প্রকাশিত :  ১৭:৩৪
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৪৬
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আস্থা ও সংস্কারের নতুন সময়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

দীর্ঘ স্থবিরতা পেরিয়ে বাজারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত, বাড়ছে লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা

আস্থা ও সংস্কারের নতুন সময়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে হেঁটেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। কৃত্রিম মূল্যসীমার বাঁধন, তারল্যসংকট আর গুজবের ওপর ভর করা লেনদেনের চাপ, সবই তাকে সামলাতে হয়েছে। কখনো সূচকের পতন বিনিয়োগকারীদের ঘুম কেড়েছে, কখনো আবার অস্বাভাবিক উত্থান জাগিয়েছে অতিরিক্ত প্রত্যাশা। সেই টানাপোড়েনের মাঝেই এখন বাজারে ধীরে ধীরে অন্য একটি সুর শোনা যাচ্ছে।

আইন ও বিধিবিধানের পরিবর্তন, তদারকিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ এবং বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি, সব মিলিয়ে বাজার যেন এক নতুন পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। এই সময়ে আসল প্রশ্নটি আর কেবল সূচকের ওঠানামা নিয়ে নয়। আস্থা, স্বচ্ছতা আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি বাজারে কতটা শিকড় গেড়েছে, সেটিই এখন মুখ্য বিষয়।

সংস্কারের পথে বদলে যাচ্ছে কাঠামো

বাজারে আস্থা ফেরানোর প্রথম শর্ত একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নানা সংস্কার উদ্যোগ আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। দীর্ঘদিনের ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা তুলে দিয়ে শেয়ারের দাম নির্ধারণ আরও বেশি করে চাহিদা ও জোগানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পথে হাঁটা হয়েছে। মার্জিন রুলস, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস আধুনিকায়নের উদ্যোগও কাঠামোগত পরিবর্তনের এই ধারারই অংশ।

স্বচ্ছতা বাড়াতে তদারকিতেও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাক অফিসে অপরিবর্তনযোগ্য সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ লেনদেন ও হিসাবসংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষিত রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ৩৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এর আওতায় এসেছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও পরিদর্শনের গতিও বেড়েছে। গত ১৮ মাসে ১১৪টি বিস্তারিত তদন্ত এবং ৬৪টি পরিদর্শনের তথ্য বলছে, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগ কতদিন টিকবে, তা নির্ভর করবে প্রয়োগের ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি আর আইনের সমান প্রয়োগের ওপর।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় নতুন বার্তা

বিনিয়োগকারীর আস্থা কেবল সূচকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। নিজের অর্থ কতটা নিরাপদ, এই বোধও সমান জরুরি। সেদিক থেকে ইনভেস্টমেন্ট প্রটেকশন ফান্ড থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ বিশেষ মনোযোগ কেড়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি খেলাপি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন। সংশ্লিষ্ট হিসাবে দেখা যায়, এতে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ নিজেদের পাওনা অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এই উদ্যোগের আর্থিক মূল্যের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কম নয়। একজন ছোট বিনিয়োগকারী যখন বোঝেন, বিপদে পড়লেও তাঁর অধিকার পুরোপুরি অরক্ষিত থাকবে না, তখন বাজারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাও বদলে যেতে পারে।

সূচকে উত্থান, বাড়ছে লেনদেন

সংস্কারের প্রভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৬২ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। আগের অর্থবছরের চেয়ে এটি ৯২৪ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট, অর্থাৎ ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে ডিএস৩০ সূচক প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। বাজার মূলধন পৌঁছেছে প্রায় ৬ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকায়। অর্থবছরের শেষ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার, যেখানে আগের বছরের একই দিনে তা ছিল ৪৬৪ কোটি টাকার কাছাকাছি।

অর্ধবার্ষিক হিসাবেও একই চিত্র দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গড় দৈনিক লেনদেন প্রায় ৪০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

তবে শুধু সূচকের অঙ্ক দিয়ে বাজারের উত্থান পুরোপুরি বোঝা যায় না। দাম বাড়ার পাশাপাশি কোম্পানির আয়, নগদ প্রবাহ, কর্পোরেট সুশাসন ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও হিসাবে রাখা দরকার।

