প্রকাশিত : ১৫:১৭
০৬ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:৫৭
০৬ অক্টোবর ২০২৬
লন্ডন, ৫ অক্টোবর: ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা কারিশিল্পের সাফল্য, ঐতিহ্য, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাদের সম্মান জানিয়ে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৭তম কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬।
রোববার (৪ অক্টোবর) লন্ডনের অভিজাত ম্যাফেয়ার এলাকার পাঁচ তারকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বর্ণাঢ্য এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাঁচ শতাধিক অতিথির উপস্থিতিতে জমকালো অনুষ্ঠানে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, শেফ, উদ্যোক্তা, রাজনীতিক, মন্ত্রী, এমপি, লর্ড সভার সদস্য, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
বিবিসির জনপ্রিয় উপস্থাপক ও সাংবাদিক জন কে (Jon Kay) এবং লাক্সমি গোপাল (Luxmy Gopal) অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
চার বিভাগে ৪১ পুরস্কার
এবারের আয়োজনে চারটি প্রধান বিভাগে মোট ৪১টি পুরস্কার দেওয়া হয়। বিভাগগুলো হলো—Best Restaurant of the Year, Best Chef of the Year, Editor’s Choice of the Year এবং Best Takeaway of the Year।
হাজারো গ্রাহকের ভোটের পর বিচারকদের কঠোর মূল্যায়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ীদের নির্বাচন করা হয়। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলের রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে এবং শেফরা এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
ব্রাইটন থেকে বোল্টন, টনটন থেকে টিসসাইড—দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের কারিশিল্পের প্রতিনিধিরা এবারও পুরস্কারের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
কারি শিল্পের দীর্ঘ সাফল্যের উদ্যাপন
যুক্তরাজ্যের কারি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম কারি লাইফ ম্যাগাজিন। কারি লাইফ মিডিয়া গ্রুপের এই প্রকাশনা গত ১৭ বছর ধরে অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের মাধ্যমে কারিশিল্পে অসামান্য অবদান রাখা রেস্তোরাঁ মালিক, শেফ, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের স্বীকৃতি দিয়ে আসছে।
দ্বি-মাসিক বিজনেস-টু-বিজনেস এই ম্যাগাজিনটি যুক্তরাজ্যের প্রায় ১০ হাজার ভারতীয়, বাংলাদেশি, শ্রীলঙ্কান, নেপালি ও পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। এর আনুমানিক পাঠকসংখ্যা এক লাখেরও বেশি।
এক দশকের বেশি সময় ধরে কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস ব্রিটিশ কারি শিল্পের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
এর আগের আয়োজনে স্যার কিয়ার স্টারমার এমপি, ওয়েস স্ট্রিটিং এমপি, অ্যাঞ্জেলা রেনার এমপি ও লন্ডনের মেয়র সাদিক খানসহ ব্রিটিশ রাজনীতি ও গণমাধ্যমের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন জন স্নো, অ্যাডাম বোল্টন, মাইকেল বুয়ার্ক ও অ্যাঞ্জেলা রিপনের মতো খ্যাতিমান সম্প্রচারকেরা।
ব্যয় বৃদ্ধি ও দক্ষ কর্মীর সংকটের চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে কারি লাইফ ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা এবারের বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডসের ১৭তম আয়োজন ব্রিটিশ কারি শিল্পের উৎকর্ষ, কঠোর পরিশ্রম, স্থিতিশীলতা ও সৃজনশীলতার উদ্যাপন।
তিনি বলেন, দেশের রেস্তোরাঁগুলো বর্তমানে মজুরি ও উপকরণের দামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের কারণে দক্ষ কর্মীর সংকটও তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কারি শিল্পের জন্য আরও সহায়তা প্রয়োজন।
কারি লাইফ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সৈয়দ বেলাল আহমেদ বলেন, যুক্তরাজ্যের কারি শিল্পে দেশের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যবসায়ী ও রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তাদের অনেকে কাজ করছেন। তাঁদের কঠোর পরিশ্রম ও সাফল্যকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে কারি লাইফ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
রাজনীতিকদের উপস্থিতি ও কারি শিল্পের স্বীকৃতি
