প্রকাশিত :  ০৮:০৪
১৭ অক্টোবর ২০২৬

কেন লাল দুর্গা পাঁচগাঁওয়ে, তিন শ বছরের ঐতিহ্যে আজও জাগ্রত দেবী

কেন লাল দুর্গা পাঁচগাঁওয়ে, তিন শ বছরের ঐতিহ্যে আজও জাগ্রত দেবী

সংগ্রাম দত্ত: কামাখ্যাধামে কুমারীপূজা, দেবীর রক্তবর্ণ রূপের নির্দেশ, বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত সোনার সিঁথি—সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজা এক অনন্য ঐতিহ্যের নাম। মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত পেরিয়েও যে পূজার প্রদীপ নেভেনি, শারদীয় উৎসবে সেই মণ্ডপে সমবেত হন দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী।

শারদীয় দুর্গোৎসব এলেই বাংলার আকাশ-বাতাস ভরে ওঠে ঢাকের শব্দে, শঙ্খধ্বনিতে আর দেবী দুর্গার আরাধনায়। সাধারণত দেবীর প্রতিমায় যে স্বর্ণাভ বা গৌরবর্ণ রূপ দেখা যায়, তারই ব্যতিক্রম এক দৃশ্য চোখে পড়ে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে। এখানে দেবী দুর্গা পূজিত হন রক্তবর্ণে—গাঢ় লাল রূপে। শুধু প্রতিমার রং নয়, এই লাল বর্ণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় তিন শ বছরের ঐতিহ্য, এক সাধকের সাধনা, কামাখ্যাধামকে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক কাহিনি, বংশপরম্পরায় চলে আসা পূজার বিধান এবং ইতিহাসের নানা বাঁক।

পাঁচগাঁওয়ের এই দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি একটি জনপদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং বিশ্বাসের দীর্ঘ যাত্রার প্রতীক।

শারদীয় উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিমা দর্শন, ভক্তিপূর্ণ প্রণাম ও আশীর্বাদ লাভের প্রত্যাশায় এখানে ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত-পুণ্যার্থী, সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং নানা শ্রেণি-পেশার দর্শনার্থী। তাঁদের কাছে পাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গা একই সঙ্গে ভক্তির আশ্রয়, ঐতিহ্যের স্মারক ও বিস্ময়ের এক অনন্য অধ্যায়।

পাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গার ইতিহাসের প্রধান চরিত্র সর্বানন্দ দাস। বংশপরম্পরায় প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় তিন শ বছর আগে তিনি তৎকালীন শাসনব্যবস্থার অধীনে মুন্সি পদে কর্মরত ছিলেন। তাঁর কর্মস্থল ছিল আসামের শিবসাগর জেলা। এক শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় তাঁর মনে ইচ্ছা জাগে কামাখ্যাধামে গিয়ে কুমারীপূজা করার। সেই সঙ্গে নিজের বাড়িতে যথারীতি দুর্গাপূজার আয়োজন করতে স্ত্রী ও কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়ে তিনি যাত্রা করেন কামাখ্যার উদ্দেশে।

কামাখ্যাধামে পৌঁছে মন্দিরের সেবায়েতের সহায়তায় তিনি নির্বাচন করেন পাঁচ বছর বয়সী এক কুমারীকে। মহাষ্টমীর দিন সেই শিশুকন্যাকে আসনে বসিয়ে দেবীজ্ঞানে শুরু হয় ষোড়শোপচারে পূজা। কথিত আছে, প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলে সেই আরাধনা।

পূজা শেষে কুমারীকে প্রণাম করতে গিয়ে সর্বানন্দ দাস এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখতে পান। তাঁর বিশ্বাস ও বংশপরম্পরায় প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, কুমারীর গায়ের বর্ণ তখন লাল হয়ে উঠেছিল।

বিস্মিত সর্বানন্দ দাস জানতে চান, তাঁর পূজা দেবীর মনঃপূত হয়েছে কি না। প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, কুমারীরূপী দেবী তাঁকে আশ্বস্ত করে জানান, তাঁর পূজা সিদ্ধ হয়েছে। দেবী আরও বলেন, এই রূপেই তিনি সর্বানন্দের গ্রাম পাঁচগাঁওয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাই ভবিষ্যতে তাঁকে লাল বর্ণে পূজা করতে হবে।