কোন খাত এগিয়ে

সাম্প্রতিক বাজারে কয়েকটি খাত তুলনামূলক শক্ত অবস্থান নিয়েছে। সেবা ও আবাসন খাতে রিটার্ন পাওয়া গেছে ৭১ দশমিক ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত। বীমা খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬২ দশমিক ৯৯ শতাংশ, আর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

বাজারের সামগ্রিক গতিতে ব্যাংকিং খাতেরও বড় ভূমিকা ছিল। খাতটির প্রায় ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কয়েকটি বড় ব্যাংকের শেয়ারদর বাড়ায় সূচকও প্রভাবিত হয়েছে। বাজার-সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পুবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

বস্ত্র, ওষুধ ও প্রকৌশল খাতেও লেনদেনে সক্রিয়তা দেখা গেছে। তবু কোনো একটি খাতের সাময়িক উত্থানকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা ভাবার সুযোগ নেই। শেষ বিচারে বাজার ফিরে যায় কোম্পানির মৌলিক শক্তির কাছেই।

ব্যাংক ঋণের বাইরে ইক্যুইটি অর্থায়নের ভাবনা

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রধান ভরসা ছিল ব্যাংক ঋণ। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে, আর দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগাড়ে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

এই বাস্তবতায় সরকার ও বিএসইসির পক্ষ থেকে বাজার মূলধন বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২৫ হাজার কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাজার মূলধন বাড়ানোর লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের বড় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগও আলোচনায় আছে।

বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান সেলটেক ব্রোকারেজ তাদের অর্ধবার্ষিক পর্যালোচনায় ডিএসইএক্সের ৬ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক ছোঁয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে এটি পূর্বাভাসমাত্র, নিশ্চিত কোনো ফল নয়। বাজারের গতিপথ ঠিক হবে অর্থনীতি, সুদের হার, রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশ, কোম্পানির আর্থিক ফলাফল এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণ দিয়ে।

গুজবের বাজার থেকে তথ্যের বাজার

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো প্রযুক্তি বা বিধিমালায় নয়, ঘটতে হবে বিনিয়োগকারীর ভাবনায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, অজানা সূত্রের তথাকথিত ইনসাইডার তথ্য কিংবা দ্রুত মুনাফার হাতছানি এখনো অনেককে অকারণ ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ভালো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে তার শেয়ারপ্রতি আয়, রিটার্ন অন ইক্যুইটি, নগদ প্রবাহ, ঋণের অবস্থা, পরিচালনা পর্ষদের সুশাসন ও ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন। একই শেয়ারে বা একই খাতে সব অর্থ না ঢেলে বিভিন্ন খাতে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়াও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পুঁজিবাজারে সাফল্যের সঙ্গে ধৈর্যের সম্পর্ক গভীর। আজ শেয়ার কিনে কালই বড় মুনাফার আশা করা বাজারকে বোঝার চেয়ে বরং অনুমান করার কাছাকাছি। দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়ে ওঠে নিয়মিত সঞ্চয়, মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিতে বিনিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আর সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে।

সামনে পথটি কোথায়

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ। অতীতের দুর্বলতা পেছনে ফেলে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা যাবে কি না, তা নির্ভর করছে নীতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তব প্রয়োগের ওপর।

সূচকের উত্থান দিয়ে কোনো বাজারের পরিপক্বতা প্রমাণ হয় না। পরিণত বাজারে বিনিয়োগকারী জানেন, তিনি কী কিনছেন এবং কেন কিনছেন। কোম্পানি জানে, নিয়ম মেনেই তাকে ব্যবসা করতে হবে। নিয়ন্ত্রক জানে, আইন প্রয়োগে শিথিলতার জায়গা নেই। আর বাজার জানে, আস্থা প্রচারে নয়, কার্যকর ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই জন্ম নেয়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সত্যিই সেই পথে হাঁটছে কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে সময়। তবে সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগের সংস্কৃতি যদি একসঙ্গে শক্তিশালী হয়, তাহলে এই বাজার শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা হয়ে থাকবে না। শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, উদ্যোক্তার বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

বাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ শেষ পর্যন্ত টাকা নয়, আস্থা। সেই আস্থা যদি জ্ঞান, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও আইনের ওপর ভর করে দাঁড়ায়, তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে।



Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর