প্রকাশিত : ০৬:১৯
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করেছে উপজেলা প্রশাসন। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়। দুই মামলায় তাঁদের প্রত্যেককে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত মির্জাপুর ইউনিয়নের রায়পরান, কেদারপুর চা-বাগান ও দিনারপুর এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুল ইসলাম। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের একটি দল সহায়তা করে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ‘এসি ল্যান্ড শ্রীমঙ্গল’-এ প্রকাশিত এক পোস্টে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রশাসন জানায়, মির্জাপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কেদারপুর চা-বাগানের দিনারপুর ছড়ায় অভিযান চালানোর সময় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনরত অবস্থায় দুজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তাঁরা হলেন জুনেল ঝরা (৩০), পিতা পবণ ঝরা, ঠিকানা স্কুল লাইন, কেদারপুর চা-বাগান, মির্জাপুর ইউনিয়ন এবং সোহাগ মুন্ডা (২৪), পিতা গোপাল মুন্ডা, ঠিকানা দশঘর, দিনারপুর চা-বাগান, মির্জাপুর ইউনিয়ন।
পরে তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়। উভয় মামলায় প্রত্যেককে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে আরও বলা হয়, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে শ্রীমঙ্গলের সব সচেতন নাগরিকের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলে পাহাড়, বনাঞ্চল ও অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব ছড়াকে ছোট নদীও বলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী ও ধনী গোষ্ঠী এসব ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে বালু উত্তোলনে নিয়োজিত শ্রমিক, ভাড়া করা ট্রাকের চালক ও সহকারীকে আটক, ট্রাক জব্দ এবং জরিমানা করার ঘটনাও ঘটেছে। তবে অনেক সময় অভিযান পরিচালনার সময় বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত এসব সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে তালিকা তৈরি করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে বড় বড় রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রভাব শুধু পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরই পড়ছে না, বালুবাহী ট্রাকের চলাচল নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক বছরে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালের ১ জুলাই সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের পাত্রীকুল এলাকায় শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ৪৫ বছরের এক নারী ও তাঁর ৭ বছরের কন্যাশিশু নিহত হন।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ দুপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহজি বাজার এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় হবিগঞ্জ রোডস্থ কাদির ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদির (৬৫) নিহত হন।
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় তোসকা মারিয়ান নামের নেদারল্যান্ডসের এক নারী পর্যটক গুরুতর আহত হন।
২০২৫ সালের ১ জুন সাতগাঁও এলাকায় বেপরোয়া বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে সবজিবাহী পিকআপের যাত্রী ঝুনু বৈদ্য নিহত হন।
এরপর ২০২৬ সালের ১ জুন ভূনবীর চৌমুহনায় বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে সিএনজি ও ইজিবাইকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে শিপন ও রাসেলসহ ছয়জন গুরুতর আহত হন।
সর্বশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ রোডের সুরমাভ্যালী এলাকায় বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় আব্দুল মান্নান (৪০) নামের এক ইজিবাইক (টমটম) চালক নিহত হন।
একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন সড়কে বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বাড়ছে। তাঁদের দাবি, শুধু অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করলেই হবে না; বালুবাহী ট্রাকের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি এবং সড়কে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি ছড়া ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।