প্রকাশিত : ১১:২৪
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩২
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাজার কখনো অস্থিরতা, কখনো আস্থার সংকট, আবার কখনো অর্থনৈতিক নানা চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সূচকের ওঠানামা, শেয়ারের দরপতন এবং লেনদেনে গতি কমে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ লোকসানের ভয়ে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে কি আতঙ্কিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, নাকি পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় মূল্যায়ন করার সময়?
আমাদের বিবেচনায়, পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা, ধৈর্য এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। কারণ বাজারের একটি খারাপ সময় কখনোই পুরো বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।
পুঁজিবাজারে সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যায়নে অসামঞ্জস্য তৈরি হলে বাজারে দর সংশোধন হয়। সেই সংশোধনের ফলে অনেক শেয়ারের দাম এমন পর্যায়ে চলে আসতে পারে, যেখানে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো নতুন করে বিনিয়োগকারীদের নজরে আসার সুযোগ পায়। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বাজারের সব শেয়ার এক নয়। কোনো শেয়ারের দাম কমেছে বলেই সেটি সস্তা হয়ে গেছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বরং এই সময়টিই হতে পারে ভালো কোম্পানি বাছাইয়ের সময়।
যেসব কোম্পানির ব্যবসা শক্তিশালী, আয় ও নগদ প্রবাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল, ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রিত, সুশাসন রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির বাস্তব সম্ভাবনা আছে, তাদের মূল্যায়ন নতুন করে করা দরকার। বাজার যখন দুর্বল থাকে, তখনই অনেক সময় শক্তিশালী কোম্পানি ও দুর্বল কোম্পানির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এখানে বিনিয়োগকারীদের একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো অন্যের আতঙ্ক দেখে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া। একজন বিনিয়োগকারী লোকসানের ভয়ে বিক্রি করছেন, আরেকজন সেই শেয়ার কেনার সুযোগ খুঁজছেন। দুজনের সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে একটি বিষয়ই, তা হলো বিশ্লেষণ।
বাজারের এই সময়ে গুজবের চেয়ে তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবর, বাজার নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য কিংবা কোনো শেয়ারের ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে অনুমান বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসার কার্যক্রম, পরিচালনাগত সক্ষমতা, আয়, লভ্যাংশ, মূল্য-আয় অনুপাত এবং খাতভিত্তিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারে গতি ফেরানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতে পারে না। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি বিনিয়োগকারীদের আস্থা।
বাজারে আস্থা এক দিনে তৈরি হয় না। আবার এক দিনেই তা নষ্টও হয় না। দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা, নীতির স্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার দৃশ্যমান উদ্যোগের মাধ্যমেই সেই আস্থা তৈরি করতে হয়।
এ কারণে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে শুধু পতনের চোখে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি বাজারের পুনর্মূল্যায়নের একটি পর্যায়ও হতে পারে। যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মানসিকতা নিয়ে বাজারে এসেছেন, তাদের জন্য প্রতিদিনের সূচকের ওঠানামার চেয়ে কোম্পানির প্রকৃত অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে এখন চোখ বন্ধ করে শেয়ার কেনার সময়। বরং উল্টোটা। এখন আরও বেশি সতর্ক হওয়ার সময়। বিনিয়োগকারীর হাতে যদি নগদ অর্থ থাকে, তবে পুরো অর্থ একবারে বাজারে না ঢুকিয়ে ধাপে ধাপে বিনিয়োগের কৌশল বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিজের ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা, বিনিয়োগের সময়কাল এবং আর্থিক প্রয়োজনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
যে অর্থ অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজন হতে পারে, তা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করা কোনোভাবেই বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে লোকসানের সম্ভাবনাকেও বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে হবে।
তবে আরেকটি বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই। বাজারের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে বহুবার। যখন চারদিকে হতাশা, তখনই ভালো সম্পদের মূল্যায়ন নতুন করে করার সুযোগ আসে। অবশ্য সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সাহসের পাশাপাশি প্রয়োজন জ্ঞান এবং শৃঙ্খলা।
শুধু সূচক কোথায় আছে, সেটিই শেষ কথা নয়। সূচকের ভেতরে কোন খাত এগোচ্ছে, কোন কোম্পানির আয় বাড়ছে, কোন কোম্পানি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ করছে, কোন কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেল টেকসই এবং কোথায় ঝুঁকি বাড়ছে, সেসব প্রশ্নই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পুঁজিবাজারে প্রত্যাশা থাকা দরকার, কিন্তু অতি প্রত্যাশা নয়। আশাবাদ থাকা দরকার, কিন্তু অন্ধ আশাবাদ নয়। ঠিক তেমনি সতর্কতা প্রয়োজন, কিন্তু আতঙ্ক নয়।
আজকের বাজার হয়তো বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। কিন্তু বাজারের প্রতিটি দুর্বল সময়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কিছু দরজা খোলা থাকে। সেই দরজা দেখতে হলে বাজারকে আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে দেখতে হবে।
সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারী, প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে বাজারকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যাওয়ার। বাজারকে কেবল সূচক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে হবে না। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ভালো কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ করবে, বিনিয়োগকারী ন্যায্য মূল্যায়ন পাবেন এবং বাজার অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির অংশীদার হবে।
এখন তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘বাজার আর কত নামবে?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘এই বাজারে কোন কোম্পানিগুলো সত্যিকার অর্থে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত?’
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলেই অস্থিরতার মধ্যেও সুযোগ দেখা সম্ভব।
পুঁজিবাজারে ধৈর্য সব সময় পুরস্কৃত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত যে ঝুঁকি বাড়ায়, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই বর্তমান সময়ে সবচেয়ে প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি দেখা, তথ্য যাচাই করা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বাজারের এই কঠিন সময় চিরস্থায়ী নয়। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরলে এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও সুশাসন শক্তিশালী হলে পুঁজিবাজারেও নতুন গতি আসতে পারে।
তাই আতঙ্কে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার সময় নয়। আবার অন্ধভাবে দরজা খুলে দেওয়ারও সময় নয়। সময় হলো দরজার ওপাশে কী আছে, তা ভালোভাবে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
বিনিয়োগ আপনার। সিদ্ধান্তও আপনার। তবে সিদ্ধান্তটি হোক তথ্যভিত্তিক, ধৈর্যশীল এবং দায়িত্বশীল।
কারণ পুঁজিবাজারে সুযোগ যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে। আর সেই ঝুঁকি বুঝে যে বিনিয়োগকারী এগিয়ে যেতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদে তিনিই সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে থাকেন।