প্রকাশিত :  ১৫:৪০
২১ আগষ্ট ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে বৈদ্যুতিক শকে আহত উল্টোলেজি বানর উদ্ধার

শ্রীমঙ্গলে বৈদ্যুতিক শকে আহত উল্টোলেজি বানর উদ্ধার

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের শ্যামলী আবাসিক এলাকায় বৈদ্যুতিক শকে আহত একটি উল্টোলেজি বানর (সিংহ বানর) উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বানরটি বৈদ্যুতিক তারে শক খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

স্থানীয় লোকজন বিষয়টি দেখতে পেয়ে দ্রুত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দেন। খবর পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক স্বপন দেব সজল, সঞ্জিত দেব এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে বানরটিকে উদ্ধার করেন। পরে আহত বানরটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, বৈদ্যুতিক শকে আহত হওয়ার পর বানরটি মাটিতে পড়ে ছিল। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটিকে উদ্ধার করা হয়। পরে বন বিভাগের কাছে বানরটি হস্তান্তর করা হয়েছে।

বন সংকুচিত, খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে বন্যপ্রাণী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা চারদিকে পাহাড়, টিলা, বনাঞ্চল ও চা-বাগানে ঘেরা। কাছেই রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এসব বনাঞ্চল ও চা-বাগান ঘিরে এলাকায় নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর বিচরণ রয়েছে।

তবে বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের ওপর চাপ বাড়ছে বলে পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন। তাঁদের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে কোথাও জনবসতি, কোথাও রিসোর্ট, চা-বাগান ও বিভিন্ন ধরনের বাগান গড়ে ওঠায় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র কমে যাচ্ছে।

এর ফলে খাবারের সন্ধানে বন্যপ্রাণী বন থেকে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। আর লোকালয়ে আসার পথে তাদের নানা ধরনের বিপদের মুখে পড়তে হচ্ছে। সড়ক পার হতে গিয়ে যানবাহনের চাপায় প্রাণ হারাচ্ছে কোনো কোনো প্রাণী। রেলপথ পার হতে গিয়ে ট্রেনের নিচে কাটা পড়েও বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। আবার মানুষের হাতে ধরা পড়ে বা আঘাত পেয়েও কোনো কোনো প্রাণী মারা যাচ্ছে।

এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বৈদ্যুতিক শকে আহত উল্টোলেজি বানর।

দুই দশকে দুই হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দারা বন্যপ্রাণী লোকালয়ে দেখতে পেলে প্রতিষ্ঠানটিকে খবর দেন। পরে ফাউন্ডেশনের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীটি উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর বন বিভাগ উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রাণীটিকে পুনরায় বনে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গত প্রায় দুই দশকে তারা দুই হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে।

উদ্ধার করা প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির সাপও রয়েছে। বিশেষ করে বড় আকৃতির অজগর ও বিভিন্ন বিষধর সাপ লোকালয়ে চলে আসায় অনেক সময় স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে এসব প্রাণীকে না মেরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা।

পরিবেশকর্মীদের মতে, শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করা না গেলে লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর বিচরণ আরও বাড়তে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রাণীগুলো মানুষের বসতিতে এসে ঝুঁকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে মানুষও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের শিকার হতে পারেন।

শুক্রবারের ঘটনাটি তাই শুধু একটি বানর উদ্ধারের ঘটনা নয়; শ্রীমঙ্গলের বন, বন্যপ্রাণী ও মানুষের ক্রমবর্ধমান সহাবস্থানের জটিল বাস্তবতারও একটি প্রতিচ্ছবি। বন কমলে বন্যপ্রাণী খাবার ও আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে আসবেই। তখন বৈদ্যুতিক তার, সড়ক, রেললাইন কিংবা মানুষের হাত—যেকোনোটিই হয়ে উঠতে পারে তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ।


Leave Your Comments




সারাদেশ এর আরও খবর