প্রকাশিত : ১৩:৩৭
২২ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু সূচকে স্বস্তির খবর আছে, আবার কিছু জায়গায় উদ্বেগও কমছে না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অর্থনীতির এই মিশ্র চিত্রের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাজারেও। কখনো সূচক বাড়ছে, লেনদেন বাড়ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হচ্ছে। আবার অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই আশাবাদ মিলিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাজার কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক উত্থান-পতনের মধ্যেই আটকে আছে?
জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। গত আট মাসের মধ্যে এটি ছিল সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। নিঃসন্দেহে এটি স্বস্তির খবর। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা পড়ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমে আসা। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এক মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে দূর হওয়ার নয়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থানও আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুলাই শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ৩১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং চলতি হিসাবে উন্নতির কারণে রিজার্ভে এই স্বস্তি এসেছে।
তবে রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায় না। রপ্তানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণের ভিত শক্ত না হলে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়েও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ঝুঁকির কথা বলছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় পুঁজিবাজারের দিকে একটু গভীরভাবে তাকানো দরকার।
গত কয়েক মাসে ঢাকার শেয়ারবাজারে যে চিত্র দেখা গেছে, তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জুলাইয়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথমবার ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠেছিল। এক সপ্তাহে বাজার মূলধন বেড়েছিল প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। দৈনিক লেনদেনও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ওপরে উঠেছিল। বাজার সংস্কার এবং তারল্য বাড়ার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তখন বেশ আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু আগস্টে এসে সেই আশাবাদে ভাটা পড়ে। ২০ আগস্ট ছয় দিনের টানা পতনের পর ডিএসইএক্স কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও লেনদেন নেমে আসে ৬৭০ কোটি টাকায়, যা তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। সূচক সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা যে আগের জায়গায় ফিরে আসেনি, লেনদেনের পরিমাণই তার বড় প্রমাণ।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভাবনার।
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার কেবল সূচক বাড়ার ওপর নির্ভর করে না। সূচক বাড়লেই বাজার ভালো, এমন ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি লেনদেন বাড়লেই বাজার সুস্থ হয়ে গেছে, সেটিও বলা যায় না। বরং জানতে হবে, মানুষ কেন শেয়ার কিনছে। তারা কি ভালো কোম্পানির ব্যবসা ও ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনা করে বিনিয়োগ করছে, নাকি কয়েক দিনের মুনাফার আশায় ছুটছে? কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি কি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, নাকি গুজব ও নীতিগত ঘোষণাই বাজারকে চালিত করছে?
সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দ্বিতীয় প্রবণতাটিই বেশি চোখে পড়ছে।
মার্জিন ঋণ নীতির পরিবর্তন ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা তার একটি উদাহরণ। একটি নীতিগত খবরের প্রতিক্রিয়ায় বাজার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বড় উত্থান দেখাতে পারে। আবার একই বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেই উত্থান দ্রুতই মিলিয়ে যায়। ১৮ আগস্ট ডিএসইএক্স দিনের একপর্যায়ে ৫০ পয়েন্টের বেশি উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সূচক ৪০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৭৩ পয়েন্টে নামে। ওই দিনেই বাজার মূলধন কমে যায় প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
এটি শুধু শেয়ারবাজারের ওঠানামার বিষয় নয়। এর সঙ্গে আস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
বিনিয়োগকারীর মনে যদি এই ধারণা তৈরি হয় যে নীতিমালা আজ এক রকম, কাল অন্য রকম হতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয় না। ভালো কোম্পানি ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম যদি একইভাবে গুজবের প্রভাবে ওঠানামা করে, তাহলেও বাজারের ভিত্তি দুর্বল হয়। আর দ্রুত মুনাফার সংস্কৃতি যদি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে পুঁজিবাজার অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না।
এখানে ব্যাংক খাতের কথাও আসবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগব্যবস্থা এখনো অনেকটাই ব্যাংকনির্ভর। অথচ ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসনের দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট রয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ে শিল্প ও ব্যবসায়। ঋণের খরচ বাড়ে, নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়।
অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও সেই অর্থ যদি দক্ষ ও উৎপাদনশীল খাতে না যায়, তাহলে শুধু সুদের হার কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন।
এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতির ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে চাহিদার দুর্বলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সংকটও রয়েছে। এই বাস্তবতায় নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে টেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
তবে সুদের হার কমানো কোনো জাদুর কাঠি নয়।
একজন উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত না হন যে আগামী দিনে গ্যাসের সরবরাহ ঠিক থাকবে কি না, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, করব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল থাকবে, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া যাবে কি না, তাহলে সুদের হার কিছুটা কমলেও তিনি নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করবেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু টাকার দাম কমানো নয়। বরং ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কমানো। অর্থাৎ আস্থা ফিরিয়ে আনা।
পুঁজিবাজারের সংস্কারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার মান বাড়াতে হবে। কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও বাস্তবতা বুঝতে হবে। শেয়ারবাজার দ্রুত টাকা বানানোর জায়গা নয়। এটি ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। কোম্পানির ব্যবসা, আয়, সম্পদ, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা না বুঝে শুধু বাজারের গুঞ্জন শুনে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আজ ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৯০০, কাল ৫ হাজার ৭০০, এ নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা আতঙ্ক কোনোটিই যুক্তিযুক্ত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, আগামী পাঁচ বছরে দেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কতটা উৎপাদন বাড়াবে, কতটা মুনাফা করবে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং অর্থনীতিতে কতটা নতুন মূলধন জোগাবে।
অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত হলে পুঁজিবাজারও তার প্রতিফলন দেখাবে। কিন্তু সূচককে কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে অর্থনীতির দুর্বলতা আড়াল করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের আস্থা ফেরানো যাবে না। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে, ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।
উদ্যোক্তা যেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারী যেন কোম্পানির আয় ও ব্যবসা দেখে শেয়ার কেনেন। সাধারণ মানুষ যেন অর্থনীতির দিকে তাকিয়ে মনে করেন, আগামী দিনটি আজকের চেয়ে একটু ভালো হবে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সূচক ডিএসইএক্স নয়। সবচেয়ে বড় সূচক হলো মানুষের আস্থা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।