প্রকাশিত : ১৬:০৯
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:৩৬
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট এখন শুধু সূচকের ওঠানামায় সীমাবদ্ধ নয়। বড় সংকট বিনিয়োগকারীদের আস্থায়। বাজারে টাকা খাটানোর আগে একজন বিনিয়োগকারী যদি কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক সক্ষমতা বা বাজারের সম্ভাবনার চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশি চিন্তা করেন, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি গভীরে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিএসইসির দায়িত্ব বাজারকে সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ রাখা। অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে বাজারের স্বাভাবিক গতি আটকে দেওয়া হলে সেই নিয়ন্ত্রণই একসময় বাজারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পুঁজিবাজারে একটি শেয়ারের দাম বাড়বে, কমবেও। সূচকও একইভাবে ওঠানামা করবে। এটাই বাজারের স্বাভাবিক চরিত্র। তাই দাম বাড়লেই কারসাজি হয়েছে কিংবা দাম কমলেই বাজার ধসে পড়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়ন্ত্রকের কাজ মূল্য নির্ধারণ করা নয়, বরং নিশ্চিত করা যে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি যেন কারসাজি ও প্রতারণামুক্ত থাকে।
জরিমানা দিয়ে কি আস্থা ফেরানো যায়?
অনিয়মের বিরুদ্ধে জরিমানা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু জরিমানার সংখ্যা দিয়ে নিয়ন্ত্রকের সাফল্য মাপা হলে সেটি ভুল বার্তা দিতে পারে।
একটি কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করলে কঠোর ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু প্রশাসনিক ত্রুটি, তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছাকৃত ভুল কিংবা নিয়মের ব্যাখ্যাগত সমস্যাকে একই মাত্রার অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে কোনো কোম্পানি বা বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগ, প্রমাণ ও আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা দরকার। কার্যকর শুনানি ও আপিলের সুযোগ থাকতে হবে। এতে নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা কমবে না, বরং সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জরিমানার উদ্দেশ্য যেন রাজস্ব আদায় বা সক্রিয়তা দেখানো না হয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অনিয়ম প্রতিরোধ এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা।
নিয়মের স্থিরতা কোথায়?
পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য নীতির স্থিরতা অপরিহার্য। উদ্যোক্তা যখন কোম্পানিকে বাজারে আনার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি কয়েক বছরের পরিকল্পনা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও দীর্ঘমেয়াদি হিসাব করেন। সেখানে নিয়ম ও নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন অনিশ্চয়তা বাড়ায়।
নিয়ন্ত্রকের হাতে নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে বলেই নিয়ম বারবার পরিবর্তন করতে হবে, এমন নয়। ভালো নিয়ন্ত্রক সেই প্রতিষ্ঠান, যার নীতি বাজার আগে থেকেই বুঝতে পারে।
বড় নীতি পরিবর্তনের আগে স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
ভালো কোম্পানি ছাড়া ভালো বাজার হয় না
পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো ভালো কোম্পানি বাজারে আনা। লাভজনক, সম্ভাবনাময় ও সুশাসনসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে না পারলে শুধু নজরদারি বাড়িয়ে বাজার গভীর করা যাবে না।
তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, তবে মানের ক্ষেত্রে আপস করা যাবে না। কোম্পানির আর্থিক তথ্য সহজবোধ্য ও সময়মতো প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ও দীর্ঘদিন লোকসানি কোম্পানির ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় স্পষ্ট নীতি দরকার।
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে শক্তিশালী কোম্পানি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর।
নজরদারি হবে অপরাধের বিরুদ্ধে
বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার, তবে সেই নজরদারির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত করা।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেন, সংঘবদ্ধ কারসাজি, কৃত্রিমভাবে মূল্য বাড়ানো-কমানো এবং গোপন তথ্যের অপব্যবহার দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। সেই সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অর্থাৎ বাজারকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং বাজারকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিয়ে অপরাধের জায়গায় কঠোর হওয়া দরকার।
পুঁজিবাজারের সব সমস্যার দায় কি বিএসইসির?
