প্রকাশিত : ০৮:৫১
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সম্প্রতি ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরিত নতুন এই বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মিছিল, শোডাউন, হেলিকপ্টারের ব্যবহার এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বিভ্রান্তিকর বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট প্রচারের ওপরও কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচারণা এবং নির্বাচনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিধিভঙ্গের অপরাধে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন নির্বাচনী আচরণবিধির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পোস্টার নিষিদ্ধকরণ। প্রার্থী বা তাদের কোনো সমর্থক প্রচার কাজে পোস্টার ঝুলানো বা সাঁটাতে পারবেন না।
একই সঙ্গে ভবন, দেয়াল, গাছপালা, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সেতু, কালভার্ট ও সরকারি স্থাপনায় প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল গেজেট হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের প্রকাশ্য মিছিল বন্ধ থাকবে। বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌযান বা ট্রেন ব্যবহার করে কোনো মিছিল ও শোভাযাত্রা করা যাবে না। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টারসহ যেকোনো ধরনের আকাশযান ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন।
তবে এজাতীয় প্রচারণা শুরুর পূর্বে ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যমসমূহ সম্পর্কে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচার খরচকেও প্রার্থীর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অসদব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। প্রার্থী বা তার সমর্থকরা নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক বা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্বাচনবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে ক্ষতি করতে পারে—এমন কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটারদের আকৃষ্ট বা প্রভাবিত করতে অর্থ লেনদেন, খাদ্য-পানীয় পরিবেশন কিংবা উপহারসামগ্রী বিতরণের ওপর কড়া কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়ে যেকোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রয়োগ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও ব্যক্তিগত চরিত্রহননমূলক অপপ্রচার পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না। সরকারি যানবাহন, মাইক বা অন্য কোনো সরকারি সম্পত্তি প্রচার কাজে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ওপরও কড়াকড়ি থাকছে।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য কোনো ধরনের যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারণায় নির্ধারিত সীমার বাইরে নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন ও মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিমালার সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে।
নতুন বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্ষমতা আরো বাড়ানো হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন কিংবা লঙ্ঘনের চেষ্টা করছেন বলে মনে হলে ইসি বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এবং অপরাধ গুরুতর হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলেরও সুযোগ রয়েছে।
তাছাড়াও নির্ধারিত ব্যয়সীমা লঙ্ঘন, অর্থ কিংবা পেশিশক্তির মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিতকরণ এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহারপূর্বক প্রচারণা পরিচালনাকে নতুন বিধিমালায় দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের এই নতুন বিধিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে আরো অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন বন্ধ রাখা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে এআইনির্ভর অপপ্রচার ঠেকানোর মতো বিধানগুলো এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।