প্রকাশিত : ০৬:৪৫
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিন সন্তানকে হত্যার অভিযোগে মা লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিচার জুরিদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে কোনো রায় ছাড়াই বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। শুক্রবার (৪ আগস্ট) ম্যাসাচুসেটসের প্লাইমাউথের এক বিচারক এ ঘোষণা দেন। খবর রয়টার্সের।
প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এবং টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এই বিচার যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্মের পর নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং মায়েরা সন্তান হত্যার মতো অপরাধ করলে আইন কীভাবে তা বিবেচনা করবে এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
বিচারক উইলিয়াম সুলিভান জুরিদের একাধিক নোট পাওয়ার পর মামলাটিতে মিস্ট্রায়াল ঘোষণা করেন। চলতি সপ্তাহে জুরিরা কয়েক দফা জানায়, তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না।
মিস্ট্রায়ালের ফলে মামলাটি পুনরায় বিচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে প্লাইমাউথ কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি টিম ক্রুজ জানিয়েছেন, প্রসিকিউশন পুনরায় বিচার চাইবে কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শিশুদের হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের কার্যালয়ের দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
৩৬ বছর বয়সী ক্ল্যান্সি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বোস্টনের উপকণ্ঠ ডাক্সবারির নিজ বাড়ির বেসমেন্টে তিন সন্তানকে ব্যায়ামের ইলাস্টিক ব্যান্ড দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। নিহতরা হলো, ৫ বছর বয়সী কোরা, ৩ বছর বয়সী ডসন এবং ৮ মাস বয়সী ক্যালান।
এরপর ক্ল্যান্সি নিজেকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং দ্বিতীয় তলার একটি জানালা দিয়ে লাফ দেন। আত্মহত্যার চেষ্টা হিসেবে বর্ণিত ওই ঘটনায় তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। বর্তমানে তিনি একটি রাষ্ট্রীয় মানসিক হাসপাতালে হেফাজতে রয়েছেন।
তার আইনজীবী কেভিন রেডিংটন আদালতে যুক্তি দেন, সন্তানদের হত্যার সময় ক্ল্যান্সি গুরুতর প্রসব-পরবর্তী মানসিক রোগ পোস্টপার্টাম সাইকোসিসে ভুগছিলেন। তাই তাকে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে নির্দোষ ঘোষণা করা উচিত।
রেডিংটন মিস্ট্রায়ালকে প্রতিরক্ষার জন্য জয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, একজন জুরি অন্য ১১ জনকে নির্দোষ রায় দেওয়ার পথে বাধা দিয়েছেন।
শুক্রবার জুরি প্যানেলের আলোচনার সপ্তম দিনে ওই জুরিকে সরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন রেডিংটন। তিনি জুরি ফোরম্যানের পাঠানো একটি নোটের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল একজন জুরি সন্দেহের বিষয়টি স্বীকার করলেও তা রায়ে প্রয়োগ করতে রাজি হচ্ছেন না।
তবে বিচারক সুলিভান ওই জুরিকে সরানোর আবেদন নাকচ করেন। এরপর রেডিংটন ম্যাসাচুসেটসের সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চান। কিন্তু জরুরি আবেদনটি খারিজ করে দেয় সর্বোচ্চ আদালত। এর পরই বিচারক মিস্ট্রায়াল ঘোষণা করেন।
প্রসিকিউশনও স্বীকার করেছে যে সাবেক নার্স ক্ল্যান্সি মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে তাদের দাবি, সন্তানদের হত্যা করা ভুল এ বিষয়টি তিনি বুঝতে পারতেন এবং জেনেশুনেই হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
একজন মনোবিজ্ঞানীর সাক্ষ্য তুলে ধরে প্রসিকিউশন দাবি করে, ক্ল্যান্সি আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন, তাকে ছাড়া সন্তানরা কষ্ট পাবে। এ কারণে তাদেরও হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
হত্যার কিছুক্ষণ আগে ক্ল্যান্সি তার স্বামীকে খাবার আনতে এবং ওষুধের দোকানে যেতে পাঠিয়েছিলেন। এর আগে ফোনে স্বামী কত সময়ের মধ্যে বাড়ি ফিরবেন, সেটিও হিসাব করেছিলেন বলে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
ক্ল্যান্সির সাবেক স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সিসহ পরিবারের সদস্যরা আদালতে তার মানসিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। প্যাট্রিক জানান, তৃতীয় সন্তান জন্মের পর কয়েক মাস ধরে তার স্ত্রী মানসিকভাবে ভুগছিলেন। তিনি একাধিকবার চিকিৎসকদের কাছে গিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন ধরনের ওষুধও সেবন করছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক সপ্তাহ আগে ক্ল্যান্সি একটি মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। তবে প্যাট্রিকের দাবি, হত্যার আগের দিনগুলোতে স্ত্রী নিজে বা সন্তানদের ক্ষতি করার কোনো পরিকল্পনা করছেন; এমন লক্ষণ তিনি দেখেননি।
ঘটনার দিন খাবার আনতে বের হওয়ার আগে ক্ল্যান্সির আচরণও স্বাভাবিক ছিল বলে জানান তিনি। পরে ফার্মেসি থেকে স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন। বাড়ি ফিরে প্যাট্রিক তাকে পেছনের উঠানে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পান। তার কবজি ও ঘাড়ে কাটা দাগ ছিল। ক্ল্যান্সি তাকে জানান, তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
সন্তানদের কথা জানতে চাইলে ক্ল্যান্সি তাদের বেসমেন্টে থাকার কথা বলেন। সেখানে গিয়ে প্যাট্রিক তিন সন্তানকে ব্যায়ামের ব্যান্ড গলায় বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান।
পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ক্ল্যান্সি জানান, তিনি একটি পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন। ওই কণ্ঠস্বর তাকে বলেছিল, তিনি কিছু না করলে তার সুযোগ শেষ হয়ে যাবে এমন কথাও কয়েকজন সাক্ষী আদালতে জানান।
মামলাটি পুনরায় বিচার হলে হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে ক্ল্যান্সির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। আর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে নির্দোষ ঘোষণা করা হলে তাকে মূল্যায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হবে এবং তার অবস্থার নিয়মিত পর্যালোচনা করবে আদালত।
মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও নজরে ছিল। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, তিনি মামলাটি সম্পর্কে জানেন এবং ধারণা করছেন, এর পুনর্বিচার হতে পারে।
ট্রাম্প ঘটনাটিকে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ক্ল্যান্সি ভয়াবহ কাজ করেছেন এবং এর জন্য তাকে কোনো না কোনো মূল্য দিতে হবে।
ক্ল্যান্সির পরবর্তী শুনানি আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। মামলাটির সঙ্গে ২০০১ সালে টেক্সাসের আন্দ্রেয়া ইয়েটসের পাঁচ সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনাটিরও তুলনা করা হয়েছে। ইয়েটসের প্রথম হত্যার সাজা আপিল আদালত বাতিল করার পর ২০০৬ সালে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। তার আইনজীবীরাও বলেছিলেন, তিনি গুরুতর পোস্টপার্টাম সাইকোসিসে ভুগছিলেন।
সূত্র : রয়টার্স