প্রকাশিত : ০৮:০৩
২৬ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:০৪
২৬ অক্টোবর ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি: দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ধাক্কায় সাধারণ নাগরিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীরা এক নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আয় হ্রাস এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে সংসার চালানোই যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে ঋণের নিয়মিত কিস্তি ধরে রাখা অনেকের জন্যই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন এক সংবেদনশীল সময়ে অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসি (LankaBangla Finance PLC)-এর অটো লোন বা গাড়ি ঋণ আদায়ের বেপরোয়া ও বেআইনি পদক্ষেপ কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনকানুন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে পথঘাট কিংবা বাসাবাড়ির গ্যারেজ থেকে জোরপূর্বক গাড়ি ধরে নিয়ে যাওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা দেশের বিদ্যমান আইন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনার খোলাখুলি লঙ্ঘন।
ঘটনার গভীরে নজর দিলে শোষণের ভয়াবহ চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বহু গ্রাহক লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স থেকে ২৫ লক্ষ টাকা গাড়ি ঋণ নিয়ে ইতোমধ্যেই পুরো আসল টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন এবং সুদে-আসলে মোট জমা দিয়েছেন প্রায় ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি। গাণিতিক হিসাবে, মূল ঋণের ১৬০ শতাংশ বা দেড় গুণেরও বেশি অর্থ ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ঘরে পৌঁছে গেছে, যার মধ্যে লাভের ১৫ লক্ষ টাকাই ঢুকেছে তাদের ঝুলিতে। অথচ কেবল সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অবশিষ্ট সুদের সামান্য ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা বাকি থাকায় গ্রাহকের নিত্যদিনের যাতায়াত বা জীবিকার প্রধান মাধ্যম গাড়িটি বলপ্রয়োগ করে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। মূলধনের শতভাগ পরিশোধের পর কেবল সুদের সামান্য বকেয়ার অজুহাতে ব্যক্তিগত সম্পদ দখল করা কোনো সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে পারে না। এটি নিছক আর্থিক শোষণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
আইন বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, গাড়ি লোন প্রদানের সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে গ্রাহকের প্রধানত হাইপোথিকেশন (Hypothecation) চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির আইনি অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর প্রতিষ্ঠানের একটি আর্থিক স্বত্ব বা চার্জ থাকবে, কিন্তু সম্পদের প্রত্যক্ষ মালিকানা, দখল ও ব্যবহারের অধিকার পুরোপুরি গ্রাহকের কাছেই বজায় থাকবে। কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা ঘটলে চুক্তিভঙ্গের অজুহাতে আদালতের ডিক্রি ছাড়া কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিজস্ব রিকভারি টিম বা ভাড়াটে বাহিনী পাঠিয়ে গাড়ি ক্রোক করতে পারে না।
লাদেশ দেওয়ানি কার্যবিধি ও অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। বকেয়া ঋণ আদায়ের একমাত্র আইনানুগ উপায় হলো গ্রাহককে নির্ধারিত সময়সীমা দিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো এবং পরবর্তীতে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা। আদালত শুনানি শেষে যদি ক্রোক পরোয়ানা জারি করেন, তবে কেবল আদালতের বেলিফ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব। অথচ লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স কোনো বিচারিক আদেশের তোয়াক্কা না করে সরাসরি আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। রাস্তাঘাটে বা বাড়ি থেকে গুন্ডামি স্টাইলে গাড়ি ধরে নিয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা ফৌজদারি দণ্ডবিধির আওতায় বলপূর্বক ছিনতাই ও মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য, যা দেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন রায়ে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা ও নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সাময়িক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে সকল তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিলীকরণ এবং সহনীয় 'এক্সিট পলিসি' সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে। এসব নীতিমালার মূল লক্ষ্যই ছিল সংকটকালে নমনীয় শর্তে গ্রাহকদের ঋণ হিসাব গুটিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব গ্রাহকবান্ধব নীতিমালাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চরম আগ্রাসী প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায়ের পথ বেছে নিয়েছে।
লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণের বিরুদ্ধে নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের 'ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট' (FICSD)-এর দ্বারস্থ হওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের হটলাইন ১৬২৩৬ নম্বরে ফোন করে কিংবা bb.cipc@bb.org.bd ই-মেইলে সরাসরি লিখিত অভিযোগ ও প্রমাণের ডিজিটাল কপি পাঠালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইপিসি সেল ও এফআইসিএসডি সরাসরি বিষয়টি তদন্ত করতে বাধ্য। এছাড়া মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ২য় সংলগ্ন ভবনের ১৭ তলায় সরাসরি গিয়েও লিখিত দাপ্তরিক অভিযোগ পেশ করা সম্ভব, যা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৯ ধারা অনুযায়ী তদারকি করা হয়।
একটি দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাজ কেবল মুনাফা লোটা বা পেশিশক্তি দেখানো হতে পারে না। লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানের এমন অনভিপ্রেত ও বেআইনি পদক্ষেপ পুরো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ধসিয়ে দিচ্ছে। এ অরাজকতা বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ ও এফআইসিএসডি-কে অবিলম্বে কঠোর তদন্তে নামতে হবে এবং বেআইনি রিকভারি স্কোয়াডের কার্যক্রম স্থগিত করতে হবে। একই সাথে ভুক্তভোগীদেরও উচিত আইন হাতে তুলে নেওয়া চক্রের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং হাইকোর্টে রিট দায়ের করে আইনি প্রতিকার সুনিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক মন্দার এই কঠিন সময়ে আইনের শাসন ও মানবিক বিচারবুদ্ধির জয় হওয়া অত্যন্ত জরুরি।