প্রকাশিত :  ১১:০৮
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৮
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সূচক নয়, পুঁজিবাজারের আসল সংকট আস্থার পতন

সূচক নয়, পুঁজিবাজারের আসল সংকট আস্থার পতন

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

পুঁজিবাজার কত পয়েন্টে আছে, প্রতিদিন এই হিসাব করতে করতে আমরা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিই এড়িয়ে যাচ্ছি। প্রশ্নটি হলো, এই বাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা কোথায়?

১০ সেপ্টেম্বরের লেনদেনের দিকে তাকালেই পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। ডিএসইএক্স ২২ দশমিক ৭১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৭ পয়েন্টে নেমেছে। ৩৮৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর কমেছে ২৩০টির। বেড়েছে ১০৩টির। লেনদেন হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

এগুলো কেবল কিছু সংখ্যা নয়। এসব সংখ্যার ভেতরে বাজারের মনস্তত্ত্বও লুকিয়ে থাকে। সেখানে এখনো সতর্কতা আছে, বিক্রির চাপ আছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছে অনিশ্চয়তা।

আর অনিশ্চিত বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী তৈরি হয় না।

বাজার কি সত্যিই বিনিয়োগকারীবান্ধব?

বিনিয়োগকারীদের আমরা প্রায়ই বলি, গুজবে কান দেবেন না, ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করুন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করুন। কথাগুলো অবশ্যই ঠিক। কিন্তু এর পরের প্রশ্নটি কি আমরা যথেষ্ট জোর দিয়ে করছি?

বাজার কি বিনিয়োগকারীর জন্য যথেষ্ট স্বচ্ছ?

একজন বিনিয়োগকারী যখন দেখেন, কোনো কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে, কোনো কোনো কোম্পানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে বা কমছে, তখন তাঁর স্বাভাবিক প্রশ্ন থাকে, এর পেছনে কারণ কী?

তথ্য কি সবার কাছে একই সময়ে পৌঁছাচ্ছে?

কেউ কি অন্যদের আগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে যাচ্ছেন?

বাজারে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে ব্যবস্থা নিতে কত সময় লাগছে?

আর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার ফলাফল বিনিয়োগকারীরা দেখতে পাচ্ছেন কি না?

এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না থাকলে বাজারে আস্থা তৈরি হবে কীভাবে?

শাস্তির ভয় নয়, নিয়মের বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার

পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রকের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করা, যেখানে সবাই জানবেন, নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা হবেই।

কারসাজি হয়েছে কি না, সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু বাজারে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়, সেটিই বড় সমস্যা।

একটি সুস্থ বাজারে বিনিয়োগকারী জানবেন, তথ্য গোপন করে কেউ সুবিধা নিতে পারবেন না। কোনো কোম্পানির আর্থিক তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে দ্রুত ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। অস্বাভাবিক লেনদেন হলে তদন্ত হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই বিশ্বাসই বাজারের মূলধন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের পুঁজিবাজারে অনেক সময় সূচক নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, কিন্তু বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয় কম।

অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও বাজার কেন স্বস্তিতে নেই?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন একই সঙ্গে ভালো ও খারাপ খবর আছে।

প্রবাসী আয় বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় এসেছে। এগুলো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।

কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বড় বাস্তবতা। মানুষের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমছে। ব্যবসার ব্যয় কমেনি। ঋণের খরচও কম নয়।

অর্থনীতির এই বাস্তবতায় একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী কেন তাঁর সীমিত সঞ্চয় শেয়ারবাজারে আনবেন?

শুধু ‘বাজার সস্তা’ বললেই তো তিনি টাকা আনবেন না।

তাঁকে বিশ্বাস করতে হবে যে তাঁর বিনিয়োগের পরিবেশ নিরাপদ, তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং বাজারের নিয়ম সবার জন্য সমান।

বৈশ্বিক ঝুঁকি আমাদের দরজায়

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে বৈশ্বিক সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং আমদানি ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর।

এই পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

আগামীকাল বাজার বাড়বে, না কমবে?

এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাজার কোন অবস্থায় খুলবে।

সূচক কয়েক পয়েন্ট বাড়লেই কি বাজার ভালো হয়ে যাবে?

না।

লেনদেন ৭০০ কোটি টাকা হলেই কি আস্থা ফিরে আসবে?

তাও নয়।

আস্থা ফিরবে তখনই, যখন বিনিয়োগকারী দেখবেন, বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ছে, ভালো কোম্পানির শেয়ারে প্রকৃত বিনিয়োগ হচ্ছে, অস্বাভাবিক লেনদেন কমছে এবং নিয়ম ভাঙার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আগামীকাল তাই সূচকের দিকে তাকানোর পাশাপাশি তিনটি বিষয় বিশেষভাবে দেখা দরকার।

প্রথমত, বাজারের বিস্তৃত অংশে ক্রেতা ফিরছেন কি না।

দ্বিতীয়ত, লেনদেন বাড়ছে কি না এবং সেই লেনদেন কতটা স্বাস্থ্যকর।

তৃতীয়ত, বড় মূলধনের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারীর আগ্রহ বাড়ছে কি না।

এসব ইতিবাচক হলে বাজারে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। আর যদি কয়েকটি শেয়ারের ওপর নির্ভর করে সূচক সামান্য বাড়ে, সেটিকে বাজারের পুনরুদ্ধার বলা হবে অতিরঞ্জন।

এখন দরকার কঠিন সংস্কার

পুঁজিবাজারকে বাঁচাতে নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিয়মের কঠোর প্রয়োগ।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। দুর্বল কোম্পানির বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদনকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে তথ্য প্রকাশে শৃঙ্খলা আনতে হবে। অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বাজারে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো গুজব একটি কোম্পানির বাজারমূল্যকে বাস্তব ব্যবসার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে না পারে।

এটি শুধু নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব নয়। স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, নিরীক্ষক, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকার এবং বিনিয়োগকারী, সবারই দায়িত্ব আছে।

বাজারকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা সমাধান নয়

পুঁজিবাজার যখন দুর্বল থাকে, তখন সূচক বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। কিন্তু কৃত্রিমভাবে বাজার চাঙা করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় ক্ষতি করতে পারে।

বাজারকে তার নিজস্ব শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।

যে কোম্পানির আয় আছে, ব্যবসা আছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে এবং সুশাসন আছে, বিনিয়োগকারীরা সেই কোম্পানির মূল্যায়ন করবেন। আর যে কোম্পানি বছরের পর বছর দুর্বল, তার শেয়ার শুধু গুজবের কারণে বাড়বে, এমন বাজার কোনোভাবেই সুস্থ বাজার নয়।

বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরানোই প্রথম কাজ

আমরা প্রায়ই বলি, পুঁজিবাজার অর্থনীতির আয়না। কিন্তু আয়না তখনই প্রকৃত ছবি দেখায়, যখন সেটি পরিষ্কার থাকে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো সম্ভাবনা আছে। প্রবাসী আয় বাড়ছে, রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি এসেছে এবং উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন। এই সম্ভাবনাকে পুঁজিবাজারে কাজে লাগাতে হলে প্রথমে বাজারকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।

বিনিয়োগকারীকে বারবার বলা যাবে না, ‘ঝুঁকি নিয়েই বিনিয়োগ করতে হবে।’

কারণ বিনিয়োগের ঝুঁকি আর ব্যবস্থাগত অনিশ্চয়তা এক জিনিস নয়।

ব্যবসায় লোকসানের ঝুঁকি বিনিয়োগকারী মেনে নিতে পারেন। কিন্তু নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে কি না, তথ্য সময়মতো পাওয়া যাবে কি না এবং অনিয়ম হলে বিচার হবে কি না, এসব নিয়ে অনিশ্চয়তা কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘদিন বহন করবেন না।

তাই আগামীকালের বাজারের আসল পরীক্ষা ডিএসইএক্স নয়।

আসল পরীক্ষা হলো, বাজার কি বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস ফেরানোর মতো আচরণ করছে?

সূচক বাড়ানো সহজ। লেনদেন বাড়ানোও সম্ভব।

কিন্তু আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

আর সেই কঠিন কাজটি না করে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের আশা করা মানে সমস্যার চিকিৎসা না করে শুধু থার্মোমিটারের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের এখন সূচকের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সমান নিয়মের নিশ্চয়তা।

বাজারের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর