প্রকাশিত :  ০৭:৩০
১৬ অক্টোবর ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের শাপলাবাগে দুর্গোৎসব: ধর্মীয় আচার ছাপিয়ে সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের মিলনমেলা

শ্রীমঙ্গলের শাপলাবাগে দুর্গোৎসব: ধর্মীয় আচার ছাপিয়ে সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের মিলনমেলা

সংগ্রাম দত্ত: শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর বাতাসে উৎসবের আমেজ। এরই মধ্যে শ্রীমঙ্গলে শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা আর পূজার নানা আয়োজন ঘিরে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের শাপলাবাগ আবাসিক এলাকার দুর্গাপূজার আকর্ষণ যেন একটু আলাদা। এখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের কাছে গুরুত্ব পায় মণ্ডপের সৌন্দর্য, উৎসবের জাঁকজমক এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলন।

শ্রীমঙ্গলকে সাধারণত চায়ের রাজধানী হিসেবে চেনেন মানুষ। দেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে এর পরিচিতি বহুদিনের। পাহাড়ি টিলা, সবুজ চা-বাগান, বনাঞ্চল, হাওর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন। কিন্তু শ্রীমঙ্গলের আরেকটি পরিচয়ও রয়েছে—বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক জনপদ হিসেবে এর ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে দুর্গাপূজার সময়।

শাপলাবাগে উৎসবের আলাদা আকর্ষণ

শহরের শাপলাবাগ আবাসিক এলাকার দুর্গাপূজামণ্ডপ শ্রীমঙ্গলের অন্যতম আকর্ষণীয় পূজামণ্ডপ হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর পূজার সময় এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। প্রতিমা দর্শন, মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং উৎসবের সামগ্রিক পরিবেশ দেখতে আসেন স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্তের মানুষও।

দুর্গাপূজা শুধু প্রতিমা দর্শনের আয়োজন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্প, সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ ও মানুষের আবেগ। শাপলাবাগের পূজামণ্ডপেও সেই আবহ তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতিমা দেখতে আসা, বন্ধুদের সঙ্গে উৎসব উপভোগ করা কিংবা দূর থেকে আসা আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে মণ্ডপ ঘুরে দেখা—সব মিলিয়ে পূজার দিনগুলোতে এলাকাটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

মণ্ডপের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করলেও এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি। পূজা কমিটির সদস্যদের পরিকল্পনা, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের শ্রমে গড়ে ওঠে উৎসবের আয়োজন। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপ সাজানো, দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রসাদ বিতরণ—প্রতিটি কাজেই থাকে সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

চায়ের শহরে বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

শ্রীমঙ্গলের পরিচয় কেবল চা-বাগান আর পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এই জনপদকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সামাজিক বৈশিষ্ট্য। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। তাদের জীবনযাপন, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য শ্রীমঙ্গলের সামগ্রিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে।

ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এই অঞ্চলে চা-শিল্পের বিকাশ ঘটে। চা-বাগানকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও জনবসতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় শ্রীমঙ্গলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো স্থানীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

দুর্গাপূজার সময় এই বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অনেক মানুষও মণ্ডপে যান। তাঁরা প্রতিমা, মণ্ডপের শিল্পকর্ম ও পূজার রীতিনীতি দেখেন। কারও কাছে এটি ধর্মীয় উৎসবের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ, কারও কাছে ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার অভিজ্ঞতা।

এভাবেই শ্রীমঙ্গলের দুর্গোৎসব ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটি উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

ঐতিহ্যের ধারায় দুর্গাপূজা

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয়ের কাহিনি এই উৎসবের মূল ধর্মীয় তাৎপর্যের সঙ্গে যুক্ত।

সাধারণত মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আবহ তৈরি হয়। এরপর ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজা উদ্‌যাপিত হয়। ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন, সপ্তমীতে পূজা, অষ্টমীতে অঞ্জলি ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, নবমীতে পূজা এবং দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। অঞ্চল ও পূজার রীতি অনুসারে আচার-অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।

তবে দুর্গাপূজার তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন পোশাক, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা, অতিথি আপ্যায়ন, প্রসাদ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনও এই উৎসবের অংশ। অনেক পরিবারের কাছে দুর্গাপূজা সারা বছরের অপেক্ষার একটি সময়।

শ্রীমঙ্গলের শাপলাবাগের পূজামণ্ডপেও এই ধর্মীয় আবেগ ও সামাজিক আনন্দের সম্মিলন দেখা যায়। পূজার কয়েকটি দিনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে তৈরি হয় উৎসাহ, প্রত্যাশা ও পারস্পরিক যোগাযোগের নতুন উপলক্ষ।

