প্রকাশিত : ১৫:৫১
৩০ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। একটি কার্যকর পুঁজিবাজার শিল্প ও ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগায়, উদ্যোক্তাদের ব্যাংকনির্ভরতা কমায় এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সাম্প্রতিক চিত্র সেই প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূচকের ওঠানামা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কোনো দিন বাজার বাড়বে, কোনো দিন কমবে। কিন্তু যখন দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে থাকে, লেনদেন সংকুচিত হয় এবং বাজারে অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে যায়, তখন বিষয়টিকে শুধু ‘বাজারের স্বাভাবিক সংশোধন’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এর সঙ্গে অর্থনীতির সামগ্রিক আস্থা, সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশের প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য সাম্প্রতিক সূচকের পতন নয়। সমস্যাটি অনেক গভীরে। বছরের পর বছর ধরে বাজারে দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি, আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, কারসাজির অভিযোগ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। তাঁদের অনেকের কাছে পুঁজিবাজার এখন বিনিয়োগের নিরাপদ জায়গার চেয়ে অনিশ্চয়তার ক্ষেত্র হিসেবেই বেশি পরিচিত
এ অবস্থা কোনো দেশের জন্যই ভালো নয়।
পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ইক্যুইটি মার্কেট থাকা জরুরি। কারণ ব্যাংক মূলত আমানত সংগ্রহ করে ঋণ দেয়, আর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। বিশেষ করে বড় শিল্প, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে ইক্যুইটি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপও কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের সমস্যা এই বাস্তবতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার প্রবণতা ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এর সঙ্গে যখন দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি যুক্ত হয়, তখন পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই চাপের মধ্যে পড়ে। একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর পুঁজিবাজার এ ক্ষেত্রে বিকল্প অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে।
কিন্তু সেই বাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা না থাকলে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে কীভাবে?
এখানেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দায়িত্ব শুধু বাজারে লেনদেন সচল রাখা নয়। বাজারের স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, কোম্পানির জবাবদিহি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও তার মূল দায়িত্ব। কারসাজি বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তদন্ত শেষ করে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভালো কোম্পানিকে বাজারে আসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শুধু শাস্তি দিয়ে বাজার ভালো করা যাবে না। বাজারে ভালো কোম্পানি আনতে হবে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মান বাড়াতে হবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার নিরপেক্ষ নিরীক্ষা ও যথাযথ তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীর কাছে তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা থাকলে বাজারে গুজব ও কারসাজির সুযোগ বাড়ে।
তারল্য বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানো বা সাময়িকভাবে বাজারকে চাঙ্গা করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দায়িত্বশীলভাবে বাজারে অংশ নেন, ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবেশ পান।
সরকারি ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশকে যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে বাজারের আকার বাড়বে, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট জবাবদিহি বাড়তে পারে। তবে তালিকাভুক্তির সংখ্যা বাড়ানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুঁজিবাজারকে ‘জুয়ার আখড়া’ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা। শেয়ারবাজারে ঝুঁকি আছে, থাকবে। কিন্তু ঝুঁকি আর জুয়া এক জিনিস নয়। একটি সুশাসিত বাজারে বিনিয়োগকারী কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। আর একটি দুর্বল বাজারে গুজব, কারসাজি ও অস্বাভাবিক দামের ওঠানামা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে প্রথমটির দিকে নিতে হবে।
এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজির অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট সুশাসনের মান উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
পুঁজিবাজারের প্রতিটি পতন অর্থনীতির পতন নয়। আবার বাজারের প্রতিটি উত্থানও অর্থনীতির সুস্থতার প্রমাণ নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যদি বাজারে আস্থা, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ কমতে থাকে, সেটিকে অবশ্যই অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
কারণ পুঁজিবাজার শুধু সূচকের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উদ্যোক্তার মূলধন, বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের সম্ভাবনা।
তাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত সূচক কৃত্রিমভাবে ওপরে তোলা নয়, বরং বাজারের ভিত শক্ত করা। বিনিয়োগকারী যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমান, তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে বাজার নিজেই তার শক্তি ফিরে পাবে।
রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে হলে প্রথমে ক্ষতটি কোথায়, সেটি চিহ্নিত করতে হয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সাময়িক প্রলেপ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। এখন সেই চিকিৎসা শুরু করার সময়।