পুঁজিবাজারের দুর্বলতার জন্য বিএসইসির নীতি ও সিদ্ধান্তকে দায়ী করে যে সমালোচনা রয়েছে, তা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। তবে বাজারের ধসের একমাত্র কারণ হিসেবে বিএসইসিকে দায়ী করা বাস্তবতার সরলীকরণ হবে।
সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগকারীদের আচরণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, সবকিছুই পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করে।
তবে নিয়ন্ত্রকের সিদ্ধান্তের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত বাজারে আস্থা বাড়াতে পারে, আবার অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে। তাই বিএসইসির প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের আগে একটি প্রশ্ন করা উচিত: এতে কি বাজার আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে, নাকি বিনিয়োগকারীর আস্থা আরও কমবে?
এখন প্রয়োজন একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ
বিএসইসির উচিত আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা।
সেখানে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে অগ্রাধিকার থাকা দরকার: ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানো, নীতির স্থিরতা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি শক্তিশালী করা, শাস্তির ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কাঠামো তৈরি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো।
একই সঙ্গে বাজারের সব অংশীজনের জন্য একই নিয়ম ও একই মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। বড় বিনিয়োগকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য ভিন্ন আচরণ বাজারে আস্থার সংকট আরও বাড়াবে।
নিয়ন্ত্রক হবেন ট্রাফিক পুলিশ, চালক নন
পুঁজিবাজারকে বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে ট্রাফিক ব্যবস্থা। ট্রাফিক পুলিশের কাজ হলো দুর্ঘটনা ঠেকানো, আইন ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা। প্রতিটি গাড়ির গতি নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করা তার কাজ নয়।
বিএসইসির ভূমিকাও অনেকটা এমন হওয়া উচিত।
বাজারের প্রতিটি শেয়ারের দাম বা সূচকের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে কারসাজি, প্রতারণা ও বেআইনি লেনদেনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজারকে তার স্বাভাবিক শক্তিতে চলার সুযোগ দিতে হবে।
এর অর্থ নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া নয়। এর অর্থ হলো, স্বাভাবিক বাজার আচরণকে স্বাধীনতা দেওয়া এবং অপরাধকে শূন্য সহনশীলতায় দেখা।
আস্থাই শেষ কথা
পুঁজিবাজারে ঝুঁকি থাকবেই। কোনো বিনিয়োগকারীর লাভ হবে, কারও লোকসান হবে। শেয়ারের দাম কমলে নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব সেই দাম ধরে রাখা নয়। দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা, দামটি যেন স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের এখন তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থির নীতি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আস্থা।
বিএসইসির সাফল্য কতজনকে জরিমানা করা হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা ভালো কোম্পানি বাজারে এল, কতটা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তৈরি হলো এবং বিনিয়োগকারীরা কতটা নিশ্চিন্তে বাজারে থাকতে পারলেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।
পুঁজিবাজারকে বাঁচানোর নামে বাজারের স্বাভাবিক শক্তিকে দুর্বল করা যাবে না। আবার বাজারের স্বাধীনতার নামে কারসাজির সুযোগও দেওয়া যাবে না। এই দুইয়ের মাঝখানেই নিয়ন্ত্রকের সঠিক ভূমিকা।
বাজারকে চালানোর দায়িত্ব নিয়ন্ত্রকের নয়। নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব হলো এমন একটি মাঠ তৈরি করা, যেখানে সবাই একই নিয়মে খেলবে এবং নিয়ম ভাঙলে কেউ রেহাই পাবে না।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে এখন মূল প্রশ্ন সেটিই: বিএসইসি কি বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি এমন পরিবেশ তৈরি করবে যেখানে বাজার নিজেই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে?
দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়ার সময় এখনই।