প্রকাশিত : ১৬:০৯
৩১ আগষ্ট ২০২৬
১৯৯৭ সালের ৩০ আগস্ট। আলোঝলমলে এক বিকেলে ভূমধ্যসাগরে এক সপ্তাহের অবকাশ কাটিয়ে প্রাইভেট জেটে প্যারিসের লে বুর্জে বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রিন্সেস ডায়ানা ও তাঁর সঙ্গী ডডি আল ফায়েদ। উদ্দেশ্য ছিল, প্যারিসে কয়েকটি দিন কিছুটা নিরিবিলি ও একান্তে সময় কাটানো।
কিন্তু বিমানবন্দরে পা রাখার পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। তাঁদের আগমন যেন মুহূর্তেই খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে। ক্যামেরা হাতে ছুটে আসে একদল ফটোসাংবাদিক—যাদের বলা হয় ‘পাপারাজ্জি’। মোটরসাইকেলে চড়ে তাঁরা ঘিরে ফেলেন ডায়ানা ও ডডিকে। ব্যক্তিগত মুহূর্তটুকু ক্যামেরাবন্দি করতে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা।
সেদিনের সেই বিকেলে কেউই হয়তো জানতেন না, এই নিরীহ মনে হওয়া ক্যামেরার পিছু নেওয়াই কয়েক ঘণ্টা পর প্যারিসের বুকে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরি করবে।
রাত ১০:০০ — রিটজ হোটেলের সেই শান্ত মুহূর্ত
বাইরের জটলা এড়াতে ডায়ানা ও ডডি উঠেছিলেন প্যারিসের বিখ্যাত ‘রিটজ হোটেল’-এ, যার মালিক ছিলেন ডডির বাবা মোহাম্মদ আল ফায়েদ। প্রথমে তারা একটি ফরাসি রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের পরিকল্পনা করলেও ‘পাপারাজ্জি’দের হাত থেকে বাঁচতে রিটজ হোটেলের রাজকীয় ‘ইম্পেরিয়াল স্যুট’-এ খাবার আনার ব্যবস্থা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, স্যুটটির ভেতর পরিবেশ বেশ শান্ত ছিল। ডায়ানা মাশরুম ও অ্যাসপারাগাসের একটি স্টার্টার আর সামুদ্রিক মাছের অর্ডার দিয়েছিলেন। তবে বাইরে তখনো ক্যামেরা হাতে ওঁৎ পেতে বসেছিল ডজনখানেক আলোকচিত্রী।
রাত ১২:০০ — চকচকে মার্সিডিজ ও লুকোচুরি খেলা
নৈশভোজ শেষে ডডি সিদ্ধান্ত নেন, তারা রাতের মতো হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে বের না হয়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে বের হবেন এবং সোজা চলে যাবেন চ্যাম্পস-ইলাইসিতে ডডির নিজের অ্যাপার্টমেন্টে।
সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করতে হোটেলের মূল ফটক দিয়ে একটি ডামি বা ভুয়া গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। আর রাত ১২:২০ মিনিটে রিটজ হোটেলের পেছনের ‘রু ক্যাম্বন’ দরজা দিয়ে একটি কালো মার্সিডিজ-বেঞ্জ এস২৮০ গাড়িতে ওঠেন ডায়ানা ও ডডি। চালকের আসনে ছিলেন হোটেলের সিকিউরিটি ম্যানেজার অঁরি পল, আর পাশে ছিলেন দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স। পেছনের আসনে পাশাপাশি বসেন ডায়ানা ও ডডি।
রাত ১২:২৩ — পন্ট দ্য লা আলমা টানেলের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত
গাড়িটি চলতে শুরু করতেই পাপারাজ্জিরা বুঝতে পারে আসল খবর! মোটরসাইকেল ও কিছু ছোট গাড়ি নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে মার্সিডিজটির পিছু নেয় তারা। আলোঝলমলে আইফেল টাওয়ারের পাশ দিয়ে সিন নদীর তীর ধরে ছুটতে থাকে কালো মার্সিডিজটি।
ছবি তোলার চেষ্টা করা সাংবাদিকদের এড়াতে ড্রাইভার অঁরি পল দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটাতে থাকেন। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২:২৩ মিনিট। গাড়িটি ঢোকে ‘পন্ট দ্য লা আলমা’ আন্ডারপাস টানেলে। টানেলের নির্ধারিত গতিসীমা ছিল ৫০ কিলোমিটার, কিন্তু মার্সিডিজটির গতি ছিল প্রায় দ্বিগুণ—ঘণ্টায় ১০৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি।
হঠাৎ চালক অঁরি পল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। প্রথমে গাড়িটি একটি সাদা ‘ফিয়াট ইউনো’ গাড়িকে হালকা ঘষা দেয় এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে টানেলের ১৩ নম্বর কংক্রিটের পিয়ার বা স্তম্ভে! বোমার মতো বিকট শব্দে পুরো টানেল কেঁপে ওঠে।
রাত ১২:২৫ — ভাঙা কাচ আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ
দুর্ঘটনাস্থলে ধুমড়ে-মুচড়ে যায় মার্সিডিজটির সামনের অংশ। স্টিয়ারিং হুইলে চালকের নিথর দেহ আছড়ে পড়ার কারণে ক্রমাগত বাজতে থাকে গাড়ির হর্ন।
চালক অঁরি পল এবং ডডি আল ফায়েদ ঘটনাস্থলেই মারা যান। একমাত্র দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স মারাত্মক আহত অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। পেছনের আসনে গুরুতর আহত হয়ে আটকে থাকেন ডায়ানা।
স্তব্ধ সেই মুহূর্তে প্রথম যারা গাড়ির কাছে পৌঁছায়, তারা কিন্তু উদ্ধারকর্মী ছিল না—তারা ছিল সেই পাপারাজ্জি আলোকচিত্রীরা। উদ্ধার করার বদলে কিছু সাংবাদিক আহত ডায়ানার ছবি তুলতে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বালানো শুরু করে। কিছুক্ষণ পর স্থানীয় পুলিশ ও পথচারীরা এসে চিকিৎসকদের খবর দেয় এবং ছবি তুলতে বাধা দেয়।
ভোর ৪:০০ — বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়া ঘোষণা
উদ্ধারকারীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় ডায়ানাকে গাড়ি কেটে বের করেন এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। রাত ২:০৬ মিনিটে তাকে ‘পিটি-সালপেত্রিয়ার’ হাসপাতালে পৌঁছানো হয়।
ডাক্তাররা দেখতে পান, তার ভেতরে প্রচুর রক্তক্ষরণ এবং হৃদযন্ত্রে মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। সার্জন ও জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা টানা দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালান তার হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ৩১ আগস্ট রোববার ভোর ৪ টায় রাজকুমারী ডায়ানাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিভে যায় বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এক জীবন।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।