সর্বানন্দ দাস তখন দেবীর কাছে সেই আবির্ভাবের প্রমাণ চান। জবাবে দেবী নাকি জানান, পাঁচগাঁওয়ে তাঁর দুর্গামণ্ডপের বেড়ায় তিনি হাতের ছাপ রেখে এসেছেন। এরপর বর প্রার্থনা করতে বললে সর্বানন্দ দাস প্রথমে জানান, দেবীর শ্রীপাদপদ্ম লাভই তাঁর একমাত্র কাম্য। কিন্তু দেবীর বারবার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থনা করেন—ভগবতী যেন স্থায়ীভাবে তাঁর পাঁচগাঁওয়ের দুর্গামণ্ডপে অধিষ্ঠিত থাকেন।

কাহিনি অনুসারে, দেবী সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করে বলেন, ‘তথাস্তু’। এরপর নিজের মাথার সোনার সিঁথি খুলে সর্বানন্দ দাসের হাতে দিয়ে নির্দেশ দেন, প্রতি বছর মহাস্নানের সময় এই সিঁথি ব্যবহার করে তাঁকে স্নান করাতে হবে।

কামাখ্যাধাম থেকে ফিরে সর্বানন্দ দাস নিজের দুর্গামণ্ডপের বেড়ায় দেবীর হাতের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন বলেও বংশপরম্পরায় প্রচলিত রয়েছে।

এই কাহিনিই পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাকে রক্তবর্ণে পূজার মূল ব্যাখ্যা হিসেবে আজও স্মরণ করা হয়। দেবীর লাল রূপ এখানে শুধু প্রতিমার বৈশিষ্ট্য নয়; এটি পূর্বপুরুষের বিশ্বাস, দেবীর নির্দেশ এবং শতাব্দীপ্রাচীন পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক।

কামাখ্যাধাম থেকে ফিরে সর্বানন্দ দাস পরের বছর পাঁচগাঁওয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দেবীর কথিত নির্দেশ অনুসারে তিনি প্রতিমাকে রক্তবর্ণে রাঙানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে প্রথমে আপত্তি ওঠে গ্রামবাসীদের মধ্যে।

তাঁদের ধারণা ছিল, প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতির বাইরে গিয়ে দেবীর প্রতিমা লাল রঙে নির্মাণ করা অনুচিত। সর্বানন্দ দাস কামাখ্যাধামের অভিজ্ঞতার কথা জানালেও গুরু, পুরোহিত, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীদের অনেকে তা বিশ্বাস করেননি। কেউ কেউ তাঁর বক্তব্যকে কল্পনা কিংবা পাগলামি বলেও উড়িয়ে দেন। এমনকি তাঁরা পূজায় অংশ নেবেন না বলেও জানিয়ে দেন।

ফলে ষষ্ঠীর রাত পর্যন্ত পূজামণ্ডপে কেউ উপস্থিত হননি। পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে দেবীর বোধনও সম্পন্ন হয়নি। সর্বানন্দ দাস তখন দিশাহারা হয়ে দেবীকে ডাকতে থাকেন।

বংশপরম্পরায় প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, রাতের শেষ প্রহরে পরিস্থিতি বদলে যায়। গুরু, পুরোহিত, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীরা একে একে মণ্ডপে এসে জানান, তাঁরা স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন—দেবীকে লাল বর্ণেই পূজা করতে হবে। সর্বানন্দ দাসের অন্য আত্মীয়দের বাড়িতেও একই রূপে দেবীকে পূজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা জানান।

এরপর শঙ্খ, ঢাক, ঢোল ও ঘণ্টাধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পাঁচগাঁও। মহাসপ্তমী থেকে শুরু হয় পূজা। পরবর্তী সময়ে সর্বানন্দ দাসের অন্য আত্মীয়দের বাড়িতেও রক্তবর্ণা দুর্গার পূজা চালু হয়।

এভাবেই পারিবারিক ও স্থানীয় জনশ্রুতিতে পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপূজার সূচনার কাহিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। যে রূপকে একসময় আপত্তির চোখে দেখা হয়েছিল, সেটিই পরে হয়ে ওঠে এই গ্রামের স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয়।

পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজার ইতিহাসে সোনার সিঁথির গুরুত্ব বিশেষ। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, কামাখ্যাধামে কুমারীপূজার পর দেবী সর্বানন্দ দাসকে যে সোনার সিঁথি দিয়েছিলেন, সেটিই পরবর্তী সময়ে পূজার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হয়।