শহরের অন্য মণ্ডপগুলোও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে

শ্রীমঙ্গল শহরে শাপলাবাগ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি পরিচিত পূজামণ্ডপ। এর মধ্যে শহরের সার্বজনীন দুর্গাবাড়ি, রামকৃষ্ণ মিশন, শ্রীমঙ্গলেশ্বরী কালীবাড়ি, রুপসপুর ও সবুজবাগ ও পূর্বাশা আবাসিক এলাকার পূজামণ্ডপ উল্লেখযোগ্য। এসব মণ্ডপে পূজার সময় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিমা দর্শন ও উৎসবের পরিবেশ উপভোগ করতে মানুষের সমাগম ঘটে।

একই শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরে পূজা দেখার মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীরা একদিকে যেমন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হন, অন্যদিকে মণ্ডপসজ্জা ও আয়োজনের বৈচিত্র্যও উপভোগ করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি পরিচিত উৎসব হলেও দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের কাছে শ্রীমঙ্গলের দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে নতুন অভিজ্ঞতা।

এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসে দুর্গাপূজার সময় মণ্ডপ পরিদর্শন করে থাকেন। চা-বাগান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্থানীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন দেখার সুযোগ পর্যটকদের কাছে শ্রীমঙ্গলের অভিজ্ঞতাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় গুরুত্ব

বড় পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো আয়োজকদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লে মণ্ডপের প্রবেশপথ, চলাচলের রাস্তা এবং আশপাশের এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি হয়ে পড়ে।

শাপলাবাগের পূজা আয়োজনেও নিরাপত্তা ও দর্শনার্থীদের ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন পূজা কমিটির সদস্য ও এলাকার স্বনামধন্য শিক্ষক চন্দন চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি কমিটির নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।

চন্দন চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই এখানে জাঁকজমকপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পূজায় যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করেন।”

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন পুণ্যার্থীদের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এই পূজা দেখতে আসেন। দর্শনার্থীদের চাপ কখনো কখনো সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়লেও আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে কমিটির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়।

প্রসাদ বিতরণে সম্প্রীতির বার্তা

ধর্মীয় উৎসবে প্রসাদ বিতরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি। পূজা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পূর্ণতা পায়। শাপলাবাগের পূজামণ্ডপেও প্রতিদিন প্রসাদের ব্যবস্থা রাখা হয় বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।

এ ধরনের আয়োজনের সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। উৎসবের সময় মানুষ একে অন্যের সঙ্গে কথা বলেন, পরিচিত হন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য থাকলেও উৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় সৌহার্দ্যের পরিবেশ।

তবে বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ চলাচল এবং বয়স্ক ও শিশুদের সুবিধার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব বিষয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পূজার আনন্দ আরও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠতে পারে। 

উপজেলা শহরের পরিচয় ছাপিয়ে উৎসবের জনপদ

শ্রীমঙ্গল প্রশাসনিকভাবে একটি উপজেলা শহর। কিন্তু চা-শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে দেশের অনেক মানুষের কাছে এর পরিচিতি বিস্তৃত। জেলা শহর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা থাকলেও প্রশাসনিক মর্যাদার চেয়ে শহরটির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বই এখানে বেশি দৃশ্যমান।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে যাঁরা শ্রীমঙ্গলে আসেন, তাঁদের কাছে চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু উৎসবের সময় শহরটি অন্য এক রূপ ধারণ করে। দুর্গাপূজার আলোকসজ্জা, প্রতিমা দর্শন, মানুষের ভিড় এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ সেই রূপকে আরও বর্ণিল করে তোলে।

শাপলাবাগের পূজামণ্ডপ তাই শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজনের স্থান নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের উৎসবমুখর সামাজিক জীবনেরও একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের অংশগ্রহণ, স্বেচ্ছাসেবকদের শ্রম এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা আন্তরিক যোগাযোগ।

শরতের কয়েকটি দিন এই মণ্ডপকে ঘিরে মানুষের যে সমাগম ঘটে, তা মনে করিয়ে দেয়—উৎসবের সৌন্দর্য শুধু আলোকসজ্জা কিংবা প্রতিমার কারুকাজে নয়, মানুষের মিলনেও। চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের শাপলাবাগে দুর্গোৎসব সেই মিলনেরই এক বর্ণিল প্রকাশ।



Leave Your Comments




ধর্ম এর আরও খবর