প্রকাশিত : ০৭:১৩
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বর্তমানে শেখ সেলিম দলের সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। তাই তার অনুপস্থিতিতে সভাপতির দায়িত্ব তিনিই পালন করবেন।
ছোট বোন শেখ রেহানা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।’
দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে দেশে ফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেন শেখ হাসিনা।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে হত্যার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি দেশে ফেরার জন্য নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চাই না।’
তিনি জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে বলে দাবি করেন শেখ হাসিনা। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীদের উত্থানের খেসারত ভারতকেও দিতে হবে।’
তার বক্তব্য, বাংলাদেশের অস্থিরতা এবং মৌলবাদী শক্তির বিস্তার ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও নয়াদিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার কী ভেবে বাংলাদেশের নির্বাচন সমর্থন করল, তারেককে ফিরিয়ে আনল—সেটা ভারত সরকারই ভালো বলতে পারবে।’
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তার মতে, কোনো সামরিক জোটের পরিবর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ সময় তারেক রহমানের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বিদেশে অবস্থান করে রাজনীতি করেছেন। তার ভাষায়, ‘আমি তো বাধা দিইনি। আমি দিল্লি থেকে কথা বললেই দোষ?’
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দর-কষাকষি বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। দেশের পরিস্থিতি তাকে কতটা ব্যথিত করছে, তা বোঝাতে তিনি বলেন, ‘আমার তো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, যখন দেখছি আমার দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানালেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে অন্য কারও জীবন যাতে ঝুঁকিতে না পড়ে, সেই আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দেশে ফেরার জন্য সরকার ট্রাভেল ডকুমেন্ট না দিলে কীভাবে ফিরবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশটা আমার। আমার বাবা এদেশ স্বাধীন করেছে। আমরা এই দেশেই ছোটবেলা থেকে মানুষ হয়েছি। আর রাজনীতিতো স্কুল জীবন থেকেই আমি শুরু করেছি। সেখানে আমার দেশে কেন আমাকে ফিরতে দেবে না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’
তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকার ভারত সরকারের কাছে তাঁকে ফেরত দেওয়ার কথা বলছে। তার বক্তব্য, ‘যখন ফেরত দেওয়ার কথা বলছে তখন ফেরত কেন, আমি নিজেই যাব।’
দেশে ফেরার অনুমতি না দিলে অন্য কোনোভাবে প্রবেশ করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেটা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বর্তমান পরিস্থিতিকে অনুকূল নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে। এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারেরও সমালোচনা করেন তিনি এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলে মন্তব্য করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেশের মানুষের কাছে যাব। কারণ, মানুষ এখন কষ্ট পাচ্ছে। তাদের পাশে আমাকে দাঁড়াতে হবে। তাতে যদি আমার জীবনও যায় যাবে। কিন্তু আমি মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবন থেকে ভারতে যাওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশ ছেড়ে আসার ইচ্ছা তাঁর ছিল না এবং কী ঘটতে যাচ্ছে, তা-ও তিনি আগে জানতেন না।
তার ভাষ্য, একটি পরিস্থিতিতে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। এমনকি হেলিকপ্টারে করে সীমান্ত পার হওয়ার পর তাকে জানানো হয় যে তারা ভারতে যাচ্ছেন। এর আগে পর্যন্ত তিনি মনে করেছিলেন, তাঁকে তাঁর গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করেছি। তাদের লাশ ফেলার মাধ্যমে আমাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে কেন! এ অবস্থায় আমি বললাম আমার থাকার দরকার নেই। আমি চলে যাব।’
তিনি বলেন, ‘আমি যাব কোথায়? আমি বললাম যে, আমি যাব টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে। যখন আমি এয়ারক্রাফটে তখন আমি জানলাম আমি এখানে (ভারত) চলে এসেছি।’
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, ‘আমার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৬ লক্ষ মামলা দেওয়া হয়েছে।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, ‘যত জঙ্গি, সন্ত্রাসী ছিল তাদেরকে তারা ছেড়ে দিয়েছে।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও পুলিশের সদস্যদের ওপর সহিংসতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এসব বক্তব্যের বিষয়ে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার নিজস্ব ব্যাখ্যা ও দাবি তুলে ধরেছেন।
ডিসেম্বরের আগেই দেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে ফিরবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ডিসেম্বর মাসটি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই বেছে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসটা আমি বেছে নিয়েছি, আসলে এটা আমাদের বিজয়ের মাস।’
তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথাও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘এখন আমি আমার তৃণমূলের মানুষদের সঙ্গে কথা বলছি। তাদেরকে কোপায়, মারে, অত্যাচার করে, নির্যাতন করে। এগুলি চলছে। তারপরও এই অবস্থায় মানুষ আমাদের সঙ্গে কথা বলে।’
তিনি বলেন, ‘আগে না, ডিসেম্বর মাসেই যাবো আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেভাবেই আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি।’