প্রকাশিত :  ১৬:৩০
২৮ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:০৬
২৮ অক্টোবর ২০২৬

সাহিত্য, করপোরেট নেতৃত্ব ও মানবসেবার বিরল মেলবন্ধন: বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাহিত্য, করপোরেট নেতৃত্ব ও মানবসেবার বিরল মেলবন্ধন: বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলা ও ইংরেজি দ্বিভাষিক সাহিত্যের মাধ্যমে দেশীয় সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বলিষ্ঠ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব রেজুয়ান আহম্মেদ। তিনি একাধারে একজন সফল কথাসাহিত্যিক, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, কলামিস্ট, সামাজিক সংগঠক এবং করপোরেট উদ্যোক্তা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সাহিত্যচর্চা শুরু করা এই সৃষ্টিশীল লেখক দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য, মানবিক সংকট ও বাস্তুচ্যুতির মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণকে তাঁর রচনার মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাঁর সক্রিয় নেতৃত্ব প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সম্প্রতি তাঁর রচিত আলোচিত ইংরেজি উপন্যাস ‘দ্য শ্যাডো অব ওয়ার’ (The Shadow of War) নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির মূল ডিজিটাল ক্যাটালগে স্থান পেয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মানচিত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও এক ধাপ বেড়েছে।

সাহিত্যিক সূচনা ও দ্বিভাষিক সৃষ্টির আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে, যখন তিনি ছাত্রাবস্থায় ছোটগল্প ‘অভাগী’ রচনা করেন। ১৯৯৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর করপোরেট পেশাজীবনে প্রবেশ করলেও তিনি সাহিত্য সৃষ্টি থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন হননি। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রাজনৈতিক কলাম, নাটক ও চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে সুর ও গীতিকবিতায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ দৃশ্যমান।

আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে নিজের মানবিক ভাবনা ও সামাজিক বাস্তবতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি বাংলায় সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নিয়মিত ইংরেজি ভাষায় বই প্রকাশ করে আসছেন। তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তাঁর রচিত ২২টি বাংলা বই এবং ৪২টি ইংরেজি বই প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক গ্রন্থ প্রকাশনার জগতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত।

রেজুয়ান আহম্মেদের সাহিত্যকর্ম ও আন্তর্জাতিক প্রসার

সাহিত্যকর্মের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর ২২টি বাংলা গ্রন্থের প্রধান বিষয়বস্তু প্রান্তিক জীবনসংগ্রাম ও সামাজিক বৈষম্য। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসও রয়েছে। এসব বই রকমারির মতো দেশীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিতরণ ও বাজারজাত করা হয়। তাঁর ৪২টি ইংরেজি গ্রন্থের প্রধান বিষয়বস্তু ভূরাজনীতি, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। এসব বই আমাজন, রাকুতেন কোবো ও বুকস-এ-মিলিয়নের মাধ্যমে ৭৫টিরও বেশি দেশে বিতরণ ও বাজারজাত করা হয়।

আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তাঁর প্রধান ইংরেজি গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ডেজ অব গাজা’ (The Days of Gaza), ‘বিয়ন্ড দ্য নাফ’ (Beyond the Naf), ‘ইন দ্য ল্যান্ড অব মিরাজেস’ (In the Land of Mirages), ‘উই আর অল ম্যাড’ (We Are All Mad) এবং পরিবেশ ও বিজ্ঞানধর্মী উপন্যাস ‘কোয়ান্টাম উইজার্ডস’ (Quantum Wizards)।

‘দ্য শ্যাডো অব ওয়ার’ এবং নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির বৈশ্বিক অর্জন

কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদের আন্তর্জাতিক অর্জনের অন্যতম প্রধান মাইলফলকটি আসে ২০২৬ সালের অক্টোবরে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা হেডরুম পাবলিশার্স থেকে ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত তাঁর বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উপন্যাস ‘দ্য শ্যাডো অব ওয়ার’ আনুষ্ঠানিকভাবে নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির মূল ক্যাটালগ এবং ডিজিটাল লেন্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘ওভারড্রাইভ’ (OverDrive)-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে গবেষক, পাঠক ও শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল ফরম্যাটে বইটি সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন।

