পুঁজিবাজারে ফিরছে টাকার স্রোত, হতাশার ভিড়ে সম্ভাবনা খুঁজছেন বিনিয়োগকারীরা

প্রকাশিত :  ১৮:৪৩
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৪৯
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধসের পরেই কি নতুন দিগন্ত?

ধসের পরেই কি নতুন দিগন্ত?

রেজুয়ান আহম্মেদ

পুঁজিবাজারের গল্পে ভয় আর আশা পাশাপাশি হাঁটে। কখনো সূচকের পতনে বিনিয়োগকারীর মুখে নামে হতাশার ছায়া, কখনো কয়েক দিনের উত্থানেই ফিরে আসে নতুন প্রত্যাশা। মূল্যস্ফীতির চাপ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও এখন তেমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

একদিকে রয়েছে দরপতনের চাপ, অন্যদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে সূচকের ঘুরে দাঁড়ানোর দৃশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তে থাকা লেনদেন এবং অপেক্ষাকৃত কম দামে শেয়ার কেনার আগ্রহ। ফলে বাজারের বর্তমান চিত্রকে শুধু পতন কিংবা উত্থানের সরল হিসাব দিয়ে বোঝা কঠিন।

প্রশ্ন তাই একটাই, এই অস্থিরতা কি আরেক দফা পতনের ইঙ্গিত, নাকি বড় কোনো পুনরুদ্ধারের আগে বাজারের স্বাভাবিক বিরতি?

২১ সেপ্টেম্বরের লেনদেন সেই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। টানা চার কার্যদিবসের উত্থানের পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক DSEX কমেছে ৪১.৭ পয়েন্ট। দিন শেষে সূচক নেমে এসেছে ৫,৫৫০ পয়েন্টে। তবে একই দিনে লেনদেন বেড়ে প্রায় ৭৯০ কোটি টাকায় উঠেছে। মোট ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫২টির দর কমেছে, বিপরীতে বেড়েছে ৯৯টির।

সূচক পিছিয়েছে, কিন্তু বাজারে অর্থের প্রবাহ থেমে যায়নি। বরং লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। এই বৈপরীত্যই বর্তমান বাজারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি।

পতনের ভেতরেও যে গল্পটি রয়ে গেছে

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বাজারের চিত্র ছিল আরও চাপের। ১৪ সেপ্টেম্বর DSEX নেমে এসেছিল ৫,৩৭৯ পয়েন্টে। এরপর মাত্র চার কার্যদিবসে সূচক বেড়েছে ২১৩ পয়েন্ট। ২০ সেপ্টেম্বর তা দাঁড়ায় ৫,৫৯২ পয়েন্টে। একই সময়ে লেনদেনও বাড়ে এবং ৩৮৮টি লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮৭টির দর বেড়েছিল।

এই ওঠানামা বাজারের ভেতরের একটি বাস্তবতাকে সামনে আনে। বিক্রির চাপ থাকলেও অপেক্ষাকৃত কম দামে শেয়ার কেনার আগ্রহ একেবারে হারিয়ে যায়নি।

অবশ্য এই তথ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ বাজারের কোনো নিশ্চিত ছবি আঁকা যায় না। তবে এটুকু বলা যায়, বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখনো বাজারের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না।

৫,৯০০ থেকে ৫,৫৫০, এরপর কোথায়?

এ বছরের আগস্টে DSEX উঠেছিল ৫,৯০৩ পয়েন্টে। এরপর বাজারে শুরু হয় উল্লেখযোগ্য সংশোধন। ৭ সেপ্টেম্বর এক দিনেই সূচক কমেছিল ১০৩ পয়েন্ট। দিন শেষে তা নেমে আসে ৫,৫৫৮ পয়েন্টে।

সেই পতনের পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়। এখানেই বাজারের আসল পরীক্ষা।

সূচক ৫,৫০০ বা ৫,৬০০ পয়েন্টের কোন স্তরে যাবে, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, এই দামের পর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা কোন কোম্পানির ব্যবসা, আয় ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

কারণ শেষ পর্যন্ত সূচক একটি সংখ্যা মাত্র। বাজারের গভীর গল্প লেখা হয় কোম্পানির ব্যবসা ও কর্মদক্ষতার ভেতরে।

শেয়ার নয়, এখন গল্প বাছাইয়ের সময়

পুঁজিবাজারে প্রতিটি কোম্পানির গল্প আলাদা। কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ছে, কোনোটি ঋণের চাপে রয়েছে। কোনো কোম্পানির সামনে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমলেও তার ব্যবসার মৌলভিত্তিতে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

এই পার্থক্যই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শুধু দর কমেছে বলেই কোনো শেয়ার সস্তা হয়ে যায় না। একইভাবে দর বেড়েছে বলেই কোনো শেয়ার অতিমূল্যায়িত, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

দাম একটি সংখ্যা, মূল্য একটি গল্প।

সেই গল্প বুঝতে হলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পড়তে হবে। দেখতে হবে আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা, ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা। বাজারের দৈনিক ওঠানামার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এসব বিষয় অনেক বেশি অর্থ বহন করে।

তারল্যই এখন বড় পরীক্ষা

আগস্টে বাজারের লেনদেনে বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল। ২৫ আগস্ট DSE-এর দৈনিক লেনদেন নেমে এসেছিল ৫০৭ কোটি টাকায়। মাত্র ১৫টি সেশনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছিল ৫৮ শতাংশের বেশি। নতুন অর্থের প্রবাহ দুর্বল হওয়া, বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান এবং বাজারের সংশোধন তখন বড় চাপ হিসেবে সামনে এসেছিল।

সেপ্টেম্বরের শেষভাগের চিত্র সেই প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।

২১ সেপ্টেম্বর লেনদেন প্রায় ৭৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ বাজারে অংশগ্রহণ একেবারে থেমে যায়নি। তবে এই অর্থপ্রবাহ কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এক দিনের লেনদেন দিয়ে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা।

সম্ভাবনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঝুঁকি

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতে, আর শেষ পর্যন্ত কোম্পানির আয় ও মুনাফাতেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।

তাই পুঁজিবাজারের সামনে শুধু আশার আলো নেই। বাস্তব ঝুঁকিও রয়েছে।

তবে বাজারের একটি পুরোনো শিক্ষা হলো, অনিশ্চয়তার সময়েই বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যায়নের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কেউ আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করেন। কেউ পরিস্থিতি বুঝে অপেক্ষা করেন। আবার কেউ কোম্পানির মৌলভিত্তি যাচাই করে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা খোঁজেন।

বাজারের প্রতিটি বিনিয়োগকারী একইভাবে পরিস্থিতিকে দেখেন না। আর সেই কারণেই একই বাজারে কেউ ঝুঁকি দেখেন, কেউ সম্ভাবনা।

নতুন বাজারের জন্য নতুন আস্থা

একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠতে শুধু সূচকের উত্থান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভালো কোম্পানি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা।

বাজারে নতুন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে BSEC এমন একটি খসড়া বিধিমালা অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কোম্পানিকে প্রচলিত IPO প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধিমালা, বাস্তবায়নের মান এবং বাজারে এর প্রয়োগের ওপর।

পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া। আবার অতীতের ভয়কে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করাও বিচক্ষণতার পরিচয় নয়।

আজকের বাজার হয়তো আগামী দিনের গল্পের শেষ অধ্যায় নয়। বরং এটি এমন একটি সময়, যখন দুর্বলতা ও সম্ভাবনা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে।

২১ সেপ্টেম্বর DSEX কমেছে ৪১.৭ পয়েন্ট। অথচ তার আগের চার কার্যদিবসে সূচক বেড়েছিল ২১৩ পয়েন্ট। একই সঙ্গে লেনদেনও উঠে এসেছে প্রায় ৭৯০ কোটি টাকায়।

এই পরিসংখ্যান কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। তবে বাজারের ভেতরে কী ঘটছে, তা বোঝার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

পুঁজিবাজার কি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, নাকি এটি কেবল সাময়িক একটি উত্থান?

এর উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। সময়ই সেই উত্তর লিখবে।

ততদিন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে ধৈর্য, তথ্য এবং নিজের সিদ্ধান্তকে যাচাই করার অভ্যাস। আবেগ দিয়ে বাজার দেখা যায়, কিন্তু বোঝা যায় না। বাজার বুঝতে হলে সংখ্যার পেছনের গল্পটিও পড়তে হয়।

পুঁজিবাজারের রাত দীর্ঘ হতে পারে। ভোর কখন আসবে, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কিন্তু যারা অন্ধকারের মধ্যেও চোখ খোলা রাখেন, তারাই হয়তো প্রথম দেখতে পান দিগন্তের বদলে যাওয়া রং।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর