প্রকাশিত :  ০৮:৫৬
০৮ অক্টোবর ২০২৬

নানা পাটেকারের মৃত্যু, ভারতীয় চলচ্চিত্রে শেষ হলো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়

নানা পাটেকারের মৃত্যু, ভারতীয় চলচ্চিত্রে শেষ হলো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ অভিনেতা নানা পাটেকার আর নেই। ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানা গেছে। গোয়ার দোনা পাউলা এলাকায় নিজের বাসভবনে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

চার দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকার। শক্তিশালী সংলাপ, তীব্র অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার অভিনয় তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চলচ্চিত্র অঙ্গন ও ভক্তদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে স্মরণ করে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে ভোররাতে নানা পাটেকার শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করেন। বুকের বাম পাশে ব্যথা অনুভূত হওয়ার পর তিনি এক বন্ধুকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে ভোরের দিকে ওই বন্ধু তাঁর বাসভবনে পৌঁছান।

এরপর জরুরি চিকিৎসাসেবা ডাকা হয়। চিকিৎসাকর্মীরা বাসভবনে পৌঁছে তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় ধরে সিপিআরসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নানা পাটেকারের হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা চলছিল বলেও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয় বলে জানা গেছে।

তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য ময়নাতদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন থেকেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

অভিনয়ে যে স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছিলেন

মঞ্চ দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করা নানা পাটেকার পরে চলচ্চিত্রে এসে দ্রুত নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ ও ‘খামোশি’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে মনে রেখেছে।

বিশেষ করে তাঁর সংলাপ বলার ধরন ছিল স্বতন্ত্র। চরিত্রের আবেগকে উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করার পাশাপাশি সংযত মুহূর্তেও তিনি অভিনয়ের শক্তি ধরে রাখতে পারতেন। ফলে একই সঙ্গে মূলধারার দর্শক ও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছেও তিনি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন।

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে নিজের একটি স্বতন্ত্র অভিনয়ভাষা তৈরি করেছিলেন।

পর্দার বাইরে অন্য এক নানা

শুধু অভিনয় নয়, সমাজকল্যাণমূলক কাজেও নানা পাটেকারের ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষকদের সহায়তায় ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

কৃষক আত্মহত্যা, গ্রামীণ দারিদ্র্য ও পানিসংকটের মতো বিষয় নিয়ে তাঁর সামাজিক উদ্যোগ তাঁকে চলচ্চিত্রের বাইরেও পরিচিতি এনে দেয়। ফলে একজন অভিনেতার পরিচয়ের বাইরে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাতেও নানা পাটেকারের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল।

মৃত্যুর খবরে শোক

নানা পাটেকারের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনের বহু শিল্পী ও নির্মাতা তাঁকে স্মরণ করেছেন। সহশিল্পী ও দীর্ঘদিনের পরিচিতজনেরা তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতি তুলে ধরেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চলচ্চিত্রে নানা পাটেকারের স্বতন্ত্র ভূমিকা এবং স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

তাঁর সহশিল্পী রজনীকান্ত ও অক্ষয় কুমারসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদন এসেছে।

গুজবের ভিড়ে মৃত্যুসংবাদ

নানা পাটেকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যও দেখা যায়। এমন ঘটনায় যাচাই না করা ভিডিও, পুরোনো ছবি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

তাই তাঁর মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় হাসপাতাল, পরিবার, পুলিশ কিংবা প্রতিষ্ঠিত সংবাদ সংস্থার আনুষ্ঠানিক তথ্যকেই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেখে গেলেন দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্মৃতি

নানা পাটেকারের ক্যারিয়ার শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মঞ্চ, চলচ্চিত্র এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে তিনি ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি তৈরি করেছিলেন।

তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রকে নিজের মতো করে তুলে ধরা। কখনো কঠোর, কখনো আবেগপ্রবণ, কখনো ক্ষুব্ধ, আবার কখনো গভীর মানবিক চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের আলাদা করে আকৃষ্ট করেছে।

একজন অভিনেতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু একজন শিল্পীর জীবনই শেষ হয় না, কখনো কখনো একটি অভিনয়ধারারও একটি অধ্যায় শেষ হয়। নানা পাটেকারের ক্ষেত্রে সেই কথাটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। তাঁর অভিনীত চরিত্র, সংলাপ এবং সামাজিক কাজ ভারতীয় দর্শকের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।


Leave Your Comments




বিনোদন এর আরও খবর