প্রকাশিত :  ০৬:০৮
২৮ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারে গ্যাসকূপের সম্ভাবনা: ২৪ ঘণ্টা পরও জ্বলছে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন

কক্সবাজারে গ্যাসকূপের সম্ভাবনা: ২৪ ঘণ্টা পরও জ্বলছে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজ চলাকালে ভূগর্ভ থেকে নির্গত গ্যাসে লাগা আগুন ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।

গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে বুধবার সকালে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল। এর আগে মঙ্গলবার রাতে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে গ্যাসের নমুনা পরীক্ষার আগে সেখানে কী ধরনের গ্যাস রয়েছে কিংবা এর মজুত কতটা, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলপ্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।

তিনি বলেন, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগতে পারে।

আগুনের রং ও ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একই কারণে সেখানে কী পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, সে বিষয়েও এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

নাফিফুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। পরে সেনাবাহিনীও আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। কিন্তু গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও অবহিত করা হয়।

ইনানীতে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাস বের হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ ঘটনা থেকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এ জন্য গ্যাসের নমুনা পরীক্ষা ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তারা নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় ফিরবেন। বাপেক্সের পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের পর সেখানে কী ধরনের গ্যাস রয়েছে, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। নমুনা পরীক্ষার কাজ এক থেকে দুই দিনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জেবুন নাহার বলেন, নলকূপ খননের সময় অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সাধারণত মাটির অল্প গভীরে বায়োজেনিক গ্যাস থাকে। এগুলো মাটির নিচে থাকা গ্যাসের পকেটে জমা থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাপেক্স সাধারণত যে গভীরতা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে, তা অন্তত ২ হাজার ৫০০ মিটার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মিটারের বেশি। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উঠছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ওই এলাকায় স্তরভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ হলেও গভীর অনুসন্ধান হয়নি।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর আগে খাগড়াছড়ির সেমুতাংয়ে একটি গ্যাসক্ষেত্র এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরের দিকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। এ দুটি ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলে আর কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঁশখালীতে দুটি কূপ খনন করা হলেও সেখানে গ্যাস পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সম্প্রতি ইনানী গ্রামের ছোট সেতু এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির কিছু জমি কিনে সেখানে খামারবাড়ি নির্মাণ করছিলেন। ওই বাড়িতে নলকূপ বসাতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটে।

আব্দুল্লাহ বলেন, ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সেখানে একটি গভীর নলকূপ খনন করা হয়েছিল। তবে ৭০০ ফুট গভীরে যাওয়ার পরও পান করার উপযোগী পানি পাওয়া যায়নি। পরে গত সোমবার থেকে পাশের আরেকটি জায়গায় নলকূপ বসানোর কাজ শুরু করেন শ্রমিকেরা। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ নলকূপ বসানোর স্থান থেকে আগুন বের হতে শুরু করে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি নিরাপত্তাবলয়ের আওতায় এনে বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে।



Leave Your Comments




শিল্প বাণিজ্য এর আরও খবর