প্রকাশিত :  ২০:৪৩
০৫ অক্টোবর ২০২৬

মালয়েশিয়ার বাজার খুলেছে, আমাদের প্রস্তুতি কোথায়?

মালয়েশিয়ার বাজার খুলেছে, আমাদের প্রস্তুতি কোথায়?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

দীর্ঘ অপেক্ষার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য আবার খুলেছে। সেখানে কর্মী নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে, নিয়োগকর্তারা কোটার অনুমোদন নিচ্ছেন, চাহিদাপত্র দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় গতি নেই। বিদেশের দরজা খোলার পরও যদি দেশের প্রশাসনিক দরজায় কর্মীদের আটকে থাকতে হয়, তাহলে শ্রমবাজার খোলার সুফল যাবে কোথায়?

প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সরকারি উদ্যোগটি আশাব্যঞ্জক। কর্মীদের ব্যয় নিয়োগকর্তারা বহন করবেন, এমন ব্যবস্থা হলে বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ করে বা জমি বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করা পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমবে। কিন্তু নীতি যতই ভালো হোক, বাস্তবায়ন ধীর হলে তার সুফল থাকে না। এখন সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।

মালয়েশিয়ার অংশে নিয়োগের প্রস্তুতি এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশে অনুমোদন, যাচাই, বহির্গমন ছাড়পত্র ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই কর্মীদের সুরক্ষা ও নিয়ম মানা নিশ্চিত করা। কিন্তু সুরক্ষার নামে যদি এমন ব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে একটি আবেদন কোথায় আটকে আছে তা কর্মী নিজেই জানেন না, তাহলে সেটি সুশাসনের লক্ষণ নয়।

এখানে বোয়েসেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোয়েসেলের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ অভিবাসন, স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী ভূমিকা থাকা দরকার। কিন্তু তদারকি ও সমন্বয়ের বদলে যদি পুরো প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়, তাহলে গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই থাকবে, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ যেন কর্মী পাঠানোর পথে বাধা না হয়।

বৈধ বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি। অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু বৈধ এজেন্সিগুলোর সক্ষমতাকে কাজে না লাগিয়ে সবকিছু একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করলে প্রশাসনিক চাপ বাড়বে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত নিয়ম নির্ধারণ, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অতীত আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে এই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। কিন্তু পুরোনো অনিয়ম ঠেকাতে গিয়ে যদি নতুন আমলাতান্ত্রিক জট তৈরি হয়, তাহলে কর্মীদের দুর্ভোগের ধরন বদলাবে, দুর্ভোগ কমবে না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সময়। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করবেন না। বাংলাদেশ সময়মতো কর্মী দিতে না পারলে তারা অন্য দেশ থেকে কর্মী নেবে। ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ নিতে প্রস্তুত। একটি শ্রমবাজারে সুযোগ হারানো মানে শুধু কয়েক হাজার চাকরি হারানো নয়। এর সঙ্গে হারাতে হয় ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাও।

একজন প্রবাসী কর্মীর পাঠানো অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে জীবনের অবলম্বন। সেই অর্থে ঋণ পরিশোধ হয়, সন্তানের পড়াশোনা চলে, ঘর তৈরি হয়, চিকিৎসার খরচ মেটে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ভূমিকা রাখে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অকারণ বিলম্বকে কেবল দাপ্তরিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আরেকটি ঝুঁকি আরও গুরুতর। সরকারি প্রক্রিয়া যত জটিল হয়, দালালের প্রভাব তত বাড়ে। কর্মী যখন সরকারি ব্যবস্থায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পান না, তখন তিনি অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সেখান থেকেই প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। নিরাপদ অভিবাসনের লক্ষ্য তখন ব্যর্থ হয়।

এখন সরকারের সামনে তাই কাজ একটাই: প্রক্রিয়ার জট খুলতে হবে। বোয়েসেলকে কার্যকর সমন্বয় ও তদারকির ভূমিকায় রেখে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নির্ধারিত নিয়মে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স, ভিসা ও বহির্গমন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার। আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, কোথায় আটকে আছে, কেন আটকে আছে, তা কর্মীর জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, ফাইল আটকে রাখার সুযোগ কমবে এবং দালালনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে এখন আর নতুন ঘোষণা দরকার নেই। দরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বিদেশের নিয়োগকর্তা প্রস্তুত, কর্মীরা অপেক্ষায়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি এখনও ধীরগতির থাকে, তবে এই সুযোগ অন্যরা নিয়ে নেবে।

আমরা যেন আবারও শ্রমবাজার হারিয়ে পরে কারণ খুঁজতে না বসি। কারণ এবার সমস্যাটি বাজার বন্ধ হওয়া নয়। বাজার খোলা থাকার পরও কর্মী পাঠাতে না পারার ঝুঁকি।

মালয়েশিয়ার দরজা খুলেছে। এখন বাংলাদেশের কাজ হলো, নিজের দরজাটা সময়মতো খুলে দেওয়া।


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর