প্রকাশিত : ১১:০১
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ে কাজ করতেন মো. তাজুল ইসলাম জাবেদ। তাঁর দাবি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ভূমি ও অন্যান্য সমস্যার কথা তুলে ধরার পর তাঁর বেতন বন্ধ হয়ে যায়। একই সময় শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি জানিয়েছেন।
এ অবস্থায় চার বছর ধরে বেতন না পেয়ে ন্যায়বিচার ও চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তাজুল ইসলাম। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজ, বেতন বন্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান পারিবারিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছেন।
তাজুল ইসলাম জাবেদ শ্রীমঙ্গলে গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের সমস্যা ও প্রয়োজনের তথ্য সংগ্রহ করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরতেন। তাঁর ভাষ্য, ২৭টি গেজেটের আওতায় প্রায় ৫০টি গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে দুর্গম পাহাড়, ৪৫টির বেশি চা-বাগান এবং বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত খাসিয়া, গারো, ত্রিপুরা ও মণিপুরীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে যেতে হয়েছে।
বৃষ্টি, শীত কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন বলে জানান তিনি। রাস্তা, সিঁড়ি, পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যার কথাও প্রশাসনের নজরে আনার চেষ্টা করেছেন।
তাজুলের দাবি, মাঠপর্যায়ের কাজের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতেও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গিরিখাত, হজম তিলা, দার্জিলিং ভিউ চা-বাগান, বিভিন্ন লেক, লাল কিলা, মিনি সাজেক, হরিণছড়া, পান বন, কালো পাহাড় ও পাথারিয়া পাহাড়ের ঝরনাসহ বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে তিনি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারে ভূমিকা রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তার সফর
তাজুল ইসলাম তাঁর চিঠিতে ২০২১ সালের শেষ দিকের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া শ্রীমঙ্গল সফরে এসেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ৬ নম্বর খাসিয়া পুঞ্জি থেকে বাঁশের কুঁড়িল দিয়ে সবজি রান্না করা হয়। খাবার খাওয়ার পর মুখ্য সচিব তাঁকে ডেকে সবজিটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে জানতে চান।
তাজুল জানান, তিনি খাসিয়া পুঞ্জি থেকে সবজি সংগ্রহের কথা বলেন। তখন মুখ্য সচিব তাঁকে বলেন, মানুষের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করলে তাঁদের জন্য কিছু করারও দায়িত্ব থাকে। পরে তিনি জানতে চান, ওই জনগোষ্ঠীর মূল সমস্যা কী।
তাজুলের ভাষ্য, তিনি তখন রাস্তা, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যার কথা বলেন। তবে মুখ্য সচিব তাঁদের মূল চাওয়া জানতে চাইলে তিনি ভূমির অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তাঁর চিঠি অনুযায়ী, সে সময় সিলেট বিভাগের চার জেলার জেলা প্রশাসকসহ মৌলভীবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ হাসান উপস্থিত ছিলেন। তাজুল বলেন, তাঁকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছিল, ‘জাবেদ, বলুন। নির্ভয়ে বলুন।’
এরপর তিনি চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী, খাসিয়া, গারো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের ভূমি না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, তাঁরা ভূমির অধিকার কিংবা সরকারি কোনো স্বীকৃতি বা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারলে আরও নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারতেন।
তাজুলের দাবি, ওই সময় তাঁকে বলা হয়েছিল, ‘গুড জব, ওয়েল ডান। মাঠপর্যায়ে কাজ করে যান।’
গবেষণা দলের সঙ্গে মাঠে
তাজুল তাঁর চিঠিতে আরও বলেন, এর কিছুদিন পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি গবেষণা দল ও সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহের জন্য শ্রীমঙ্গলে আসেন। তাঁকেও তাঁদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে যুক্ত করা হয়।
তিনি তাঁদের ৬ নম্বর খাসিয়া পল্লিতে নিয়ে যান। সেখানে পুঞ্জির নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের স্বাগত জানান। খাবার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়।
তাজুলের ভাষ্য অনুযায়ী, খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা, পুঞ্জিপ্রধান ওয়েল সুরংসহ, তাঁদের দীর্ঘদিনের ভূমির অধিকারের আকাঙ্ক্ষার কথা জানান। গারো ও অন্যান্য আদিবাসী চা শ্রমিকদের মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকেরা তখন তাঁকে স্থানীয় মানুষের বক্তব্য বুঝিয়ে বলতে বলেছিলেন বলে দাবি করেন তাজুল। তিনি বলেন, তাঁদের নিজস্ব ঘর ও বসতি থাকলেও ভূমির নিশ্চয়তা নেই—ভবিষ্যতে কোনো কারণে বসতি ছেড়ে যেতে হলে তাঁরা কোথায় যাবেন, সেটিই তাঁদের বড় উদ্বেগ। তিনি স্থানীয় মানুষের বক্তব্যের বাইরে নতুন কোনো কথা বলেননি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন।
এরপরই বেতন বন্ধ
তাজুলের দাবি, ওই ঘটনা ও বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরের দিন তাঁর কাছে খবর আসে যে তাঁর বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষকদের বেতন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষ্য, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো এখনো রয়েছে। কিন্তু সেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেই। প্রশিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণের জন্য গিয়ে অনেক সময় হতাশ হয়ে ফিরে আসেন এবং তাঁদের বেতন-ভাতাও নেই।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা যেতে পারে।
‘আমি আসলে কী অপরাধ করেছি?’
চার বছর ধরে বেতন বন্ধ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তাজুল প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমি আসলে কী অপরাধ করেছি?’
তাঁর বক্তব্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কথা বুঝিয়ে বলতে বলা হয়েছিল বলেই তিনি তাঁদের যুক্তিসঙ্গত সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন। মানুষের কথা বলা, তাঁদের সমস্যা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বাস্তব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করাই যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে সেই অপরাধের বিচার হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বেতন বন্ধ হওয়ার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য বর্তমানে প্রো-অপারেটিং ও ট্যুর গাইডের কাজ করছেন বলে জানান তাজুল। তাঁর পরিবারে শয্যাশায়ী মা রয়েছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। সংসারের ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতে তাঁকে প্রতিমাসে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে এসবের মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ন্যায়বিচার ও পাওনা বেতন পুনর্বহালের জন্য একাধিকবার আবেদন করেছেন বলেও জানান।
মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব আর পালন করতে চান না
দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করার কারণে এখন আগের মতো শারীরিক সক্ষমতা নেই উল্লেখ করে তাজুল তাঁর আবেদনে জানিয়েছেন, তিনি আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইনচার্জ বা তথ্যদাতা হিসেবে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করতে চান না।
তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁদের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আন্তরিকতাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।
তাজুলের দাবি, উপজেলা পর্যায়ে তাঁর জন্য উপযুক্ত কোনো দায়িত্ব নির্ধারণ করে তাঁকে পুনরায় কাজে বহাল করা হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বেতন ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চাই না। আমি কারও অনুগ্রহ চাই না, আমি চাই আমার প্রাপ্য অধিকার।’
তাঁর ভাষ্য, ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রাপ্য বেতন, সম্মান ও অধিকার ফিরে পেয়ে আবার মাথা উঁচু করে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে চান তিনি।