এই গ্রন্থে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনার মাঝে আটকে পড়া সাধারণ মানুষের মানবিক দুর্দশা সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সংঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে গল্পটি ‘ব্রিজেস অব পিস’ নামের একটি আন্তঃসীমান্ত সামাজিক জোটের উত্থান দেখায়। এই জোট যুদ্ধবিধ্বস্ত নারী ও শিশুদের বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি নথিবদ্ধ করার মাধ্যমে সামরিক শক্তির বিপরীতে মানবিক সহানুভূতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বইটি ‘আন্তর্জাতিক থ্রিলার’, ‘ভূরাজনৈতিক কল্পকাহিনি’ ও ‘মানবিক সাহিত্য’ বিভাগে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে বইটি আমাজন প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ১১টিরও বেশি দেশে পেপারব্যাক ও ডিজিটাল সংস্করণে পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর ই-বুক সংস্করণ (ISBN 9798235000339) এবং পেপারব্যাক সংস্করণ (ISBN 9798224864218 / 9798185267400) রাকুতেন কোবো ও বুকস-এ-মিলিয়নের মতো শীর্ষ ক্যাটালগে স্থান করে নিয়েছে। বৈশ্বিক দক্ষিণ (Global South) ও দক্ষিণ এশিয়ার লেখকদের মূলধারার বৈশ্বিক লাইব্রেরিতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এই ঘটনা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ

সাহিত্য সৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে রেজুয়ান আহম্মেদ করপোরেট ও কূটনৈতিক অঙ্গনেও সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি স্থাপত্য ও প্রকৌশল খাতের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘হেডরুম গ্রুপ’ (Headroom Group)-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে কৌশলগত নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসারে তিনি ‘বাংলাদেশ-আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স’ (BACC)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত আছেন।

একই সঙ্গে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংস্কৃতিচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সুরক্ষায় সাংগঠনিকভাবে যুক্ত। তিনি ‘ফ্লোরিডা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’-এর এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন এবং নাট্য ও মিডিয়া শিল্পের নির্দেশকদের জাতীয় সংগঠন ‘ডিরেক্টরস গিল্ড’-এর আজীবন সদস্যপদ ধারণ করছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা অনুযায়ী, হেডরুম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও হিসেবে তাঁর কর্মক্ষেত্র স্থাপত্য ও প্রকৌশল খাতের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন। বাংলাদেশ-আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্র। ফ্লোরিডা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি হিসেবে উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি সংস্কৃতিচর্চা ও প্রবাসী সামাজিক সংযোগ তাঁর কর্মক্ষেত্র। ডিরেক্টরস গিল্ডের আজীবন সদস্য হিসেবে মিডিয়া শিল্পের বিকাশ, উন্নয়ন ও নাট্য নির্দেশকদের সামাজিক কল্যাণ তাঁর কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক কার্যক্রম

রেজুয়ান আহম্মেদের পেশাগত ও সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার মতো দূরবর্তী নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত। নদীভাঙনে গৃহহীন হওয়া অসহায় মানুষের আবাসন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তিনি নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।

সাংগঠনিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২২ ও ২০২৩ সালে ডিরেক্টরস গিল্ডের যৌথ সহযোগিতায় তিনি দুর্গম নদীভাঙন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী, শীতবস্ত্র ও নগদ অর্থ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনের পাশাপাশি এই মানবিক উদ্যোগগুলো তাঁর সমাজভাবনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

সাহিত্য, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও মানবিক সেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রেজুয়ান আহম্মেদ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনে তাঁকে ‘কথাসাহিত্য’ শাখায় মর্যাদাপূর্ণ ‘সোনার বাংলা সাহিত্য পরিষদ (এসবিএসপি) সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এর আগেও তিনি জাতীয় ও সামাজিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন।

এত সাফল্য সত্ত্বেও তিনি নিরহংকার ও আত্মপ্রচারবিমুখ জীবনধারা পছন্দ করেন। বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির মধ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, ভালো শিল্পকর্মের জন্য কৃত্রিম বিপণনের প্রয়োজন হয় না। বরং শিল্প নিজেই তার যোগ্য পাঠক তৈরি করে নেয়।

বিশ্বসাহিত্যে সম্ভাবনা ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন

কথাসাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ তাঁর কর্মময় জীবনে সাহিত্য, সফল উদ্যোক্তা-জীবন ও সমাজসেবার এক অনুপম সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তাঁর আন্তর্জাতিক প্রকাশনাগুলোর বিস্তৃত প্রচার এবং নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে মানবিক মূল্যবোধ ও মৌলিক কথাসাহিত্য সীমানা পেরিয়ে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। সৃষ্টিশীলতা, করপোরেট পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতার এই সংযোগ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের এক উজ্জ্বল দিক উন্মোচন করে।



Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর