প্রকাশিত : ২০:১১
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:১৯
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
রাত তখন সাড়ে বারোটা। মেঘনার আকাশজুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, চাঁদের কোনো চিহ্ন নেই। নদীর ওপর এমন গাঢ় অন্ধকার নেমেছে যে দশ হাত দূরের মানুষকেও চেনা দায়। তীরের দূরের গ্রামগুলো থেকে ক্ষীণ কেরোসিনের আলো মিটমিট করছে, যেন ঘুমন্ত মানুষের নিশ্বাসের মতো মৃদু।
মাঝি করিম বৈঠা থামিয়ে কান পাতল। কিছু একটা শব্দ হলো। টুপ। তারপর আবার টুপ। যেন কেউ নদীর বুক থেকে ধীরে ধীরে পাথর ছুড়ছে। করিম উঠে দাঁড়াল। সামনের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে পেল না। কেবল কালো জল আর ঘন অন্ধকার। স্রোতের টানে নৌকাটি একটু একটু করে ভেসে যাচ্ছিল।
পেছন থেকে একটা গলা ভেসে এল, "বৈঠা চালাও।"
করিম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। প্রথমে কিছুই চেনা গেল না, তবে চোখ সয়ে এলে বোঝা গেল নৌকার পেছনের অংশে ছয়জন বসা। সবার পরনে কালো সামরিক পোশাক, মাথায় টুপি, হাতে বন্দুক। তাদের মাঝখানে বসা লোকটির চোখে এক আলাদা দাপট, তার কথাতেই বৈঠা ধরতে হলো করিমকে।
করিম আবার বৈঠা চালাতে শুরু করল। সে জানত, আজ রাতে কোনো প্রশ্ন করা চলে না। এই নদীর মাঝখানে প্রশ্নেরও মৃত্যু হয়।
করিম তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। জীবনের প্রায় চল্লিশ বছর সে এই মেঘনার বুকে কাটিয়েছে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কোনো ঋতুই তার কাছে অচেনা নয়। চাঁদপুরের ঘাট থেকে ভৈরব বাজার পর্যন্ত নদীর প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি চর, প্রতিটি ঘূর্ণি তার মুখস্থ। হাইমচরের চর, গজারিয়ার খেয়াঘাট, রায়পুরের সরু খাল, মতলবের ডুবোচর, কোথায় কখন স্রোতের গতি বদলায়, কখন জোয়ার আসে, কখন ভাটা, চোখ বন্ধ করে বলতে পারে। কিন্তু আজ নদীটাকেও তার অচেনা লাগছিল। পানি যেন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কালো। বাতাসে একধরনের গন্ধ, যা সে আগে কখনো পায়নি। মৃত্যুর গন্ধ নয়, বরং তার চেয়েও গভীর কিছু, ভয়ের গন্ধ।
করিম বৈঠা চালাতে চালাতে মনে মনে হিসাব করছিল। ঘাট থেকে বের হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। নৌকা এখন মাঝনদীতে। দুপাশের তীর দেখা যায় না, কেবল দূরের গ্রামগুলোর ক্ষীণ আলো মাঝে মাঝে মিটমিট করছে, যেন গ্রামগুলোও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
নৌকায় মানুষ মোট দশজন। সামনে তিনজন তরুণ বসা, যাদের গায়ে কোনো দড়ি নেই, মুখে কাপড়ও বাঁধা নেই। তাদের শরীরের ভাষা এমন, যেন কোনো অদৃশ্য শিকল তাদের বেঁধে রেখেছে। কেউ নড়াচড়া করছে না, কথা বলছে না, পানিও চাইছে না। তাদের ঠিক পেছনে বসে আছে পাঁচজন সৈন্য, সবার হাতে রাইফেল, চোখে কঠোর সতর্কতা। আর সবার শেষে বসা সেই লোকটি, যার কথায় এতক্ষণ নৌকা চলছে। করিম নিজে ছাড়া আর কেউ শব্দ করছে না।
এক তরুণের ঠোঁট কাঁপছিল। অন্যজন মাথা নিচু করে বসেছিল, চোখ বন্ধ। মনে হচ্ছিল সে ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিংবা মনে মনে প্রার্থনা করছে। তৃতীয়জন তাকিয়ে ছিল নদীর জলের দিকে। তার চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। সেই স্থিরতা করিমকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়েছিল। যে মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়, তার চোখে কান্না থাকে, কাঁপুনি থাকে, আকুতি থাকে। কিন্তু যে মানুষ মৃত্যুকে নিঃশব্দে মেনে নিয়েছে, তার চোখে থাকে কেবল শূন্যতা। সেই তৃতীয় তরুণের চোখে ছিল সেই শূন্যতাই।
বহু বছর পর এই রাতের কথা বলতে গিয়ে করিম বারবার একই কথা বলত, "ওই ছেলেটার চোখ আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।"
"কী ছিল ওর চোখে?" কেউ জিজ্ঞেস করলে সে বলত, "কিছু না। কিছুই না। শুধু অন্ধকার, নদীর পানির মতো অন্ধকার।"
পেছনে বসা ছয় সৈন্যের মধ্যে সবার নেতা রিয়াজুল হাসান, যাকে সবাই সংক্ষেপে রিয়াজ বলে ডাকে। তার মাথার টুপিটা সে খুলতে চাইছিল না। টুপিটা তার কাছে অদ্ভুত এক নিরাপত্তার প্রতীক। টুপি মাথায় থাকলে সে একজন সৈনিক, একজন আদেশবাহী। টুপি খুলে ফেললে সে কেবল একজন মানুষ, একজন অপরাধী। কিন্তু সে জানত, আজ রাতে টুপিটা খুলতেই হবে। এমন কাজ করার সময় টুপি মাথায় রাখা চলে না, টুপিতে রক্তের দাগ লেগে যেতে পারে।
রিয়াজ পকেট থেকে সিগারেট বের করল। লাইটার জ্বালাল। ছোট্ট আগুনের শিখায় মুহূর্তের জন্য তার মুখটা আলোকিত হলো, তীক্ষ্ণ চোয়াল, ঘন ভুরু, ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত শুষ্কতা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হলেও তাকে পঁয়ত্রিশের বেশি মনে হয় না। শরীর শক্ত, বুক চওড়া, হাতের রগগুলোতে সৈনিকের প্রশিক্ষণের স্পষ্ট ছাপ। সিগারেট ধরিয়ে সে একটা লম্বা টান দিল। ধোঁয়া মিশে গেল অন্ধকারে। তারপর সে সামনের তিন তরুণের দিকে তাকাল। তারা কেউ তার দিকে তাকাল না।
পাশে বসা এক সৈন্য ফিসফিস করে বলল, "স্যার, আর কত দূর?"
রিয়াজ ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দিল, "মাঝির ওপর ভরসা রাখো। ও জানে কোথায় নিতে হবে।"
সৈন্যটি চুপ করে গেল। রিয়াজ ভাবছিল, এই তিনজন আসলে কারা? সে জানত না, জানতে চায়নি, জানার প্রয়োজনও ছিল না। তার কাজ আদেশ পালন করা, প্রশ্ন করা নয়। এই তিন তরুণ হয়তো রাজনীতি করেছিল, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য ছিল, কিংবা কারও ব্যক্তিগত শত্রু ছিল, অথবা সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিছুই তার জানার প্রয়োজন নেই। ওপর থেকে সংক্ষিপ্ত নির্দেশ এসেছে, "এদের সরিয়ে দাও।" শুধু এইটুকুই যথেষ্ট।
কিন্তু তারপরও মনের ভেতর ছোট্ট একটা প্রশ্ন কাঁটার মতো বিঁধছিল, যে প্রশ্নটা সে বহু বছর ধরে চেপে রেখেছে। কেন? কেন এই ছেলেগুলো? তাদের বয়স কত? পঁচিশ, ছাব্বিশ, নাকি আরও কম? তাদের কি মা আছে? কেউ কি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে? কোনো প্রেমিকা কি এখন জানালার পাশে বসে তাকিয়ে আছে রাতের আকাশের দিকে?
রিয়াজ আবার সিগারেটে একটা টান দিল। এই প্রশ্নগুলো মাথাচাড়া দিলেই সে ধোঁয়ার আড়ালে সেগুলোকে উড়িয়ে দেয়। এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই, থাকলেও তা জানার প্রয়োজন তার নেই।
নৌকা এগিয়ে চলেছে। স্রোতের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। করিম বৈঠা চালাচ্ছে, তার হাতের পুরোনো দাগগুলো অন্ধকারেও চেনা যায়। সে কোনো প্রশ্ন করছে না, কোনো কথা বলছে না। কেবল বৈঠা বেয়ে চলেছে, আর মাঝে মাঝে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে নদীর দিকে।
রিয়াজ কিছুক্ষণ করিমের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত, এই মাঝি আজ রাতের ঘটনার একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী। কিন্তু সাক্ষীরা ততক্ষণই নিরাপদ, যতক্ষণ তারা জীবিত থাকে। তবুও রিয়াজ করিমকে মারবে না। করিমের মতো মাঝিরা এই নদীরই একটা অংশ। তাদের সাহায্য ছাড়া এই কাজ করা সম্ভব নয়। তারা মুখ বন্ধ রাখতে জানে, চোখ বন্ধ রাখতে জানে, আর প্রয়োজনে সব ভুলে যেতে জানে।
নদীর মানুষের স্মৃতি বড় সংক্ষিপ্ত। এটাই তাদের অভিশাপ, আবার এটাই তাদের বেঁচে থাকার রক্ষাকবচ।
রিয়াজ সিগারেট শেষ করে ফেলে দিল নদীতে। জলে ছোট্ট একটা শব্দ হলো, তারপর সব নিস্তব্ধ।
"আর কত দূর?" রিয়াজ জিজ্ঞেস করল।
করিম ঘাড় না ঘুরিয়েই উত্তর দিল, "আরও কিছুক্ষণ। মাঝস্রোতে পৌঁছাতে হবে।"
"কেন?"
"ওখানে স্রোত বেশি। যা ফেলবেন, মুহূর্তেই ভেসে যাবে বহুদূরে।"
রিয়াজ আর কিছু বলল না। করিমের কথার মধ্যে এক পেশাদার হিমশীতল স্পষ্টতা ছিল। রিয়াজ বুঝতে পারল, এই মাঝি আগেও এমন কাজ করেছে, না হলে এত স্বাভাবিকভাবে সে এ কথা বলতে পারত না।
নৌকা এগিয়ে চলল। অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এল। মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো কালো চাদর নদীটাকে পুরো ঢেকে দিয়েছে। দুপাশের তীর, গাছপালা, সবকিছু যেন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। কেবল নৌকা, জল আর দশটি মানুষের নিঃশব্দ শ্বাসপ্রশ্বাস।
রিয়াজ ভাবছিল, এই মুহূর্তে ওই তিন তরুণের মনে কী চলছে? তারা কি ভাবছে এটাই শেষ? তারা কি প্রার্থনা করছে? পালানোর কোনো পথ খুঁজছে? রিয়াজ জানত, পালানোর কোনো পথ নেই। নৌকার চারপাশে কেবল জল আর জল। কেউ লাফ দিলেও সাঁতরে তীরে পৌঁছাতে পারবে না। আর রিয়াজের হাতে আছে এমন বন্দুক, যা জলের নিচেও নিখুঁত নিশানায় কাজ করতে পারে। তবুও সে সতর্ক ছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ কখনো কখনো অসম্ভব সাহসী হয়ে ওঠে।
রিয়াজ পকেট থেকে বন্দুকটি বের করল। ধাতব ঠান্ডা স্পর্শে তার হাত শক্ত হয়ে গেল। এই অস্ত্র দিয়ে সে কতবার গুলি চালিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। প্রতিবারই অনুভূতির ধরন একই রকম থাকে, প্রথমবার একটু কাঁপুনি, দ্বিতীয়বার কম, তৃতীয়বার আরও কম। এখন আর কোনো কাঁপুনি নেই, কেবল অভ্যাস, এক ভয়ংকর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তা।
বহু বছর পর করিম যখন এই রাতের কথা বলছিল, তখন তার বয়স পঁচাত্তরের বেশি। চুল সম্পূর্ণ সাদা, মুখে বয়সের গভীর রেখা, হাত দুটো কাঁপে। কিন্তু চোখ তখনও উজ্জ্বল, স্মৃতি তখনও প্রখর। সে বসেছিল নদীর পাড়ে, একটি পুরোনো তেঁতুল গাছের নিচে। সামনে চায়ের কাপ। আর তার সামনে বসা দুজন মানুষ, একজন সাংবাদিক, অন্যজন মানবাধিকার কর্মী।
করিম প্রথমে কথা বলতে চায়নি। বহু বছর সে মুখ বন্ধ রেখেছিল। কথা বলা মানেই বিপদ, কথা বলা মানে নিজের জীবনকে আবার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া, কথা বলা মানে সেই রাতের ঘুমিয়ে থাকা ভূতগুলোকে জাগিয়ে তোলা। কিন্তু এখন তার বয়স হয়েছে, মৃত্যু সন্নিকটে, আর সে জানে এই সত্য যদি তার সঙ্গে সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে যায়, তবে তার আত্মা কখনো শান্তি পাবে না।
তাই সে বলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে। প্রতিটি শব্দ খুব সাবধানে মেপে মেপে।
"আমি সেদিন রাতেই বুঝতে পেরেছিলাম, ভয়ানক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।"
"কীভাবে বুঝেছিলেন?"
"যেভাবে নৌকাটা ভাড়া করা হয়েছিল। সেরকম ভাড়া সাধারণ কেউ করে না।"
"কীভাবে?"
"ওরা এসেছিল সন্ধ্যার পর। ছয়জন লোক, সবাই সামরিক পোশাকে, সবার হাতে বন্দুক। কিন্তু তাদের মধ্যে ওই একজন ছিল আলাদা। তার চোখে এমন এক ঠান্ডা দৃষ্টি ছিল, যা দেখলেই বোঝা যেত আজ রাতে সে কোনো সাধারণ কাজে আসেনি।"
"আপনি কি তাকে চিনতেন?"
করিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব মন্থর স্বরে বলল, "পরে চিনেছি। টিভিতে দেখেছি। ওই লোকটাই ছিল রিয়াজুল হাসান।"
"সেদিন রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?"
করিম চায়ে চুমুক দিল। তার বৃদ্ধ হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল।
"আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, ওরা বুঝি কোনো চোরাকারবারি। অস্ত্র পাচার করবে কিংবা মাদক। এই নদীতে এসব নতুন কিছু নয়। তাই প্রথমে মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি।"
"তাহলে কখন বুঝলেন ব্যাপার অন্য কিছু?"
"যখন ওই তিন তরুণকে নৌকায় তোলা হলো।"
"তারা কেমন ছিল?"
"ভীত। ভীষণ ভীত। কিন্তু অদ্ভুতভাবে চুপচাপ। কেউ চিৎকার করেনি, কেউ কাঁধের ওপর মাথা রেখে কাঁদেওনি। মনে হচ্ছিল, তারা যেন অনেক আগেই নিজেদের ভাগ্যের পরিণতি জেনে বসে আছে।"
করিম চায়ের কাপ নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তারপর নৌকা ছাড়ল।"
রাত তখন প্রায় একটা বাজে। নৌকা এসে পৌঁছাল মাঝনদীতে। এখানের স্রোত বেশ প্রবল। জল খুব উত্তাল না হলেও গভীরতা বিশাল। করিম জানত, এই তল্লাটে নদীর তলদেশে বহু পুরোনো গাছের শেকড় ও ডালপালা ছড়িয়ে আছে, যেখানে জাল ফেললেই আটকে যায়। তাই সাধারণ জেলেরা এদিকে সচরাচর আসে না। কিন্তু আজ রাতে তো কেউ মাছ ধরতে আসেনি।
করিম বৈঠা থামাল। নৌকাটি জলের টানে ধীরে ধীরে ভাসতে লাগল।
রিয়াজ উঠে দাঁড়াল। তার পায়ের ভারে নৌকাটি একটু কেঁপে উঠল। সামনে বসা তিন তরুণও যেন সজাগ হয়ে উঠল। প্রথম তরুণটি, যার ঠোঁট আগে থেকেই কাঁপছিল, সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, নিরবচ্ছিন্ন কান্নায় ভেঙে পড়ল। কোনো শব্দ নেই, কেবল চোখ গড়িয়ে জল পড়ছে আর তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। দ্বিতীয় তরুণটি মাথা তুলে সরাসরি তাকাল রিয়াজের দিকে। তার চোখে জমে আছে অজস্র প্রশ্ন। আর তৃতীয় তরুণটি তখনও উদাসীনভাবে তাকিয়ে আছে নদীর জলের দিকে, যেন সে কথা বলছে নদীর গভীরতার সঙ্গে।
রিয়াজ টুপিটা খুলে মাথার পাশে রাখল। পেছনে বসা পাঁচ সৈন্যের মধ্যে দুজন এগিয়ে এল। একজন তরুণদের পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের নড়াচড়া লক্ষ করছিল, আরেকজন নৌকার কোণা থেকে একটা নরম তুলার বালিশ বের করে আনল। বালিশটি সাধারণ একটি গৃহস্থালি বালিশ, সাদা কভার, নরম তুলার আস্তরণ। কিন্তু আজকের রাতে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রিয়াজ এগিয়ে গেল প্রথম তরুণের কাছে।
"দাঁড়াও," তরুণটি ফিসফিস করে বলল। "আমি একটা শেষ কথা বলতে চাই।"
রিয়াজ থামল। "বলো।"
"আমার মা আছে। বৃদ্ধা। আমিই তার একমাত্র সন্তান।"
রিয়াজ নির্বিকার রইল।
"তুমি কি তোমার মায়ের কথা ভাবতে পারো না?"
রিয়াজ পাথরের মতো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
"তোমার মায়ের কথা ভেবে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি চলে যাব, বহুদূরে, কাউকে কিচ্ছু বলব না। কথা দিচ্ছি।"
রিয়াজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল, "কথা দিলে কী হয়? কথা তো সহজেই ভেঙে ফেলা যায়।"
"আমি কথা ভাঙব না।"
"সবাই ভাঙে।"
এরপর রিয়াজ ইশারা করল। পেছন থেকে দুই সৈন্য এগিয়ে এসে তরুণটির দুহাত শক্ত করে ধরল। রিয়াজ নিজে বালিশটা তরুণটির মুখের কাছে চেপে ধরল। বন্দুকের নলটি রাখল বালিশের ওপর। তরুণটির চোখ আতঙ্কে কপালে উঠল। "না, না, প্লিজ..."
রিয়াজ ট্রিগার টিপল। খুব ছোট একটা শব্দ। বন্দুকের গুলি বালিশ ভেদ করে তরুণটির মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেল। তার নিথর শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে ঢলে পড়ল নৌকার তলায়। সৈন্যরা তাকে ছেড়ে দিল।
করিম শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার সারা শরীর শিউরে উঠেছিল। কিন্তু সে চোখ খুলল না। সে জানত, চোখ খুললেই যে দৃশ্য তাকে দেখতে হবে, তা সে জীবনেও ভুলতে পারবে না। তবুও একটা সময় তাকে চোখ খুলতেই হলো, কারণ তার কাজ এখনও বাকি।
প্রথম মৃত্যুর পর নৌকার ভেতর নেমে এল এক অদ্ভুত, ভারী নীরবতা। কেউ চিৎকার করল না, কেউ প্রতিবাদ জানাল না। এমনকি বাকি দুই তরুণও নড়াচড়া করল না। মনে হলো, তারা নিজেদের অনিবার্য মৃত্যুকে পুরোপুরি মেনে নিয়েছে।
রিয়াজ পা বাড়াল দ্বিতীয় তরুণের দিকে। এই তরুণটি এবার নিজেই মাথা তুলল। তার চোখে কোনো কান্না নেই, ভয়ের লেশমাত্র নেই, বরং সেখানে রয়েছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
"তুমি কি জানো, আমরা কারা?" সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
রিয়াজ থমকে দাঁড়াল। "জানার কোনো দরকার নেই।"
"তোমার জানা উচিত। তুমি যাদের খুন করতে যাচ্ছ, তারা প্রত্যেকে নির্দোষ।"
"সবাই নিজেদের নির্দোষ বলেই দাবি করে।"
"না, সবাই নয়। আমরা সত্যিই নির্দোষ। আমরা অন্যায় কিছু করিনি।"
রিয়াজ কোনো উত্তর দিল না।
তরুণটি আবার বলে উঠল, "আমি জানি, তুমি কেবল ওপরমহলের আদেশ পালন করছ। কিন্তু মনে রেখো, একদিন তোমারও বিচার হবে। এই পৃথিবীতে না হলেও, অন্য কোথাও।"
রিয়াজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে উঠল। "অন্য কোথাও বলতে কী বোঝাতে চাও?"
"তা তুমি ভালো করেই জানো।"
"আমি কিছু জানি না। আমি কেবল আমার কাজ করি।"
"তোমার কাজ কি মানুষ খুন করা?"
রিয়াজ এবার আর কোনো কথা বলল না। সে বন্দুকটা তুলল। কিন্তু এবার গুলি করল না। পরিবর্তে পকেট থেকে বের করল একটা ছোট সিরিঞ্জ, যার ভেতরে স্বচ্ছ তরল চিকচিক করছে। তরুণটির চোখে প্রথমবারের মতো ভয়ের ছায়া দেখা গেল। "এটা কী?"
"শান্তি।"
"কী ধরনের শান্তি?"
"চিরশান্তি।"
রিয়াজ মুহূর্তের মধ্যে সিরিঞ্জের সুচটি ফুটিয়ে দিল তরুণটির ঘাড়ে। ছেলেটি একবার খিঁচুনি দিয়ে কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে তার শরীর নিস্তেজ হতে শুরু করল। চোখ দুটো খোলা রইল, কিন্তু দৃষ্টি ক্রমেই হারিয়ে গেল শূন্যতায়। শেষ মুহূর্তে তার ঠোঁট দুটো সামান্য নড়ে উঠেছিল। করিম পরে বলেছিল, "সম্ভবত সে তখন কোনো প্রার্থনা করছিল।" তরুণটির প্রাণহীন দেহটা পাশে ঠেলে দিতেই তা নৌকার তলায় ভারী শব্দে আছড়ে পড়ল।
এরপর রিয়াজের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তৃতীয় তরুণের ওপর। তৃতীয় তরুণটি তখনও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল নদীর দিকে। তার নাম কী ছিল, কেউ জানত না। সে কী করত, কোথা থেকে এসেছিল, তার কোনো পরিচয়ই করিমের জানা ছিল না। কিন্তু বহু বছর পর করিম বলত, "ওই ছেলেটার মুখ আমি কোনোদিনই ভুলতে পারিনি।"
"কেমন ছিল সে?"
"বহুদিন ধরে ভয়ের সঙ্গে বাস করা মানুষের যেমন হয়, ঠিক তেমন। চোখের নিচে গভীর কালি, ঠোঁট ফাটা, গাল বসে যাওয়া। কিন্তু তার চোখের ভেতরে এমন এক অদ্ভুত দীপ্তি ছিল, যা আমি আর কখনো দেখিনি।"
"কী ধরনের দীপ্তি?"
"মনে হতো সে যেন সবকিছুর শেষ দেখে ফেলেছে। সে জানে তার সঙ্গে কী ঘটতে চলেছে, অথচ বিন্দুমাত্র ভয় তার মধ্যে নেই।"
রিয়াজ এসে দাঁড়াল সেই তরুণের সামনে।
"তোমার কি কিছু বলার আছে?"
তরুণটি ধীরে ধীরে নদী থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল রিয়াজের দিকে। "কী বলব?"
"তোমার শেষ কথা।"
"শেষ কথা বলে কী লাভ? তুমি তো তা শুনবে না।"
রিয়াজ পলকহীন তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, "শুনব।"
তরুণটি মৃদু হাসল। "আমি জানি তুমি শুনবে না। তোমার ভেতরে মানবতা বলে কিছু নেই। মানুষ হলে তোমার হাত কাঁপত, চোখে জল আসত, অন্তত তোমার নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ত। কিন্তু তুমি একটা যন্ত্র বৈ আর কিছু নও, যাকে হুকুম দেওয়া হয়, আর সে তা অন্ধের মতো পালন করে।"
রিয়াজের মুখের চেহারায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এল না। "বলা শেষ?"
তরুণটি আর একটাও কথা বলল না। সে আবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল নদীর অন্ধকার জলের দিকে। মনে হচ্ছিল সে যেন তার মাকে ডাকছে, কিংবা তার বাবার মুখটা মনে করার চেষ্টা করছে, অথবা তার প্রিয় মানুষটির জন্য শেষ প্রার্থনা করছে। তারপর সে নিজেই চোখ বুজে ফেলল।
রিয়াজ বালিশটা তুলে ধরল। বন্দুকের নলটা শক্ত করে চেপে বসল তার মাথায়। আরও একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ। তরুণের দেহটা ঢলে পড়ল নৌকার তলায়। করিম এবার আর চোখ বন্ধ করতে পারেনি, কিন্তু সেই শব্দটা তার মনের ভেতরে এমনভাবে গেঁথে গেল, যা সে আর কখনো মাথা থেকে মুছতে পারেনি।
পরপর তিনটি মৃত্যুর পর নৌকাটায় নেমে এল এক অতলস্পর্শী নীরবতা। এত গভীর নীরবতা, যে করিমের মনে হলো তার নিজের হৃৎস্পন্দনও বুঝি থেমে গেছে। রিয়াজ এসে বসল নৌকার পেছনের দিকে। পকেট থেকে আরেকটি সিগারেট বের করে ধরাল। ছোট শিখায় তার মুখটা যখন আবার আলোয় ভাসল, সেখানে নেই এক ফোঁটা রক্ত, নেই কোনো ক্লান্তির ঘাম, নেই কোনো অনুশোচনার আবেগ। কেবল এক চরম শুষ্ক প্রশান্তি, যা করিমকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আতঙ্কিত করে তুলল।
সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে রিয়াজ বলল, "এবার শরীরগুলো ফেলার ব্যবস্থা করো।"
করিম হতভম্ব হয়ে গেল। "কীভাবে?"
"নৌকার কোণায় বস্তা আছে, ইট আছে, দড়িও আছে। শরীরের সঙ্গে ইট-বস্তা শক্ত করে বেঁধে নদীতে ফেলে দাও।"
করিম পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল। সে জীবনের কত বছর এই নদীতে মাছ ধরেছে, জলে ভেসে যাওয়া লাশ দেখেছে, কিন্তু নিজ হাতে কাউকে খুন করে সেই মৃতদেহ জলে ডুবিয়ে দেওয়ার কাজ সে কখনো করেনি।
"আমি পারব না," করিম ফিসফিস করে বলল।
রিয়াজ ঠান্ডা গলায় তাকাল। "পারবে। তোমাকে পারতেই হবে।"
"না, আমি পারব না। এটা আমার কাজ নয়।"
রিয়াজ উঠে দাঁড়াল। তার হাতে তখনও সেই মারণাস্ত্র। "তোমার কাজ কী আর কী নয়, সেটা এখন থেকে আমি ঠিক করব। আর যদি আমার কথা অমান্য করো, তবে তোমাকেও এই নদীর জলে চিরতরে মিলিয়ে যেতে হবে।"
করিম রিয়াজের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো হুমকি বা রাগ ছিল না, ছিল কেবল এক নিষ্ঠুর ও চরম বাস্তবতার প্রকাশ। করিম বুঝতে পারল, এই মানুষটা তাকে হত্যা করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করবে না।
অগত্যা সে কাজে হাত দিল। তবে একা নয়, পেছন থেকে তিন সৈন্য এগিয়ে এল। তারা নৌকার কোণা থেকে বস্তা, ইট আর দড়ি বের করল। প্রথম দেহটা ছিল সেই তরুণের, যে একটু আগে তার মায়ের কথা বলেছিল। করিম তার মুখের দিকে তাকাল। শরীরটা তখনও পুরোপুরি ঠান্ডা হয়নি। চোখ দুটো আধখোলা। মুখের ওপর এমন এক অভিব্যক্তি জমে আছে, যা মৃত্যুর পরেও বদলায়নি। করিম কাঁপতে কাঁপতে তার চোখ দুটো বন্ধ করে দিল। সৈন্যরা বস্তাটা এগিয়ে দিল। ভারী বস্তা, যার ভেতর ভরা আছে ইট। শক্ত দড়ি দিয়ে মৃতদেহটির সঙ্গে তা খুব ভালো করে বাঁধা হলো। তারপর এক সৈন্য টেনে নিয়ে গেল নৌকার কিনারায়।
নদী তখনও তার নিজের গতিতে বয়ে চলেছে, কালো জল, ঠান্ডা জল, নিঃশব্দ স্রোত। সৈন্যটি দেহটা জলে ঠেলে দিল। ছোট্ট একটা শব্দ। তারপর সব ডুবে গেল গভীর অতলে। এরপর দ্বিতীয় দেহ। তারপর তৃতীয় দেহ। প্রতিবারই একই প্রক্রিয়া, বস্তা, ইট, দড়ি আর জলের শব্দ। করিম শুধু পাশে দাঁড়িয়ে দেখল, তার হাত কাঁপছে, কিন্তু কেউ তাকে আর কিছু করতে বলল না।
কিছুক্ষণ পর নদী আবার আগের মতো শান্ত হয়ে গেল। যেন কিছুই ঘটেনি। সব কটি দেহ জলে ডুবিয়ে দেওয়ার পর রিয়াজ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল, "এবার নৌকা ঘাটে ফিরিয়ে চলো।"
করিম বৈঠা হাতে তুলে নিল। তার হাত দুটো অসাড় হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল তার শরীরের ভেতরের সমস্ত শক্তি কেউ যেন এক নিমিষে শুষে নিয়েছে। নৌকা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে ফিরতে শুরু করল।
রাত তখন প্রায় দুটো বাজে। দূরের গ্রামগুলো গভীর ঘুমে মগ্ন, কোথাও কোনো আলোর লেশমাত্র নেই। কেবল জলের বুক চিরে চলা নৌকা আর মাথার ওপর ভারী মেঘের আকাশ। করিম বৈঠা বাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মনে মনে ভাবছিল, এই রাতের বীভৎসতার কথা সে কি কাউকেও বলতে পারবে না? বললেই তো সে নিজেও বাঁচবে না। অথচ তার মন চাইছে সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে।
হঠাৎ রিয়াজের গলা ভেসে এল, "কী ভাবছ এত?"
করিম চমকে উঠল। "কিচ্ছু না।"
"মিথ্যা বলছ।"
করিম আর কোনো কথা বলল না।
রিয়াজ শীতল স্বরে সতর্ক করল, "আজ রাতে যা দেখেছ, সব ভুলে যাও। যদি বাঁচতে চাও, তবে এই স্মৃতি মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলো।"
করিম ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ, স্যার।"
"আর ভুলেও কখনো এ কথা কারও কাছে মুখ ফসকে বেরোবে না।"
"বলব না।"
"তোমার পরিবার আছে তো? স্ত্রী, সন্তান?"
"আছেন।"
"বেশ, তাহলে তাদের কথাও একটু মাথায় রেখো।"
কথাটা সুনির্দিষ্ট এক হুমকি, করিম তা বুঝতে একটুও ভুল করল না। রিয়াজ তাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল যে মুখ খুললে তার পরিবারের ওপরও নেমে আসবে একই রকম বিপর্যয়। করিম আর একটি শব্দও করল না। নৌকা এগিয়ে চলল ভয়ের চাদর ভেদ করে অন্ধকারের বুক চিরে। করিম জানত, তার জীবনের বাকিটা সময় হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু যে জিনিসটা কখনোই বদলাবে না, তা হলো এই নদী। এই নদী আজ রাতে নিজের বুকে চেপে নিয়েছে তিনটি ভয়ংকর গোপন সত্য। আর নদীর পেট থেকে সেই গোপন কথা বের করার সাধ্য কারোর নেই।
পরদিন সকালে করিম ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘাটে ফিরে এল। তখন সূর্য উঠেছে, নদীর জল চকচক করছে, চারদিকে পাখির কলকাকলি, জেলেরা জাল নিয়ে বেরিয়েছে মাছ ধরতে। সবকিছু এত স্বাভাবিক, এত সুন্দর যে করিমের নিজেরই মনে হচ্ছিল গত রাতের সমস্ত ঘটনা কি সত্যি কোনো স্বপ্ন ছিল? কিন্তু তার হাত দুটো তখনও কাঁপছিল। তার বুকের ভেতরে চেপে বসেছিল একটা অদৃশ্য ভারী পাথর।
সে নৌকা বেঁধে সোজা বাড়ি ফিরে গেল। স্ত্রী উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "এত দেরি হলো যে আজ?"
করিম কোনো উত্তর দিল না। সে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। সে ভেবেছিল ঘুমোলে হয়তো এই ক্লান্তি কেটে যাবে, সব ভুলে যাওয়া যাবে। কিন্তু কপালে ঘুম এল কই? চোখ বুজলেই ভেসে উঠছে সেই তিন তরুণের মুখ। প্রথম তরুণের নিঃশব্দ কান্না, দ্বিতীয়জনের শান্ত প্রার্থনা, তৃতীয়জনের স্থির উদাসীন দৃষ্টি। আর সেই শব্দগুলো।
করিম একঝটকায় বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। তার স্ত্রী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল, "তোমার শরীর কি খারাপ লাগছে?"
"না।"
"তাহলে এমন করছ কেন?"
