প্রকাশিত :  ১০:৩৭
০৩ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৭
০৩ অক্টোবর ২০২৬

সূচকের পতন, লেনদেন বৃদ্ধি: আয়ের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে পুঁজিবাজার

নজরে বস্ত্র ও মিউচুয়াল ফান্ড

সূচকের পতন, লেনদেন বৃদ্ধি: আয়ের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে পুঁজিবাজার

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার পুঁজিবাজারে একদিকে লেনদেন বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে অধিকাংশ শেয়ারের দর। এতে বাজারের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতিতে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে নতুন অর্থ বিনিয়োগের প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এমনটা বলার মতো শক্তিশালী সংকেত এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং করপোরেট আয়ের পরবর্তী চিত্র, সুদের হার, তারল্য পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন বাজারের অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ।

সর্বশেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৮ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৩১ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে নেমেছে। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস কমেছে ২ দশমিক ২০ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। আর বাছাই করা বড় মূলধনের ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ।

সূচকের এই পতনের বিপরীতে মোট লেনদেন বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। দিন শেষে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭২০ কোটি টাকা।

তবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও বাজারের ভেতরের চিত্র ছিল দুর্বল। মোট ৩৯৫টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৪০টির দর কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে ৮৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৭১টির।

অর্থাৎ লেনদেনের গতি ছিল তুলনামূলক বেশি, কিন্তু সেই অর্থপ্রবাহ অধিকাংশ শেয়ারের দর বাড়াতে পারেনি।

বড় লেনদেনেও দরপতন

ব্লক মার্কেটেও দিনের লেনদেনে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম দেখা গেছে। ডিএসইর মোট লেনদেনের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে ব্লক মার্কেট থেকে। এ বাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে আইপিডিসি ফাইন্যান্সে। কোম্পানিটির প্রায় ৫১ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হলেও দিন শেষে এর দর কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষণে এই ধরনের চিত্র গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বড় অঙ্কের লেনদেন সব সময় সংশ্লিষ্ট শেয়ারে দর বাড়ার সংকেত দেয় না। বড় লেনদেনের পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতার চাপ কোন দিকে বেশি, সেটিও বাজারের গতিপথ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

করপোরেট আয়ের হিসাব এখন গুরুত্বপূর্ণ

বাজারের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরবর্তী প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল। কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ অপেক্ষার অবস্থানে থাকতে পারেন।

বিশেষ করে উৎপাদননির্ভর কোম্পানিগুলোর জন্য জ্বালানি ব্যয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাঁচামালের মূল্য এবং অর্থায়ন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব ব্যয় বেড়ে গেলে বিক্রয় বাড়লেও পরিচালন মুনাফা প্রত্যাশা অনুযায়ী নাও বাড়তে পারে।

এ কারণে সামনের দিনগুলোতে কোম্পানির শেয়ারদর নির্ধারণে শুধু বাজারের সামগ্রিক মনোভাব নয়, কোম্পানিভিত্তিক আয়ের সক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখবে।

সুদের হারও বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে উচ্চ সুদের পরিবেশ বজায় থাকলে ব্যাংক ঋণের ব্যয় বাড়ে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগের তুলনায় নির্দিষ্ট আয়ের কিছু উপকরণ তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব পুঁজিবাজারের তারল্য পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।

সূচকের চেয়ে এখন খাতভিত্তিক লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমান বাজারে সূচকের ওঠানামার পাশাপাশি কোন খাতে অর্থ যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ কার্যদিবসের তথ্য অনুযায়ী বস্ত্র খাত মোট লেনদেনের ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ দখল করেছে। অর্থাৎ বাজারের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে এই খাতে।

বস্ত্র খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের পেছনে রপ্তানি পরিস্থিতি, কোম্পানির অর্ডার প্রবাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং শেয়ারদরের বর্তমান মূল্যায়ন ভূমিকা রাখতে পারে। তবে খাতটির সব কোম্পানির আর্থিক অবস্থা এক নয়। তাই শুধু খাতের লেনদেনের পরিমাণ দেখে কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

ওষুধ ও রসায়ন খাতেও লেনদেনের অংশ ছিল উল্লেখযোগ্য, ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সর্বশেষ কার্যদিবসে খাতটি শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে। বাজারের দুর্বলতার মধ্যেও এই খাতের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকতে পারে।

সাধারণ বীমা খাতে মোট লেনদেনের অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে খাতটি দিন শেষে ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এতে বোঝা যায়, লেনদেনের পরিমাণ বেশি হলেও তা দর বৃদ্ধির নিশ্চয়তা তৈরি করছে না।