প্রতি বছর মহাস্নানের সময় সিঁথিটি ব্যবহার করার রীতি বংশপরম্পরায় চলে আসছে বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে জানা যায়। বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই অলংকারটি রক্ষা পেয়েছে। পাঁচগাঁওয়ের পূজার ইতিহাসে তাই সোনার সিঁথি কেবল একটি স্বর্ণালংকার নয়; এটি উত্তরাধিকার, স্মৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক।

সর্বানন্দ দাসের জীবদ্দশায় পূজার নানা আচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে, তিনি ১০৮ বার চণ্ডীপাঠ, দশ হাজার আহুতি দিয়ে হোম এবং পূজার অন্যান্য কাজের জন্য গুরু, পুরোহিত, প্রতিমা নির্মাতা ও পূজার সামগ্রী প্রস্তুতকারীদের পৃথকভাবে ভূমি দান করেছিলেন।


মৃত্যুর আগে তিনি পুত্র কমলচরণ দাসকে পূজার দায়িত্ব ও নিয়মাবলি সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে যান। কমলচরণ দাস তাঁর পুত্র কালীকিশোর দাসকে এবং পরবর্তী প্রজন্মে কালীপদ দাসকেও অনুরূপ নির্দেশনা দেন বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা থেকেই বোঝা যায়, পূজাটি কেবল বার্ষিক উৎসব হিসেবে নয়, একটি সুসংগঠিত পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবেও গড়ে উঠেছিল।

পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজার ইতিহাসে প্রতিমার আকার ও ঐতিহ্যবাহী রূপ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, কালীচরণ দাসের আমলে একবার প্রতিমার কাঠামো ছোট করে আধুনিক ধাঁচে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকার কারিগর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই প্রতিমা। কিন্তু সেই বছর মহাষ্টমীর দিন কালীপদ দাস হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তাঁর শারীরিক অবস্থা এমন হয়েছিল যে পরিবারের লোকজন তাঁকে নিয়ে গভীর উদ্বেগে পড়েন।

তখন কুলগুরু রোহিণী ভট্টাচার্য সদ্য সম্পন্ন মহাস্নানের জল হাতে নিয়ে দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর অসুস্থ কালীপদ দাসের মুখে সেই জল দেওয়া হয়। বংশপরম্পরায় প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

পরিবারের বিশ্বাস, এই ঘটনার পর থেকে প্রতিমার কাঠামো, পরিমাপ ও সনাতনী রূপে আর পরিবর্তন আনা হয়নি। প্রতিবছর আগের বছরের প্রতিমার রূপ ও ঐতিহ্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।

এ কারণে পাঁচগাঁওয়ের পূজায় প্রতিমা নির্মাণ কেবল শিল্পীর নৈপুণ্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্বপুরুষের বিধান ও দীর্ঘদিনের রীতি অনুসরণের দায়বদ্ধতা।

দুর্গাপূজার ইতিহাসে পূজা আয়োজনের পাশাপাশি বিসর্জনের পথ নিয়েও একসময় বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

কমলচরণ দাসের আমলে দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের সময় শোভাযাত্রা ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পথে জমির মালিক এক ব্যক্তি বাধা দেন। এ নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক, একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বলে প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ আছে

পরিদর্শনের পর তিনি রায় দেন, ওই পথ ছাড়া প্রতিমা বিসর্জনের বিকল্প উপযুক্ত স্থান নেই। স্থানীয় জনশ্রুতিতে আরও বলা হয়, বিসর্জনের শোভাযাত্রার কারণে ধানের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতো, পরবর্তী সময়ে সেই জমিতেই নাকি বেশি ফসল পাওয়া যেত।

এই কাহিনি স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসের অংশ হলেও এর স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, পূজার রীতি ও বিসর্জনের পথ গ্রামটির সামাজিক জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বাংলা ১৩৬২ সালের ১ বৈশাখ থেকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর পাঁচগাঁওয়ের পূজার আর্থিক ভিত্তিতেও পরিবর্তন আসে। পূজার ব্যয় ও আড়ম্বর কমানোর চিন্তা শুরু হয়। একসময় পরিবারের ভেতরের আঙিনায় পূজা সীমিত রাখার কথাও বিবেচিত হয়েছিল।

কিন্তু পূজার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা তাতে সম্মত হননি। তাঁরা সমবেতভাবে জানান, পূর্বপুরুষের রীতি অনুযায়ী তাঁরা আগের মতোই পূজার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে পূজার নানা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বংশপরম্পরায় তাঁদের দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং পারিশ্রমিক গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন বলে পারিবারিক বর্ণনায় জানা যায়।

প্রতিমা নির্মাণের মাটির ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ রীতি। সর্বানন্দ দাস দুর্গামণ্ডপের সামনে একটি গর্ত করে দিয়েছিলেন বলে প্রচলিত আছে। প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে মালাকাররা সেখানে প্রতিমা তৈরির জন্য মাটি এনে রাখতেন। এই রীতি এখনও অনুসরণ করা হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর আর্থিক সীমাবদ্ধতা দেখা দিলেও পূজার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিবার, কারিগর ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

পাঁচগাঁওয়ের পূজার ইতিহাসে বলিপ্রথারও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রয়েছে।

জমিদারি আয় কমে যাওয়ার পর কালীপদ দাসের বড় ছেলে সুধাময় দাস মহিষবলি বন্ধ করার প্রস্তাব দেন বলে পারিবারিক বিবরণে উল্লেখ আছে। কিন্তু পূজার কয়েক দিন আগে পরিবারের এক প্রবীণ নারী, শান্তিবালা দেবী নামে যাঁর উল্লেখ কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়, ছেলেকে জানান যে আগের রাতে তাঁর ঘুম হয়নি এবং মন অশান্তিতে কেটেছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, মহিষবলি বন্ধ করা উচিত হবে না।

এমন সময় কৈলাস ঘোষ নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মহিষ কেনার জন্য ২০০ টাকা পাঠান। পরিবারের আরেক সদস্য স্নেহময় দাসও স্বপ্নে মহিষবলি দেওয়ার দৃশ্য দেখেছিলেন বলে প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত মহিষবলি বন্ধ হয়নি।

বর্তমানেও এই পূজায় মহিষ ও ছাগল বলির রীতি চলে আসছে বলে পারিবারিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রতিবছরের বলির সংখ্যা ও বর্তমান আয়োজনের বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট পূজা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

পাঁচগাঁওয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

পারিবারিক ইতিহাসে বলা হয়েছে, বাংলা ১৩৭৭ সালের শেষ দিকে স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেবীর বহু মূল্যবান অলংকার লুণ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল প্রায় ৮০ ভরি ওজনের রুপার মুকুট, রুপার চরণপদ্ম, সোনার নোলক ও আংটিসহ অন্যান্য সামগ্রী। শুধু কুমারীর মাথার সোনার সিঁথিটি রক্ষা পেয়েছিল বলে প্রচলিত বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

অলংকার লুণ্ঠনের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির পরবর্তী জীবনে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছিল—এমন কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায় না; তাই এটিকে জনশ্রুতি হিসেবেই দেখা উচিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তিবাবু সেই সোনার সিঁথিটি কুলপুরোহিত রাজীব ভট্টাচার্যের কাছে রেখে ভারতে চলে যান। যুদ্ধের মধ্যে রাজীব ভট্টাচার্যের অস্থাবর সম্পত্তির অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেলেও তিনি সিঁথিটি সযত্নে রক্ষা করেন বলে পারিবারিক বিবরণে জানা যায়। পরে দেশে ফিরে শান্তিবাবুর হাতে তা ফিরিয়ে দেন।

একই সময়ে শান্তিবাবুর বাড়িঘর পাকিস্তানি সেনাদের আগুনে পুড়ে যায় বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বহু চেষ্টা সত্ত্বেও দুর্গামণ্ডপটি পোড়ানো যায়নি—এমন একটি স্মৃতিও স্থানীয় মানুষের মুখে প্রচলিত।

মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়ে পাঁচগাঁওয়ে ৭৬ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন বলে প্রদত্ত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে বছর স্বাভাবিক নিয়মে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে মণ্ডপসংলগ্ন বাড়ির বাসিন্দা পরেশচন্দ্র নাথ মণ্ডপের ঘরে একটি ঘট স্থাপন করে ফুল ও বেলপাতা দিয়ে দেবীর আরাধনা করেছিলেন বলে প্রচলিত ইতিহাসে জানা যায়।

যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসের মধ্যে সেই সীমিত আরাধনা ছিল বিশ্বাসের এক নীরব ধারাবাহিকতা। বড় আয়োজন থেমে গেলেও দেবীর উদ্দেশে প্রার্থনার প্রদীপ পুরোপুরি নিভে যায়নি।

স্বাধীনতার পর বাংলা ১৩৭৮ সালে পাঁচগাঁও ও আশপাশের গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে একত্রিত হন। তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে দুর্গামণ্ডপকে পাকা ও স্থায়ীভাবে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জনসাধারণের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে মণ্ডপ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল বলে প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এর পর বাংলা ১৩৭৯ সাল থেকে আগের মতো পূজার আয়োজন পুনরায় শুরু হয় বলে পারিবারিক ইতিহাসে বলা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত, আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক জীবনের নানা পরিবর্তন পেরিয়ে পূজার পুনরারম্ভ পাঁচগাঁওয়ের মানুষের কাছে ছিল ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। রক্তবর্ণা দুর্গার পূজা আবারও ফিরে আসে জনপদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রে 

সময়ের সঙ্গে মণ্ডপের অবকাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। পুরোনো মন্দির ভেঙে নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু মন্দিরের কাঠামো বদলালেও দেবীর লাল বর্ণ, পূজার উত্তরাধিকার এবং সোনার সিঁথিকে ঘিরে থাকা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আজ পাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গাপূজা শুধু একটি পরিবারের আয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় সমাজ ও বৃহত্তর ভক্তসমাজের আগ্রহের কেন্দ্র। পূজার দিনগুলোতে দেশ-বিদেশে বসবাসরত পরিবারের সদস্যরা গ্রামে ফিরে আসেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্ত-পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা।

দেবীকে প্রণাম, পূজার আচার প্রত্যক্ষ করা, আশীর্বাদ প্রার্থনা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা দর্শনের জন্য মণ্ডপে ভিড় করেন নানা বয়সের মানুষ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী দর্শনার্থীদের কাছেও এই পূজা আকর্ষণীয়।

লাল বর্ণের প্রতিমা, দীর্ঘদিনের পারিবারিক রীতি, মহাস্নানে সোনার সিঁথির ব্যবহার এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি—সব মিলিয়ে পাঁচগাঁওয়ের পূজা একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। তবে প্রতি বছর কতজন দর্শনার্থী আসেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে পূজার বর্তমান ব্যাপ্তি আরও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

বর্তমানে শান্তিবাবুর পুত্র সঞ্জয় দাস পূজার দায়িত্ব পালন করছেন বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া নির্দেশনা ও ঐতিহ্য অনুসরণ করেই পূজার আয়োজন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

পাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গার ইতিহাসে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে স্থানীয় সমাজের পরিবর্তন, জমিদারি প্রথার অবসান, কারিগরদের উত্তরাধিকার, সম্পদ হারানোর বেদনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি। একই সঙ্গে রয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একটি ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার নিরলস প্রচেষ্টা।

দেবী কেন লাল বর্ণে পূজিত হন—তার উত্তর স্থানীয় মানুষের কাছে সর্বানন্দ দাসের কামাখ্যাধামে কুমারীপূজার সেই কাহিনিতে নিহিত। তাঁদের বিশ্বাস, দেবীর নির্দেশেই শুরু হয়েছিল এই বিশেষ রীতির প্রচলন। ইতিহাসের দৃষ্টিতে কাহিনিটির প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন হলেও এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ একটি জনপদের পরিচয় শুধু নথিভুক্ত ঘটনার মধ্যেই গড়ে ওঠে না; লোকস্মৃতি, পারিবারিক আখ্যান, আচার ও মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসও সেই পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গা তাই একই সঙ্গে বিশ্বাসের প্রতীক, ইতিহাসের স্মারক এবং একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বাহক। প্রায় তিন শ বছরের ঐতিহ্য বলে পরিচিত এই পূজা আজও মানুষকে টানে—কেউ আসেন ভক্তি নিয়ে, কেউ ইতিহাস জানতে, কেউবা দেখতে চান সেই ব্যতিক্রমী লাল দুর্গাকে।

শারদীয় উৎসবের কোলাহলে যখন ঢাকের শব্দ ওঠে, শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয় মণ্ডপ, তখন পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা যেন শুধু একটি প্রতিমা হয়ে থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন বহু প্রজন্মের স্মৃতি, হারানো দিনের সাক্ষ্য এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা এক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।



Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর