প্রকাশিত :  ১৬:২৩
২৯ আগষ্ট ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ে শরতের শুভ্র কাশফুল, মুগ্ধ পর্যটকেরা

শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ে শরতের শুভ্র কাশফুল, মুগ্ধ পর্যটকেরা

সংগ্রাম দত্ত: প্রকৃতিতে এখন শরতের রাজত্ব। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে দুলছে শুভ্র কাশফুল। শরতের এই অপরূপ রূপ-লাবণ্য চারপাশকে সাজিয়ে তুলেছে অনন্য সৌন্দর্যে। প্রকৃতির এই রূপ মনে করিয়ে দেয় কবি জীবনানন্দ দাশের অমর পঙ্‌ক্তি—‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।’

চায়ের স্বর্গরাজ্য ও পর্যটননগর হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলও এখন সেজেছে কাশফুলের শুভ্রতায়। শহরের ভানুগাছ সড়কের বেলতলী এলাকায় সবুজ চা-বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা ভুরভুরিয়া ছড়ার দুই পাড়জুড়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে বিশাল কাশবন। শহর থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সংলগ্ন ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড় ঘেঁষে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুটেছে সাদা কাশফুল। বাতাসে দুলতে থাকা এই শুভ্র কাশফুল যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ভানুগাছ সড়কের বেলতলী সংলগ্ন বিটিআরআই এলাকার বিস্তীর্ণ বালুচর ছেয়ে গেছে কাশফুলের শুভ্রতায়। বিশাল কাশবনে বাতাসে দুলছে অসংখ্য সাদা কাশফুল। নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর কাশফুলের শুভ্রতা মিলেমিশে তৈরি করেছে নয়নাভিরাম দৃশ্য। এই সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।

শরৎকালে নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনার সঙ্গে কাশফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে তৈরি করে অন্য রকম আবেদন। তাই প্রতিদিন মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে বেলতলীর কাশফুলের বালুচর। বিভিন্ন বয়সী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠছে এলাকাটি।

শুক্রবার বিকেলে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে অনেককে কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেখা যায়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও দল বেঁধে ঘুরছিলেন কাশবনে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ কাশফুলে হাত বুলিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের পাশে থামিয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতা। অনেকে মুক্ত বাতাসে পুরো বালুচর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সড়কের পাশে গাড়ি থামিয়ে কাশফুলের সঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায় অনেক পথচারীকে।

কাশবনে ঘুরতে আসা কয়েকজন পর্যটক বলেন, ‘চা-বাগানের ফাঁকে ছড়ার পাশে দিগন্তজোড়া কাশফুল যেন এক অন্যরকম সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। শুভ্র কাশফুলের দোল খাওয়ার দৃশ্য চোখ ও মন দুটোই ভরিয়ে দেয়। তা স্বচক্ষে দেখতেই এখানে আসা।’

কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে ঘুরতে আসা রনি ধর বলেন, ‘ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। এ সময় রাশি রাশি কাশফুল তার অপরূপ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। শরতের এই শুভ্র সৌন্দর্য উপভোগ করতেই এখানে আসা।’

শ্রীমঙ্গলের ইছবপুর এলাকার বাসিন্দা ও প্রধান শিক্ষক কল্যাণ দেব বলেন, ‘ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড় ঘেঁষে বিশাল এলাকাজুড়ে প্রস্ফুটিত সাদা কাশফুল হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের। শুভ্র কাশফুল যেন প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলেছে অনন্য রূপে। বাতাসে দোল খাওয়া কাশফুলের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।’

গণমাধ্যমকর্মী ও শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এএফএম আব্দুল হাই বন বলেন, ‘দিগন্তজোড়া কাশফুলের মনোরম দৃশ্য যে কাউকে আন্দোলিত করে। শরৎ ঋতুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য কাশফুল পর্যটন আকর্ষণেও বড় ভূমিকা রাখছে।’

শহরের ব্যবসায়ী প্রণব চক্রবর্তী বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের কাশবন স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও প্রতি বছর প্রায় দুই মাসের জন্য দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শরতের ঝকঝকে আকাশের নিচে হাওয়ায় দোল খায় শুভ্র কাশফুল—এ দৃশ্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন নানা বয়সী মানুষ।’

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, কাশফুল এক ধরনের বহুবর্ষজীবী ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। এটি সাধারণত প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। নদী বা ছড়ার তীরে ফুটে থাকা শ্বেতশুভ্র কাশবন দেখতে অত্যন্ত মনোরম।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বরজুড়ে কাশফুলের এই মেলা থাকে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এখানে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। শরতের এই সাময়িক সৌন্দর্য উপভোগ করতে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শ্রীমঙ্গল। চায়ের রাজ্য ও পর্যটননগর হিসেবে দেশের মানুষের কাছে এই উপজেলার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে সারা বছরই এখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। উপজেলা শহর হলেও দেশের কোনো কোনো বিভাগীয় শহরের চেয়েও শ্রীমঙ্গল গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নত জনপদ হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। শরতে সেই পর্যটন আকর্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ের এই প্রাকৃতিক কাশবন।

তবে কাশবনের সৌন্দর্য রক্ষায় দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা। তাঁদের মতে, কাশফুল না ছিঁড়ে এবং কাশবনের ক্ষতি না করে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা উচিত। পাশাপাশি বালুচর ও ছড়ার পাড়ে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার বিষয়েও দর্শনার্থীদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দর্শনার্থীদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণে শ্রীমঙ্গলের এই প্রাকৃতিক কাশবন আরও দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। শরতের শুভ্রতায় প্রতিবছরই প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের মুগ্ধ করবে ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ের এই কাশফুলের রাজ্য—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।





Leave Your Comments




সারাদেশ এর আরও খবর