ট্যানারি ও মিউচুয়াল ফান্ডে আলাদা চিত্র

সার্বিক বাজার যখন নিম্নমুখী, তখন ট্যানারি খাতের পারফরম্যান্স ছিল বিপরীতমুখী। সর্বশেষ কার্যদিবসে খাতটি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দিয়েছে।

অন্যদিকে সাপ্তাহিক হিসাবে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের রিটার্ন ছিল ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বাজারে খাতটির সাম্প্রতিক কার্যক্রম বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে।

মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে বাজারদর ও নিট সম্পদমূল্যের (NAV) পার্থক্য, তহবিলের সম্পদের গুণমান, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে খাতটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়।

পরবর্তী অধিবেশনে কী দেখবেন বিনিয়োগকারীরা

সাম্প্রতিক লেনদেন ও সূচকের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় পরবর্তী অধিবেশনে বাজার সীমিত পরিসরে ওঠানামা করতে পারে। ডিএসইএক্সের ক্ষেত্রে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫২০ পয়েন্টের অঞ্চলটি বাজারের জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট সূচকস্তরকে নিশ্চিত সমর্থন বা প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচনা করার আগে লেনদেনের গভীরতা এবং শীর্ষ মূলধনের কোম্পানিগুলোর আচরণ দেখা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক দরপতনে তুলনামূলকভাবে কম দামে নেমে আসা কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে দর কষাকষি হতে পারে। এতে দিনের কোনো পর্যায়ে সূচকে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। কিন্তু অধিবেশনের শেষ দিকে মুনাফা তুলে নেওয়া বা লোকসান কমানোর জন্য বিক্রির চাপ বাড়লে সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ৬৫০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকার মধ্যে লেনদেন হলে তা বাজারে মাঝারি মাত্রার অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে লেনদেনের পরিমাণের চেয়ে অর্থ কোন খাতে যাচ্ছে এবং দর বাড়ার সঙ্গে লেনদেনের সমন্বয় হচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারে এখন বাছাইয়ের সময়

পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোম্পানি বাছাই। শুধু সূচক কমেছে বা কোনো একটি খাত সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কোম্পানির আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, সুদ ব্যয়, লভ্যাংশের ইতিহাস, ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং বর্তমান শেয়ারদর কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে উৎপাদন বন্ধ থাকা, ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক আয় বা দুর্বল নগদ প্রবাহ থাকা কোম্পানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বিপরীতে ধারাবাহিক আয় ও নগদ প্রবাহ রয়েছে এমন কোম্পানির শেয়ার দর সংশোধনের সময় বাজারে আলাদা আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

সংস্কারের প্রত্যাশা বনাম স্বল্পমেয়াদি চাপ

পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ শুধু দৈনিক সূচকের ওপর নির্ভর করছে না। বাজারের নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, মিউচুয়াল ফান্ড কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার উন্নয়নও ভবিষ্যতের বাজার কাঠামো নির্ধারণ করবে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং লেনদেন ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের মতো উদ্যোগ বাজারে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সংস্কারের সুফল সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে সূচকের গতিতে প্রতিফলিত হয় না। বাজারে তার প্রভাব দৃশ্যমান হতে সময় লাগে।

ফলে স্বল্পমেয়াদে করপোরেট আয়ের অনিশ্চয়তা, সুদের হার, তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বাজারকে প্রভাবিত করলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের কাঠামোগত সংস্কার এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মৌলভিত্তিই বড় বিষয় হয়ে থাকবে।

ঢাকার পুঁজিবাজার এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে লেনদেনের গতি ও সূচকের দিক একই বার্তা দিচ্ছে না। ৭২০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও ডিএসইএক্স কমেছে এবং অধিকাংশ শেয়ারের দর পতন হয়েছে। এর অর্থ, বাজারে অর্থের প্রবাহ পুরোপুরি থেমে নেই, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো সর্বস্তরে সমানভাবে ফিরে আসেনি।

সামনের অধিবেশনগুলোতে তাই সূচকের দৈনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি করপোরেট আয়ের ফলাফল, খাতভিত্তিক অর্থপ্রবাহ, সুদের হার এবং মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে চাহিদা বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

বাজারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সূচক কত পয়েন্ট বাড়বে বা কমবে, তা নয়। বরং নতুন অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং সেই অর্থ কি টেকসই আয়ের সক্ষমতাসম্পন্ন কোম্পানির দিকে যাচ্ছে, সেটিই আগামী দিনের বাজারের প্রকৃত শক্তি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর