প্রকাশিত :  ১৮:৩১
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৫৫
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরাপত্তাহীনতার বাংলাদেশ: রাষ্ট্র কি তার নাগরিকের পাশে?

নিরাপত্তাহীনতার বাংলাদেশ: রাষ্ট্র কি তার নাগরিকের পাশে?

একজন নাগরিক সকালে ঘর থেকে বের হন। তিনি জানেন না, দিনের শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন কি না। রাস্তায় বের হলে ছিনতাইয়ের ভয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গেলে চাঁদাবাজির চাপ, কোনো বিরোধে জড়ালে হামলার আশঙ্কা, আর প্রতিবাদ করলে আরও বড় বিপদের শঙ্কা। এমন একটি বাস্তবতা যদি মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন শুধু অপরাধ নিয়ে নয়। প্রশ্ন রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও।

রাষ্ট্র কোথায়?

যে রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই রাষ্ট্র যদি নাগরিকের মনে নিরাপত্তার বদলে ভয় তৈরি করে, তাহলে সেটি নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট।

আজ বাংলাদেশের মানুষের উদ্বেগকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ, হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, দখলদারি, রাজনৈতিক সংঘাত এবং মব সহিংসতার খবর যখন একের পর এক সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক: আইন কি সবার জন্য সমান? অপরাধী কি সত্যিই অপরাধের কারণে বিচারের মুখোমুখি হয়, নাকি তার পরিচয়ও কখনো কখনো আইনের গতিপথ নির্ধারণ করে?

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মানুষ যদি একসময় এসবকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।

কারণ একটি রাষ্ট্রের পতন সব সময় বড় কোনো বিস্ফোরণ দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো তা শুরু হয় মানুষের ছোট ছোট ভয় দিয়ে: রাতে একা রাস্তায় বের হওয়ার ভয়, থানায় অভিযোগ করতে যাওয়ার ভয়, ব্যবসায় চাঁদা না দিলে কী হবে সেই ভয়, প্রভাবশালী কারও বিরোধিতা করলে কী হতে পারে সেই ভয়।

যখন নাগরিক নিরাপত্তার জন্য আইনের বদলে পরিচয়, অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত শক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ কারণেই আজ প্রশ্নটি সরাসরি করা দরকার: সরকার কি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই সংকেতগুলো দেখছে?

এই প্রশ্ন কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। এটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রশ্ন।

সরকারের প্রথম দায়িত্ব মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উন্নয়ন, অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একজন মানুষ যদি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তাহলে উন্নয়নের অনেক অর্জনই তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।

একটি হত্যাকাণ্ড একটি সংখ্যা নয়। তার পেছনে থাকে একটি পরিবার। একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু অর্থের হিসাব নয়, তার পেছনে থাকে একজন মানুষের ভয় ও অসহায়তা। একটি ছিনতাই শুধু একটি ঘটনা নয়, তার পেছনে থাকতে পারে একজন শ্রমজীবী মানুষের পুরো দিনের উপার্জন।

তাই আইনশৃঙ্খলার সংকটকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যাবে না। রাষ্ট্রকে মানুষের ভয়, ক্ষোভ ও অনাস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ নাগরিকের মনে যখন প্রশ্ন জাগে, “বিপদে পড়লে রাষ্ট্র কি আমার পাশে দাঁড়াবে?” তখন সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলিশের উপস্থিতি দিয়ে দেওয়া যায় না। উত্তর দিতে হয় কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

রাষ্ট্রের শক্তি তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন সাধারণ মানুষ জানেন, তাঁদের পেছনে আইন আছে।

আর রাষ্ট্রের দুর্বলতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন নাগরিকেরা মনে করেন, আইনের চেয়ে ক্ষমতাবান কারও পরিচয় বেশি শক্তিশালী।


Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর