প্রকাশিত : ১১:০০
২৯ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:১৪
২৯ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একই সময়ে দুটি বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে এবং চলতি বছরে প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমছে, বাড়ছে ব্যবসায়িক ব্যয় এবং পুঁজিবাজারে কমে যাচ্ছে লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই এখন দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্বস্তি এলেও বাস্তব অর্থনীতির ওপর জ্বালানি সংকটের চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রবৃদ্ধি ফিরছে, তবে ধীরে
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম দুর্বল প্রবৃদ্ধির চিত্র। তবে অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতির পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ হতে পারে।
এই পূর্বাভাস অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির এই গতি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যাকে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার বলা যায়। শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি না বাড়লে প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধারও সীমিত হয়ে থাকতে পারে।
মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি
অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে মূল্যস্ফীতিতে।
পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। জুনে তা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে আসে। জুলাইয়ে আরও কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে। গত আট মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন।
খাদ্য ও পরিবহন খাতে মূল্য বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে আসায় এই স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবা খাতে মূল্যচাপ এখনো রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। উচ্চ সুদের কারণে ঋণের খরচ বাড়ছে, যা নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
রিজার্ভে ফিরেছে স্বস্তি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চিত্রও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট নাগাদ দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মে মাসে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।
আইএমএফের BPM6 পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে।
রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। আইএমএফের কাছ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থছাড়ের অনুমোদন এবং এসঅ্যান্ডপির B+ রেটিংও বৈদেশিক খাতে কিছুটা আস্থা তৈরি করেছে।
তবে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে এই স্বস্তি আবার চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার বড় অংশই জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত।
শিল্পে গ্যাস নেই, উৎপাদন থমকে
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন শিল্প খাত।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত ও প্রকৌশল খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যাওয়ার খবর রয়েছে।
তালিকাভুক্ত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ফু-ওয়াং ফুড লিমিটেডের ছয় মাসের জন্য উৎপাদন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত শিল্প খাতের সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এখানে সমস্যা শুধু গ্যাসের ঘাটতি নয়। গ্যাস কমলে উৎপাদন কমে, উৎপাদন কমলে ইউনিটপ্রতি ব্যয় বাড়ে এবং ব্যয় বাড়লে কোম্পানির মুনাফা কমে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং পুঁজিবাজারে।
সংকটের শিকড় কোথায়
বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সম্ভাব্য ঝুঁকি এই চাপ আরও বাড়াতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর।
দশ বছরের পরিকল্পনা, সামনে দুই বছরের চাপ
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১০ বছর মেয়াদি জ্বালানি মাস্টারপ্ল্যান জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ ছাড়া দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল পেতে সময় লাগবে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
এই সময়টিই অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অবকাঠামোগত সমাধান আসার আগেই যদি শিল্পের উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি আরও কমে যায়, তাহলে পুনরুদ্ধারের পথ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পুঁজিবাজারে আস্থার সংকেত দুর্বল
অর্থনীতির এই অনিশ্চয়তার প্রতিফলন এখন পুঁজিবাজারে।
২৭ আগস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৫ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬৫৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগে কয়েক কার্যদিবসে সূচকটি প্রায় ১৪১ পয়েন্ট কমেছিল।
ফলে সর্বশেষ দিনের উত্থানকে বড় ধরনের বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। টানা দরপতনের পর এটি সাময়িক কারিগরি পুনরুদ্ধারও হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ লেনদেনে। ওই দিন ডিএসইতে মোট লেনদেন হয় প্রায় ৪৬৭ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক মাসগুলোর তুলনায় এই লেনদেন খুবই কম।
সূচক সামান্য বাড়লেও লেনদেন না বাড়া বাজারের ভেতরের দুর্বল আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায়
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ব্যাংক আমানতের সুদের হার তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় থাকা, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান শেয়ারবাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ সীমিত করছে।
জ্বালানি সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত সিরামিক, প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও টেক্সটাইল খাতে বিক্রির চাপ থাকতে পারে। বিপরীতে, ব্যাংকিং ও জীবনবিমা খাতের কিছু নির্বাচিত শেয়ারে আগ্রহ দেখা যেতে পারে।
তবে সামগ্রিক বাজারে তারল্য না বাড়লে কয়েকটি কোম্পানি বা খাতের ইতিবাচক পারফরম্যান্স দিয়ে বাজারের বড় প্রবণতা বদলানো কঠিন।
সামনে যে প্রশ্ন
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখাই প্রধান পরীক্ষা।
মূল্যস্ফীতি কমছে, রিজার্ভ বাড়ছে এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কারখানায় গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত এবং পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যাচ্ছে।
এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে শুধু নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ বা সাময়িক জ্বালানি আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট হবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা, জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে হবে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠোর নীতি এবং শিল্প ও বিনিয়োগ বাঁচাতে সরকারের সহায়তা কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির আসল শক্তি শুধু রিজার্ভের অঙ্কে কিংবা শেয়ারবাজারের সূচকে মাপা যায় না। সেই শক্তি বোঝা যায় কারখানার চাকা কতটা ঘুরছে, নতুন বিনিয়োগ কতটা আসছে এবং মানুষ কতটা কাজ পাচ্ছে তার ওপর।
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই মূল প্রশ্ন একটাই: সামষ্টিক অর্থনীতির যে স্বস্তি ফিরছে, সেটিকে কি জ্বালানি ও বিনিয়োগের সংকট পেরিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া যাবে?