাকে। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে তাকে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। সহজভাবে বললে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের চেয়ার বদলায় না, কিন্তু সেই চেয়ার থেকে দেশ চালানোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।


Leave Your Comments




আন্তর্জাতিক এর আরও খবর