"কিচ্ছু হয়নি। একটু ক্লান্তি।"
স্ত্রী আর বেশি ঘাঁটাল না বটে, তবে সে মনে মনে ঠিকই বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা লুকাচ্ছে করিম। এর আগে সে কখনো এত রাতে ফেরেনি, এমন ফ্যাকাশে মুখ নিয়েও কখনো বাড়ি ফেরেনি। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ এল, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস। কিন্তু সেই রাতের স্মৃতি করিমের ছায়া ছাড়ল না। সে রাতে ঘুমাতে পারত না, নদীর জলে নামলে আর বৈঠা ধরতে ইচ্ছে করত না। মাছ ধরার প্রতি তার চিরকালের আগ্রহ চিরতরে মরে গেল।
তার স্ত্রী ও সন্তানেরা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু করিম কাউকেই কিচ্ছু বলতে পারল না। সে জানত, এই গোপন সত্য তার নিজের এবং তার পরিবারের মৃত্যু পরোয়ানা ডেকে আনবে। এরপর আরও কিছু রাত এল, যেগুলোতে করিমকে একইভাবে ডেকে পাঠানো হতো। প্রতিবারই কাজের ধরন ছিল এক, নৌকা ভাড়া করা, তিন-চারজন তরুণকে তোলা, মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করা, আর তারপর বস্তাবন্দী করে জলে ডুবিয়ে দেওয়া। তবে এখন আর রিয়াজ একা আসত না, সঙ্গে থাকত পাঁচজন সৈন্য, কখনো আরও বেশি। তারা সবাই মিলে এই কাজ করত।
করিম এই সবকিছুর এক নির্বাক ও অসহায় সাক্ষী হয়ে রইল। সে আর প্রতিবাদ করার সাহসও পেত না, কারণ সে জানত প্রতিবাদ করে কোনো ফল হয় না। সে কেবল নিজের কাজটুকু চুপচাপ করে যেত, মুখ বুজে থাকত, আর রাতের শেষে বাড়ি ফিরে অন্ধকারে একা একা কাঁদত। কখনো কখনো তার মনে হতো সে নিজেও একজন খুনি। সে তো এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী। তার নিজের হাতেও তো রক্তের দাগ লেগে গেছে।
তবু সে কিছু করতে পারত না। রিয়াজ ও তার সৈন্যরা অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তার পুরো পরিবার ধুলোয় মিশে যেত। তাই সে কেবল সহ্য করে গেছে। আর এই নীরবতার অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে তিলে তিলে খেয়ে ফেলছিল।
বছর পার হয়ে গেল। কত বছর, করিম তার হিসাব রাখেনি। কিন্তু একদিন হঠাৎ সে খবর পেল, রিয়াজুল হাসান গ্রেপ্তার হয়েছে। খবরটা শুনে প্রথমে তার বুক থেকে যেন একটা হিমালয় সমান পাথর নেমে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে চেপে বসল তীব্র আতঙ্ক। রিয়াজ যদি মুখ খোলে, তবে তো করিমের নামও চলে আসবে। সেও তো ফেঁসে যাবে আইনের জালে। তাই ভয়ে ভয়ে দিন কাটতে লাগল তার। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, রিয়াজ জেরার মুখে কাউকেই ফাঁসাল না। আদালতে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে সে কেবল বলল, "নট গিল্টি।"
এই ঘটনারও বহু বছর পরের কথা। করিম এখন একজন জীর্ণ বৃদ্ধ। চুল পুরোপুরি সাদা, হাত কাঁপে, চোখে ছানি পড়েছে। কিন্তু মনের ভেতরে সেই রাতের ক্ষতগুলো এখনও টাটকা। তার পাশে নদীর পাড়ে বসা তার বড় ছেলে রশিদ। বয়স তার প্রায় চল্লিশ ছুঁইছুঁই। সে জানে না তার বাবা জীবনে কী কী দেখেছে, সে শুধু এটুকুই জানে যে তার বাবা আজও রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না এবং মাঝেমধ্যে ভয়ে আঁতকে ওঠে।
"বাবা, তুমি কি ঠিক আছ?" রশিদ স্নেহের সুরে জিজ্ঞেস করে।
করিম চমকে তাকায়। "হ্যাঁ রে। কেন?"
"তুমি আবার সেই খারাপ স্বপ্নটা দেখছিলে?"
করিম কোনো উত্তর দেয় না। সে কেবল অপলক তাকিয়ে থাকে নদীর দূর দিগন্তে। রশিদ বুঝতে পারে তার বাবার বুকে ভারী কোনো গোপন বেদনা জমে আছে। কিন্তু সে কখনো জোর করে তা জানতে চায়নি। সে জানত, কিছু কষ্টের কথা মুখ দিয়ে বের করতে মানুষের অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, আর করিম বহু বছরেও সেই প্রস্তুতি নিতে পারেনি।
কিন্তু আজ বুঝি সেই সময় এসেছে। করিমের আয়ু ফুরিয়ে আসছে, শরীর ভেঙে পড়েছে, আর সে জানে এই সত্য সঙ্গে নিয়ে মারা গেলে তার আত্মা কখনো মুক্তি পাবে না। খুব মন্থর ও ভাঙা গলায় সে বলা শুরু করল, "রশিদ, তুই কি জানিস এই নদীতে কত মানুষ মরেছে?"
রশিদ অবাক হয়ে তাকাল। "কী বলছ বাবা এসব?"
"হ্যাঁ রে, এই নদীর মাঝবক্ষেই তো বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অনেক তরুণ প্রাণ। তাদের খুন করে এই জলেই ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।"
রশিদের মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "তুমি এসব কীভাবে জানো?"
করিম একটা দীর্ঘ ও ভারী নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, "কারণ আমি নিজে সেই নৌকায় ছিলাম।"
রশিদ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। তার বাবা একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মাঝি, যে সারাজীবন কেবল জাল টেনে মাছ ধরেছে, সে কীভাবে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হতে পারে? কিন্তু করিমের চোখের ভাষা, তার কাঁপা কণ্ঠস্বর আর বিবর্ণ চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে কোনো মিথ্যা বলছে না।
"বাবা, তুমি এতদিন আমাকে একটা কথাও বলোনি কেন?"
করিম মাথা নিচু করে রইল। "ভয় ছিল রে। ওরা বলেছিল মুখ খুললে আমাদের পুরো পরিবারকে মেরে ফেলবে।"
"কে বলেছিল এমন কথা?"
"রিয়াজুল হাসান।"
নামটা শোনা মাত্র রশিদের সারা শরীর শিউরে উঠল। এই নাম সে খবরের কাগজে, টিভিতে বহুবার দেখেছে। রিয়াজুল হাসান, যাকে লোকে এক নামে চেনে 'মৃত্যুর ফেরিওয়ালা' হিসেবে। যে নাকি শত শত মানুষকে গুম করে তাদের লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল এবং ক্ষমতার জোরে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াত।
"বাবা, তুমি কি এই সত্য আদালতে গিয়ে বলবে?"
করিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। "জানি না। যদি বলি, তারপর কী হবে?"
"ন্যায়বিচার হবে।"
"ন্যায়বিচার? এই দেশে কি কখনো অপরাধীর সঠিক বিচার হয়েছে?"
রশিদ কোনো উত্তর দিতে পারল না।
করিম আবার বলতে শুরু করল, "আমি যদি এখন মুখ খুলি, তবে আইন আমাকেও ছাড়বে না। আমিও তো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমিই তো নৌকা চালিয়েছি, আমিই তো মরদেহের সঙ্গে ইট বেঁধে জলে ফেলেছি।"
"কিন্তু তুমি তো বাধ্য ছিলে বাবা।"
"বাধ্য ছিলাম, তা আদালতে প্রমাণ করতে হবে। আর আদালতের কাঠগড়ায় অত সহজে সব প্রমাণ করা যায় না।"
রশিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নরম গলায় বলল, "তবুও সত্যটা বলা দরকার। এই মানুষগুলো যদি জীবনেও ন্যায়বিচার না পায়, তবে তাদের নিখোঁজ আত্মারা কখনো শান্তি পাবে না।"
করিম আবার তাকাল নদীর দিকে। সূর্য তখন ডুবুডুবু, পশ্চিমের আকাশ রক্তিম আলোয় আচ্ছন্ন। মনে হচ্ছে সমগ্র নদীর জল যেন রক্তে লাল হয়ে আছে।
"জানি," করিম ফিসফিস করে বলল। "কিন্তু এত বছর পর বুকভরা সাহস করে সব সামনে আনার শক্তি কি আমার আছে?"
রশিদ এগিয়ে এসে শক্ত করে ধরল তার বাবার কাঁপতে থাকা হাত দুটো। "আমি আছি তো তোমার সঙ্গে, বাবা। তুমি একা নও।"
করিমের ঝাপসা চোখ গড়িয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। বহু বছর পর আজ সে সত্যিকারের কান্না কাঁদছে।
মাসের পর মাস কেটে গেল। করিমের মনের ভেতরে দ্বন্দ্ব চলল। সে জানত সত্য বলা উচিত, কিন্তু সে এও জানত সত্য বলার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। রিয়াজ তখন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকলেও তার বহু অনুচর ও দোসর এখনও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা চাইলে মুহূর্তের মধ্যে করিম বা তার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
তবু রশিদ প্রতিদিন তাকে সাহস জোগাত। "বাবা, তুমি মুখ না খুললে ওই নিখোঁজ ছেলেগুলোর মা সারা জীবন অপেক্ষা করে যাবে, কোনোদিন জানতেই পারবে না তাদের সন্তান কোথায় হারিয়েছিল।"
শেষ পর্যন্ত করিমের ভেতরের দীর্ঘদিনের অবদমিত বিবেক জয়ী হলো। সে সিদ্ধান্ত নিল, আর নয়। সে সমস্ত ভয়কে দূরে সরিয়ে রেখে এক মানবাধিকার কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করল। তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হলো। সে একে একে খুলে বলল সব ঘটনা, কীভাবে রাতে লোকগুলো আসত, কীভাবে তরুণদের তুলে আনা হতো, কীভাবে ঠান্ডা মাথায় তাদের খুন করে বস্তাবন্দী করে জলে ফেলে দেওয়া হতো। করিমের প্রতিটি কথায় বেরিয়ে এল সেই বিভীষিকার নিখুঁত চিত্র।
রেকর্ড করার সময় সেই কর্মীর হাত দুটো পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। সে বলেছিল, "করিম চাচা, আপনার এই সাক্ষ্য রিয়াজুল হাসানের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে।"
করিম কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়েছিল নদীর দিকে। তার মনে হয়েছিল, এত বছর পর নদীর গভীরের সেই অভিশপ্ত আত্মারাও বুঝি আজ একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।
আইনের লড়াই শুরু হলো। আদালতে যখন করিম সাক্ষ্য দিতে দাঁড়াল, তখন চারপাশের বাতাসে এক নিস্তব্ধ নীরবতা। বিচারক যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "এত বছর পর কেন আপনি এই সত্য প্রকাশ করছেন?"
করিম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্টভাবে উত্তর দিয়েছিল, "কারণ আমি জানি, আমি যদি আজ মুখ না খুলি, তবে আমার নিজের আত্মাও কখনো মুক্তি পাবে না।"
আদালতকক্ষ তখন থমথমে। করিমের চোখ দুটো ভেজা, কিন্তু তার মুখে ছিল এক পরম স্বস্তির দীপ্তি।
বহু দিন কেটে গেছে তারপর। করিম আর নেই, কিন্তু সে রেখে গেছে তার অটল সত্যবাদিতা। আজ তার ছেলে রশিদ নদীর পাড়ে এসে বসে। চারদিকে সন্ধ্যা নামে, নদীর বুক চিরে বয়ে চলে অন্তহীন স্রোত। নদী কি কোনোদিন কোনো কথা বলে? না, নদী কখনো মুখ খোলে না। সে কেবল নিজের গতিতে বয়ে চলে, নীরবে, নিভৃতে, অন্ধকারের দিকে। কিন্তু নদী সব জানে। সে জানে কত মানুষের কান্না, কত মানুষের শেষ নিঃশ্বাস আর কত না বলা রহস্য তার বুকে লুকানো আছে।
তবুও মানুষ আশায় বাঁচে। সত্য কখনো চিরকাল চাপা থাকে না। সে একদিন ঠিকই নদীর গভীর থেকে পচে-গলে ওপরে ভেসে ওঠে, ঠিক যেমন ভেসে ওঠে মৃতদেহ, তেমনি বেরিয়ে আসে অকাট্য সত্য। আর সেই সত্যের আলোতেই একদিন পৃথিবী দেখতে পায় মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, আবার প্রয়োজনবোধে কতটা সাহসীও হতে পারে। করিম সেই সাহস দেখিয়েছিল। সে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল।
আজ নদীর বুকে আর কোনো ভয় নেই, আছে কেবল বয়ে চলার অবিনাশী ছন্দ। রশিদ নদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। সে জানে, এই নদী শুধু বয়েই চলে না, এই নদী এক জীবন্ত ইতিহাস, যা একদিন সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথ দেখাবে। কারণ সত্যের মৃত্যু নেই। সত্য চিরকাল বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতির পাতায় আর সময়ের অবিরাম স্রোতে।