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রেন্ট ইস্টের এমপি ডন বাটলার। এছাড়া যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন আসনের একাধিক এমপি অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং তাঁদের নির্বাচনী এলাকার পুরস্কারপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁগুলোর প্রতি সমর্থন জানান।
উপস্থিত ছিলেন ওয়েমাউথের এমপি লয়েড হ্যাটন, টনটনের এমপি গিডিওন অ্যামোস ওবিই, লেস্টারের এমপি শওকত আদম এবং রুশনারা আলী এমপি।
বক্তারা বলেন, পুরস্কারপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁগুলো শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়; স্থানীয় কমিউনিটি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশ অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে কারি শিল্পের অবদান ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
প্রায় ৪ বিলিয়ন পাউন্ডের শিল্প
ব্রিটেনের কারি শিল্পের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন পাউন্ড। হাজার হাজার রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার মাধ্যমে এ খাত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
এই শিল্পে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তাদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক ধরে তাঁদের শ্রম, ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও রন্ধন ঐতিহ্য ব্রিটিশ কারি সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস তাই শুধু পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান নয়; এটি অভিবাসী উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সংগ্রাম, রেস্তোরাঁ শিল্পের সাফল্য এবং ব্রিটিশ সমাজে দক্ষিণ এশীয় খাদ্যসংস্কৃতির প্রতিষ্ঠিত অবস্থানেরও উদ্যাপন।
২০২৬ সালের পুরস্কারপ্রাপ্তরা
Editor’s Choice of the Year: সারে প্যালেস (ইওয়েল, সারে), লালা’স রেস্টুরেন্ট (লিডস/ব্র্যাডফোর্ড), মনসুন ম্যাজেস্টিক ইন্ডিয়ান ডাইনিং (নিউক্যাসল-আন্ডার-লাইম), রিভারসাইড স্পাইস (কোলচেস্টার), ডাউনহ্যাম তান্দুরি (ডাউনহ্যাম মার্কেট), চেন্নাই ইন্ডিয়ান কুইজিন (লিক), সেলিব্রিটিজ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট (কার্ডিফ), দ্য এবারডেইল পাব অ্যান্ড গ্রিল (উইগস্টন), আমনি চেস্টার (চেস্টার) এবং আই-নাগা রেস্টুরেন্ট (ওয়েস্ট উইকহ্যাম)।
Best Restaurant of the Year: দিলরাজ রেস্টুরেন্ট (ব্রিজনর্থ), রয়্যাল মাসালা (কিংসউইনফোর্ড), দ্য বোম্বে সোয়ানলি (সোয়ানলি), ইভসহাম বালতি (উর্সেস্টারশায়ার), দ্য ভাইসরয় (নিউহ্যাভেন), জালাপারি অব উডলি (উডলি), চৌরঙ্গী ইন্ডিয়ান কুইজিন (প্যাচাম), কিংস লিন তান্দুরি (কিংস লিন), কাভালি (স্টোন), লাসানি সাউথওয়েল (সাউথওয়েল), চিলি’স রেস্টুরেন্ট (ওয়েমাউথ), স্পাইস হেভেন (হুইচার্চ), সীটন তান্দুরি (সীটন কেয়ারু), ডা মাউন্ট গুর্খা (ওয়াটারলু), মালিহা অ্যান্ড তাজ বাঙালি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট (টনটন), স্পাইস ভিলেজ (নিউ অ্যাশ গ্রিন), আরিয়া ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট (ওয়াটফোর্ড), মনসুন রেস্টুরেন্ট (হলিউড, বার্মিংহাম) এবং স্পাইস মাস্টার (টাইলহার্স্ট, রিডিং)।
Best Chef of the Year: শেফ গয়াস উল্লাহ (কুইন্স হেড রেস্টুরেন্ট, রাগবি), শেফ আবদুল মালিক (সাফরন, লিক), শেফ শামসুল মিয়া (সিনামন লাউঞ্জ, হরবেরি), শেফ মোশাহিদ আলী ‘রাজ’ (নাজ ইন্ডিয়ান কুইজিন, হেস্কেথ ব্যাংক), শেফ সৈয়দ উসমানি (ইন্ডিয়ান কুইন টেকঅ্যাওয়ে, রাগবি), শেফ আবদুল মিয়া (প্রিন্স অব ইন্ডিয়া, ফাভারশাম) এবং শেফ সামির দেশাই লেস্টার (দ্য ব্রডওয়ে বার অ্যান্ড গ্রিল, লেস্টার)।
Best Takeaway of the Year: তাজ মহল নাইট (চেমসফোর্ড), ক্লে ওভেন টেকঅ্যাওয়ে (সাউথ ড্যাগেনহ্যাম), হেনলো তান্দুরি (হেনলো), লিটল ইন্ডিয়া (বোল্টন) এবং বে-লিফ টেকঅ্যাওয়ে (হুইটস্টোন, লন্ডন)।
আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা
কারি লাইফ মিডিয়া গ্রুপ আয়োজিত এবারের কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডসের পৃষ্ঠপোষক ছিল কোবরা বিয়ার, ওয়ার্ক পারমিট ক্লাউড, মিলগো (Mealgo) ও হিলসাইড ট্রাভেলস।
জাঁকজমকপূর্ণ এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে ব্রিটিশ কারি শিল্পের বহুমাত্রিক সাফল্য—যেখানে খাবারের স্বাদ ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে অভিবাসী উদ্যোক্তাদের শ্রম, ব্যবসায়িক সাফল্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্রিটিশ সমাজে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির গভীর প্রভাব।