প্রকাশিত : ১৭:১৪
১০ অক্টোবর ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাজার পড়লেই একটা প্রশ্ন ফিরে আসে: দায় কার? আর প্রতিবারই উত্তর খোঁজা হয় অন্যের দিকে আঙুল তুলে। নিয়ন্ত্রক বলেন, বিনিয়োগকারীরা অতিলোভী। বিনিয়োগকারী বলেন, কারসাজি হয়েছে। ব্রোকার বলেন, নীতিই ঠিক নেই। নীতিনির্ধারক বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি খারাপ। সবাই কিছুটা ঠিক বলছেন, তাই শেষ পর্যন্ত কেউই দায়ী থাকেন না।
প্রথম আঙুলটা তাই উঠবে নিয়ন্ত্রকের দিকে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাজ বাজারে আস্থা তৈরি করা। বাস্তবে কমিশনের অনেক সিদ্ধান্ত এসেছে সংকটের ধাক্কায়, কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে নয়। দাম ধরে রাখতে ফ্লোর প্রাইস বসানো হয়েছিল। তাতে দাম স্থির থাকল, কিন্তু ক্রেতা হারিয়ে গেলেন। আটকে থাকা বাজারে লেনদেন শুকিয়ে যায়, আস্থা ফেরে না। এর চেয়েও বড় ক্ষত কারসাজির বিচারহীনতা। তদন্ত হয়, কমিটি বসে, প্রতিবেদন জমা পড়ে। কিন্তু কারসাজিতে যে মুনাফা ওঠে, জরিমানার অঙ্ক তার কাছে হাস্যকর। ২০১০ সালের ধসের পর হাজার হাজার বিনিয়োগকারী সর্বস্ব খুইয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই আজও জানেন না, সেই ক্ষতির জন্য কার কী শাস্তি হয়েছিল।
দ্বিতীয় দায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির। যাঁরা বাজার থেকে টাকা তোলেন, তাঁরা বিনিয়োগকারীর কাছে জবাবদিহির দায়ও নেন। কিন্তু এই দায় সবসময় পালিত হয় না। এমন কোম্পানি আছে, যাদের বছরের পর বছর লভ্যাংশ নেই, অথচ শেয়ারের দর ওঠানামা করে হাতবদল আর গুজবের জোরে। পরিচালকেরা নিজেদের শেয়ার ধীরে ধীরে ছেড়ে দেন, আর সাধারণ বিনিয়োগকারী সেই শেয়ার কেনেন। অন্যদিকে ভালো ও স্বচ্ছ কোম্পানিগুলো তালিকায় আসতেই চায় না। কারণ আসতে গেলে ঝক্কি অনেক, প্রাপ্তি অনিশ্চিত। ফলে বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা কমে, আর যেগুলো থাকে, তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তৃতীয় দায় সরকার ও নীতিনির্ধারকদের। রাষ্ট্রের কাছে পুঁজিবাজার প্রায়ই ঝামেলার জায়গা, যার কথা মনে পড়ে কেবল সংকটের সময়। ব্যাংকের সুদের হার, করকাঠামো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি, সব ক্ষেত্রেই একই অনিশ্চয়তা। বড় বড় প্রতিষ্ঠান বাজারের বাইরে থেকে যায়, আর যাঁরা বাজারে আছেন, নীতির ওপর ভরসা করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আজ এক ঘোষণা, কাল অন্য সিদ্ধান্ত। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এভাবে হয় না।
চতুর্থ দায় বাজারের গড়নের। আমাদের বাজার এখনও মূলত খুচরা বিনিয়োগকারীর বাজার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভিত দুর্বল, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও বাজার সামলানোর মতো শক্ত নয়। ফলে একটা গুজব বা একটা সিদ্ধান্ত পুরো বাজারকে কাঁপিয়ে দেয়। ঝুঁকি না বুঝেই সঞ্চয়ের টাকা নিয়ে বাজারে নামেন, এমন মানুষের সংখ্যাই এখানে বেশি। তাঁরা পড়েন সবার আগে, ওঠেন সবার পরে।
এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো ছোট বিনিয়োগকারীকে দোষ দেওয়া। বলা হয়, তাঁরা লোভী, তাঁরা হুজুগে চলেন। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। কিন্তু যে বাজারে আইনের প্রয়োগ দুর্বল, তথ্যের বণ্টন অসম, আর বড় খেলোয়াড়েরা ধরা পড়েন না, সেখানে সাধারণ মানুষের হুজুগ আসলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা। দায়ের তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও সেটা সবার শেষে।
তাহলে উত্তর কী? দায় ভাগাভাগির। তবে ভাগাভাগি মানে দায়মুক্তি নয়। নিয়ন্ত্রককে দেখাতে হবে, কারসাজি করলে শাস্তি হয়, আর সেই শাস্তি চোখে পড়ার মতো। কোম্পানিকে মানতে হবে, তালিকাভুক্তি মানে মালিকানার ভাগ দেওয়া, শুধু মূলধন তোলার সুযোগ নয়। সরকারকে ঠিক করতে হবে, অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের জায়গা কোথায়, এবং সেই অবস্থানে স্থির থাকতে হবে। আর বিনিয়োগকারীকে বোঝাতে হবে, সঞ্চয় ও ঝুঁকির মধ্যে ফারাকটা কোথায়।
এর কোনোটাই রাতারাতি হবে না। কিন্তু প্রতিবার ধসের পর যদি একই প্রশ্ন, একই তর্ক আর একই নীরবতা ফিরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে আমরা সমস্যার গভীরে ঢুকিনি, ঘুরছি তার চারপাশে। বাজারের আস্থা ফিরবে সেদিন, যেদিন কেউ সামনে এসে বলবেন, এই ভুলটা আমার ছিল।