প্রকাশিত : ১৬:২৮
১০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:৩২
১০ অক্টোবর ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত এখন গভীর সংকটে। শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতির লিজ অর্থায়ন আর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি বিনিয়োগে গতি আনতে এই খাতের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নীতির পথ থেকে সরে যাওয়া আর অদূরদর্শী ব্যবসায়িক মডেলের মাশুলে পুরো খাতই এখন অর্থসংকটের অতল গহ্বরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে খেলাপি ঋণের হার মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে চালু ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিই গুরুতর সমস্যায় আছে। এর মধ্যে ৯টির খেলাপি ঋণ ৮০ থেকে ৯৬ শতাংশে ঠেকেছে। এটি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, গোটা খাতের নীতিগত দেউলিয়াত্বেরই স্পষ্ট ছবি।
বিপর্যয়ের তিন ভুল
এই বিপর্যয়ের পেছনে তিনটি বড় ভুল কাজ করেছে। প্রথমত, গ্রামীণ ও মফস্বল অর্থনীতিকে উপেক্ষা করে ঢাকাকেন্দ্রিক কর্পোরেট ব্যবসায় আটকে থাকা। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও কৃষি ঋণে ভারসাম্য না রেখে একেকটি বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে লাগামহীনভাবে অর্থ তুলে দেওয়া। তৃতীয়ত, আমানতকারীদের মেয়াদি অর্থ শেয়ারবাজারের মতো উচ্চ ঝুঁকির বাজারে খাটিয়ে লোকসানের পাহাড় গড়া।
ঢাকা-চট্টগ্রামে আটকে মফস্বল
শাখা বিন্যাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ শাখা ও নিয়ন্ত্রণ ঢাকা ও চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত। প্রান্তিক ও মফস্বল এলাকায় সম্ভাবনাময় উৎপাদনশীল খাত থাকলেও লিজিং কোম্পানিগুলো গ্রামমুখী হয়নি। এর প্রধান কারণ তহবিলের উচ্চ ব্যয় আর পরিচালন খরচের হিসাব। চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের মাধ্যমে কম সুদে আমানত সংগ্রহের সুযোগ তাদের নেই। তাদের আমানত কাঠামোর ৯৬ দশমিক ৯২ শতাংশই মেয়াদি আমানতনির্ভর। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় তাদের তহবিলের গড় খরচ সাধারণত ২ থেকে ৪ শতাংশ বেশি। মফস্বলে ছোট অঙ্কের ঋণ দিলে প্রতিটি ঋণের হিসাব রাখা ও তদারকির খরচ বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত উপশাখা বা ডিজিটাল অবকাঠামো না থাকায় ১ থেকে ৫ লাখ টাকার লিজ অর্থায়ন তাদের কাছে ব্যয়বহুল মনে হয়েছে। অন্যদিকে মতিঝিল বা গুলশানের একটি অফিসে বসে একজন কর্পোরেট গ্রাহককে ৫০ বা ১০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া প্রশাসনিকভাবে সহজ ও সাশ্রয়ী ছিল। কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদি সুবিধাই দীর্ঘ মেয়াদে পুরো খাতের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে।
ব্যাংকের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা
লিজিং কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল ছিল ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমে বড় কর্পোরেট ঋণ দেওয়া। সস্তা তহবিল হাতে থাকায় ব্যাংকগুলো কম সুদে কর্পোরেট ঋণ দিতে পারে। অথচ এনবিএফআইগুলো চড়া সুদে তহবিল সংগ্রহ করে বড় কর্পোরেটদের ঋণ দিয়েছে। ফলে যেসব গ্রাহক তারা পেয়েছে, তাদের বড় অংশই ছিল বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ফিরে আসা অথবা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। বড় অঙ্কের কর্পোরেট ঋণের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঘনীভূত ঝুঁকি চরম আকার নিয়েছে। একটি বড় শিল্প গোষ্ঠী বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে পুরো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান কর্পোরেট ঋণের নামে ভুয়া ও বেনামি প্রতিষ্ঠানে অর্থ সরিয়ে দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে।
ঝুঁকি কমানোর পথ ছিল কৃষি ও এসএমই
এখন প্রশ্ন হলো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতি, যেমন ট্রাক্টর, সেচ পাম্প ও হারভেস্টার লিজ দিতে কিংবা মফস্বলের সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করত, তাহলে তাদের সম্পদের সুরক্ষা ও নিট সম্পদমূল্য মজবুত থাকত। আর্থিক পোর্টফোলিও তত্ত্ব অনুযায়ী, ঋণঝুঁকি কমানোর মূল ভিত্তি বৈচিত্র্যকরণ। একটি বড় কর্পোরেট ঋণে ঝুঁকি অনেক বেশি। অথচ হাজার হাজার কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ঋণ দিলে প্রতিটি ঋণের অংশ হয় ছোট, ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত খেলাপির ঝুঁকি নগণ্য পর্যায়ে নেমে আসে। বাংলাদেশে এসএমই ও কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের হার ঐতিহাসিকভাবে মাত্র ২ দশমিক ৮ থেকে ৫ শতাংশ, যা কর্পোরেট খাতের তুলনায় অনেক কম। ক্ষুদ্র কৃষক বা খামারিরা ঋণের কিস্তি শোধে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা মেনে চলেন। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি ও সিএমএসএমই খাতের জন্য ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালায়। লিজিং কোম্পানিগুলো কৃষকদের লিজ অর্থায়ন দিলে এই সস্তা তহবিল কাজে লাগিয়ে তহবিলের গড় খরচ কমাতে পারত। এতে সরাসরি তাদের নিট সুদ মার্জিন ও সম্পদের মান বাড়ত।
শেয়ারবাজারের ফাঁদ
আসল কথা হলো, লিজিং কোম্পানির প্রকৃত দায়িত্ব বাস্তব অর্থনীতিতে মূলধনি সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি জোগান দেওয়া। কিন্তু উচ্চ তহবিল ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট মুনাফার ঘাটতি দ্রুত পোষাতে এনবিএফআইগুলোর বড় অংশ শেয়ারবাজারের সেকেন্ডারি মার্কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে নামে এবং নির্ধারিত ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার সীমা লঙ্ঘন করে। কোনো এনবিএফআই যখন আমানতকারীর মেয়াদি অর্থ সুদে এনে শেয়ারবাজারে খাটায়, তখন দ্বিগুণ আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের বিপুল মার্জিন ঋণ দিয়েছে। শেয়ারবাজারে দীর্ঘ মেয়াদি ধসের পর সেই মার্জিন ঋণের বিপরীতে রাখা সিকিউরিটিজের মূল্য ঋণের অঙ্কের নিচে নেমে যায়। এই ঋণাত্মক ইক্যুইটি আর কখনো উদ্ধার করা যায়নি। নিজস্ব পোর্টফোলিও থেকে সরাসরি শেয়ারবাজারে করা বিনিয়োগও বাজার ধসে মূলধন শূন্য করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রুডেনশিয়াল নির্দেশনা অনুযায়ী পুঞ্জীভূত লোকসানের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য ও টিয়ার ওয়ান মূলধন পুরোপুরি ঋণাত্মক হয়ে গেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজ স্বল্পমেয়াদি চলতি মূলধন ও বড় কর্পোরেট অর্থায়ন। আর এনবিএফআইয়ের মূল কাজ ছিল সম্পদভিত্তিক লিজ অর্থায়ন, ট্রাক্টর ও যন্ত্রপাতি লিজ এবং টেকসই শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা। শেয়ারবাজারে ফটকাবাজি করতে গিয়ে তারা নিজেদের লাইসেন্সের শর্ত থেকেই সরে গেছে।
পুনর্গঠনের পথ
এই খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে পুনর্গঠন করতে হলে নীতি সংস্কারের বিকল্প নেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ পোর্টফোলিওর একটি নির্দিষ্ট অংশ সিএমএসএমই, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও সরঞ্জাম লিজ খাতে বিতরণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এই বিতরণ সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ভৌত শাখার বাড়তি খরচ এড়াতে এনবিএফআইকে ফিনটেক ও উপশাখার মাধ্যমে মফস্বল অর্থনীতিতে যুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে একক গ্রাহকের এক্সপোজার সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মূলধনের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখা দরকার, যাতে একটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর খেলাপিতে পুরো প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে না পড়ে। সাধারণ আমানতকারীর ফিক্সড ডিপোজিটের অর্থ দিয়ে শেয়ারবাজারে সেকেন্ডারি লেনদেন বা মার্জিন ঋণ দেওয়া স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে এবং ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ঋণাত্মক মূলধন ও চরম খেলাপিতে ভুগছে, সেগুলোকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রেজোলিউশন অধ্যাদেশের আওতায় এনে দ্রুত অবসায়ন অথবা সুস্থ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করলে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব।
এনবিএফআই খাত শেয়ারবাজারের জুয়ার আসর বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত কোষাগার হয়ে থাকতে পারে না। এই খাতকে ফিরতে হবে নিজের মূল কাজে, অর্থাৎ বাস্তব অর্থনীতির জন্য যন্ত্রপাতি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং টেকসই শিল্প অবকাঠামোর অর্থায়নে। তা না হলে আজ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আমানতকারীরা, কাল পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকেই এর মাশুল দিতে হবে।