প্রকাশিত : ১৫:৩০
০১ অক্টোবর ২০২৬
॥ হুসনা খান হাসি ॥
আমরা প্রায় সবাই একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি। এমন একটি সমাজ, যেখানে অন্যায় থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, মানুষ মানুষকে ঠকাবে না, কেউ কারও অধিকার হরণ করবে না। আমরা সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে কথা বলি, অন্যের ভুল ধরিয়ে দিই এবং পরিবর্তনের দাবি তুলি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেকে প্রশ্ন করি, “যে পরিবর্তন আমি সমাজের কাছে চাইছি, তার কতটুকু আমি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করছি?”
সমাজ আসলে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। সমাজ গড়ে ওঠে মানুষকে নিয়ে। প্রতিটি মানুষ তার আচরণ, মূল্যবোধ, চিন্তা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে সমাজের একটি অংশ হয়ে ওঠে। তাই সমাজের পরিবর্তনও শুরু হয় ব্যক্তির পরিবর্তন থেকে।
আমরা চাই সবাই সত্য কথা বলুক, কিন্তু নিজের স্বার্থে মিথ্যা বলার সময় অনেকেই বিবেককে নীরব করে দিই। আমরা চাই দুর্নীতি বন্ধ হোক, অথচ ছোটখাটো অনিয়মকে অনেক সময় “এতে কী এমন হয়েছে” বলে মেনে নিই। আমরা চাই মানুষ অন্যকে সম্মান করুক, কিন্তু মতের অমিল হলেই অন্যকে অপমান করতে দ্বিধা করি না। আমরা চাই রাস্তায় কেউ নিয়ম ভাঙবে না, অথচ নিজের প্রয়োজন হলে নিয়মকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
এই দ্বৈত আচরণই সমাজ পরিবর্তনের পথে বড় বাধা।
অন্যের পরিবর্তনের দাবি করা সহজ, নিজের পরিবর্তন কঠিন। কারণ অন্যের ভুল আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই, কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করতে হলে তাকাতে হয় নিজের ভেতরের দিকে। নিজের অহংকার, স্বার্থপরতা, হিংসা, অসততা ও দায়িত্বহীনতার মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়।
তবুও সত্যিকারের পরিবর্তনের শুরু সেখানেই।
একজন মানুষ যদি নিজের আচরণে সততা আনে, তাহলে তার পরিবারে তার প্রভাব পড়ে। একটি পরিবারে যদি দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মান তৈরি হয়, তার প্রভাব পড়ে আশপাশের মানুষের ওপর। অসংখ্য মানুষ যখন নিজেদের ছোট ছোট জায়গা থেকে সঠিক কাজ করার চেষ্টা করে, তখন ধীরে ধীরে সামাজিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসে।
আমরা অনেক সময় মনে করি, “আমি একা বদলে কী হবে?” কিন্তু বড় পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। একটি ছোট অভ্যাস থেকে একটি বড় সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। একজন মানুষ নিয়ম মেনে চললে হয়তো পৃথিবী বদলে যাবে না, কিন্তু সে তার সন্তানকে নিয়ম মানার শিক্ষা দিতে পারে। একজন মানুষ অন্যকে সম্মান করলে হয়তো সমাজ রাতারাতি বদলাবে না, কিন্তু তার আচরণ অন্য কারও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
পরিবর্তন তাই সবসময় বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না। কখনো তা শুরু হয় একটি মিথ্যা না বলা থেকে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা থেকে, নিজের ভুল স্বীকার করা থেকে, দায়িত্ব এড়িয়ে না যাওয়া থেকে কিংবা ক্ষমতা ও সুযোগের অপব্যবহার না করা থেকে।
আমরা সমাজের নেতাদের কাছে জবাবদিহি চাই, যা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে। আমরা নাগরিক হিসেবে কী করছি, কর্মক্ষেত্রে কীভাবে আচরণ করছি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছি, দুর্বল মানুষের প্রতি আমাদের মনোভাব কেমন, এবং নিজের সুবিধার জন্য আমরা কতটা অন্যায়কে মেনে নিচ্ছি, এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব শুধু কোনো সরকার, প্রতিষ্ঠান বা নেতার নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের আচরণ সেই সমাজের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই পরিবর্তনের দাবি করার পাশাপাশি পরিবর্তনের অংশ হওয়াও জরুরি।
নিজেকে পরিবর্তন করার অর্থ নিজের পরিচয় মুছে ফেলা নয়। বরং নিজের দুর্বলতাগুলোকে চিনে সেগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করা। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। নিজের স্বাধীনতার সঙ্গে অন্যের অধিকারের কথাও মনে রাখা। নিজের স্বার্থের পাশাপাশি বৃহত্তর স্বার্থের কথাও বিবেচনা করা।
আমরা যদি প্রত্যেকে অন্যকে বদলানোর আগে নিজেকে একবার প্রশ্ন করি, তাহলে হয়তো অনেক সমস্যার শুরুতেই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
সমাজ বদলানোর কথা বলা সহজ, কিন্তু নিজের অভ্যাস, চিন্তা ও আচরণ বদলানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমরা প্রায়ই অন্যের ভুলের হিসাব রাখি, কিন্তু নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে চাই না। অথচ একটি সমাজের চরিত্র গড়ে ওঠে তার মানুষের চরিত্র দিয়ে। তাই সমাজের পরিবর্তন কোনো দূরের স্বপ্ন নয়, এর শুরু আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে।
আমরা যদি সততার কথা বলি, তবে নিজের জীবনে সততাকে জায়গা দিতে হবে। আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, তবে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা যদি সম্মান চাই, তবে অন্যকেও সম্মান করতে হবে। আমরা যদি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই, তবে নিজেদের সুবিধার জন্য অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
শুধু অন্যকে বদলানোর অপেক্ষায় থাকলে পরিবর্তন কখনো সম্পূর্ণ হবে না। পরিবর্তনের প্রথম দায়িত্বটি নিজের কাঁধে নিতে হবে। কারণ একটি ভালো সমাজ তৈরি হয় হাজারো বড় বক্তৃতায় নয়, বরং লাখো মানুষের ছোট ছোট সঠিক কাজের মাধ্যমে।
তাই সমাজকে প্রশ্ন করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন। অন্যের ভুল ধরার আগে নিজের ভুল দেখুন। পরিবর্তনের দাবি তোলার আগে পরিবর্তনের উদাহরণ হয়ে উঠুন।
মনে রাখুন, সমাজের পরিবর্তনের জন্য হয়তো আপনার হাতে পুরো পৃথিবী নেই, কিন্তু আপনার নিজের আচরণটি আপনার হাতেই আছে। আর সেই একটি পরিবর্তনই হতে পারে আরও অনেক পরিবর্তনের শুরু।
সমাজ বদলানোর অপেক্ষা করবেন না। নিজেকে বদলান, নিজের চারপাশ বদলান, তারপর দেখুন পরিবর্তনের ঢেউ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কার্যকর করণীয় সংক্ষেপে:-
সমাজ পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের কাছ থেকে। এজন্য:
১- নিজের ভুল স্বীকার করুন এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করুন।
২-অসততা ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না, ছোট হলেও।
৩-প্রত্যেক মানুষকে সম্মান করুন, মতপার্থক্য থাকলেও।
৪-নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করুন এবং অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।
৫-সমালোচনার আগে আত্মসমালোচনা করুন।
৬-পরিবার থেকেই ভালো আচরণের চর্চা শুরু করুন এবং নিজে উদাহরণ তৈরি করুন।
৭-সামাজিক নিয়ম ও অন্যের অধিকারকে সম্মান করুন।
৮-অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ করুন।
-৯প্রতিদিন নিজের কাজ ও আচরণ মূল্যায়ন করুন।
১০-ভালো কাজকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, আমরাই সমাজ। তাই সমাজ বদলানোর অপেক্ষা না করে আজ থেকেই নিজেকে বদলানোর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আমি যে সমাজ চাই, সেই সমাজ গঠনে আজ আমি কী করছি?”