প্রকাশিত : ১০:০৪
১০ অক্টোবর ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের ‘চায়ের স্বর্গরাজ্য’ ও পর্যটননগরী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এবার ১৭৩টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন এবং বিসর্জনস্থলে নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় শ্রীমঙ্গল থানার একটি কক্ষে আয়োজিত দুর্গাপূজার আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক মতবিনিময় সভায় এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও পূজা ফ্রন্টের উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বাবলু কুমার পালের সঞ্চালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সভায় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে—এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়। কোনো ধরনের অপতৎপরতা বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড নজরে এলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্যও অনুরোধ করা হয়।
সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহসভাপতি অজয় কুমার দেব, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সুদীপ দাস রিংকু, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক সৈয়দ সালাউদ্দিন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তী, পৌর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সম্পাদক বিশ্বনাথ দাস চৌধুরী ছোটন, শিক্ষক কল্যাণ দেব এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা পূজা ফ্রন্টের সদস্যসচিব বসন্ত গোয়ালা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দীপেন্দ্র ভট্টাচার্য, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক লোকেশ রঞ্জন দেব, সুনীল রায়, পূজা ফ্রন্টের আহ্বায়ক সুজিত রায়, অবিনাশ আচার্য, পরিমল দাশ, সুমন রায় এবং সিন্দুরখান ইউনিয়ন পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি সুরঞ্জিত রায় তপনসহ উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট কমিটির নেতৃবৃন্দ।
সভায় আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পুলিশ, পূজা উদ্যাপন কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উৎসবের কেন্দ্রে শ্রীমঙ্গল
সিলেট বিভাগের অন্যতম জমকালো দুর্গাপূজার আয়োজন হয় শ্রীমঙ্গলে। চা-বাগান, সবুজ পাহাড় আর পর্যটনকেন্দ্র ঘেরা এই উপজেলায় দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানুষের মিলন ও আনন্দের বড় উপলক্ষ।
দেশ-বিদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও শ্রীমঙ্গলের কয়েকটি পূজামণ্ডপের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। প্রতিবছর এসব মণ্ডপে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। মন্দিরে প্রার্থনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ গ্রহণের পাশাপাশি পূজার উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করেন তাঁরা।
শ্রীমঙ্গল শহরের মৌলভীবাজার সড়কের সর্বজনীন দুর্গাবাড়ি, শ্রীশ্রী মঙ্গেশ্বরী কালীবাড়ি, শাপলা আবাসিক এলাকার দুর্গাবাড়ি, পূর্বাশা আবাসিক এলাকার জমকালো দুর্গাপূজা উৎসব, রূপসপুর আবাসিক এলাকার পূজামণ্ডপ ও রামকৃষ্ণ মিশনের পূজা উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চা-বাগানেও পূজার আয়োজন
শ্রীমঙ্গল উপজেলার চারপাশে রয়েছে চারটি শিল্পাঞ্চল এলাকা। উপজেলায় রয়েছে প্রায় ৫০টি চা-বাগান। এসব চা-বাগানে বসবাসকারী শ্রমিকদের বড় অংশই সনাতন ধর্মাবলম্বী। প্রতিটি বাগানেই দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়।
পূজার দিনগুলোতে চা-বাগান ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আবহ। নতুন পোশাক, পূজামণ্ডপে যাতায়াত, অঞ্জলি, প্রসাদ গ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে ব্যস্ত হয়ে ওঠে জনপদ।
সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম হয় বিজয়া দশমীর দিন। প্রতিমা বিসর্জনের সময় শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ শহরে জড়ো হন। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তরা শোভাযাত্রা নিয়ে বিসর্জনস্থলে যান। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও শেষবারের মতো দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান।
শারদীয় দুর্গোৎসবের এই বিপুল আয়োজনকে ঘিরে তাই নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন কমিটির প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় এবার সেই নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি পূজা কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগে উৎসবটি শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।