প্রকাশিত :  ১৪:০২
১৮ আগষ্ট ২০২৬

বিএসইসির নীতি বনাম পুঁজিবাজারের গতি

বিএসইসির নীতি বনাম পুঁজিবাজারের গতি

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর সূচক কত উঠল বা কত নামল, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই বাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা কীভাবে ফিরবে? একটি বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে, সূচকও বাড়তে পারে। কিন্তু যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, এখানে তথ্যের চেয়ে গুজবের দাম বেশি, কোম্পানির মৌলভিত্তির চেয়ে কারসাজির প্রভাব বেশি এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না, তাহলে সেই বাজারকে সুস্থ বলা কঠিন।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরে এই আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১০ সালের ধসের স্মৃতি এখনো বিনিয়োগকারীদের মনে তাজা। এরপর বিভিন্ন সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব বদলেছে, নানা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, নতুন আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের অনিয়ম, দুর্বল কোম্পানির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি, গুজবনির্ভর লেনদেন এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানের নিয়োগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে তাঁকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘ করপোরেট জীবনে তিনি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ ও ক্রাউন সিমেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অর্থাৎ, নতুন চেয়ারম্যান এমন একটি পরিবেশ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এসেছেন, যেখানে আর্থিক শৃঙ্খলা, করপোরেট জবাবদিহি, হিসাব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন দক্ষতা প্রতিদিনের কাজের অংশ। এই অভিজ্ঞতা পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে। একটি বড় করপোরেশন পরিচালনা করা এবং একটি জাতীয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়।

পুঁজিবাজার শুধু ব্যালান্স শিটের হিসাব দিয়ে চলে না। এখানে মানুষের প্রত্যাশা আছে, ভয় আছে, লোভ আছে, গুজব আছে এবং তথ্যের অসমতা আছে। আছে তারল্য, মূল্য আবিষ্কার এবং বিনিয়োগকারীর মনস্তত্ত্ব। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা ধরে রাখাও নতুন কমিশনের বড় পরীক্ষা।

জরিমানা নয়, এবার জবাবদিহি

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইতিহাস খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বহু ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সেই জরিমানা কি অপরাধের তুলনায় যথেষ্ট ছিল? অবৈধভাবে যদি কেউ বিপুল অর্থ আয় করেন এবং পরে তার তুলনায় সামান্য অর্থ জরিমানা দেন, তাহলে সেই জরিমানা কি সত্যিই প্রতিরোধমূলক শাস্তি হিসেবে কাজ করে?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। শাস্তির প্রত্যাশিত ব্যয় যদি অপরাধের সম্ভাব্য লাভের তুলনায় কম হয়, তাহলে আইন অপরাধীকে যথেষ্ট নিরুৎসাহিত করতে পারে না।

মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বলেছেন। এমনকি গুরুতর ঘটনায় শুধু প্রশাসনিক জরিমানার পরিবর্তে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তিনি বলেছেন, অতীতে বিএসইসি বিপুল পরিমাণ জরিমানা করলেও আইনি জটিলতার কারণে আদায় হয়েছে অতি সামান্য অর্থ।

এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে শুধু নতুন বিধিমালা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের দেখতে হবে, আইন বাস্তবেও কার্যকর হচ্ছে।

তবে এখানে সতর্কতারও প্রয়োজন আছে। ‘কঠোর ব্যবস্থা’ শব্দটি যতটা আকর্ষণীয়, এর প্রয়োগ ততটাই সংবেদনশীল। কোনটি অপরাধ, কোনটি সাধারণ বিধিভঙ্গ, কোনটি বৈধ ট্রেডিং এবং কোনটি কারসাজি, এসবের সীমারেখা স্পষ্ট না হলে কঠোরতা উল্টো বাজারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একজন বিনিয়োগকারী শেয়ারের দাম বাড়বে মনে করে কিনলেন। অন্যজন বিক্রি করলেন। তৃতীয়জন একই শেয়ারে বড় অর্ডার দিলেন। এসব লেনদেন নিজে থেকেই কারসাজি নয়। কিন্তু যদি কয়েকজন ব্যক্তি আগে থেকে যোগসাজশ করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেন, ভুয়া তথ্য ছড়ান এবং পরে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান, সেটি ভিন্ন বিষয়।

এই পার্থক্যটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্পষ্ট করতে হবে।

বাজারে ভয় নয়, আস্থা দরকার

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আস্থা। আবার সবচেয়ে দ্রুত নষ্ট হওয়া সম্পদও আস্থা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সৎ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে যেকোনো স্বাভাবিক লেনদেনও ভবিষ্যতে সন্দেহের কারণ হতে পারে, তাহলে বাজারে অংশগ্রহণ কমতে পারে। অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক যদি অতিরিক্ত নমনীয় হয়, তাহলে কারসাজিকারীরা সুযোগ নেবে।

এই দুইয়ের মাঝখানেই নিয়ন্ত্রকের প্রকৃত দক্ষতার পরীক্ষা।

বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারে মার্কেট মেকার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ব্রোকার, সম্পদ ব্যবস্থাপক ও সক্রিয় ট্রেডাররা বাজারে তারল্য তৈরি করেন। তাঁরা না থাকলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে লেনদেনের সুযোগ কমে যায়, বাজারের গভীরতা হ্রাস পায় এবং মূল্য আবিষ্কার বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের একটি সমস্যা হলো, এখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর তুলনায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে গুজব বা স্বল্পমেয়াদি প্রত্যাশা অনেক সময় দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

মাসুদ খান নিজেও বাজারের বর্তমান অবস্থায় দুর্বল ও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এখানে প্রশ্নটি তাই শুধু কত লেনদেন হচ্ছে, তা নয়। বরং কী ধরনের লেনদেন হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে কীভাবে?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে চায় না। আর যারা আসে, তাদের অনেকের আকার ও মান বাজারকে কাঙ্ক্ষিত গভীরতা দিতে পারে না।

এই পরিস্থিতি বদলাতে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কমিশন বড় ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিকে আইপিওর প্রচলিত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বাইরে অপেক্ষাকৃত সহজ পথে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আলোচনায় এসেছে, যোগ্য কোম্পানি মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড করেও সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

নীতিগতভাবে এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।

কারণ পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে শুধু নতুন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। দরকার ভালো কোম্পানি। এমন কোম্পানি, যাদের ব্যবসা আছে, আয় আছে, সুশাসন আছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মূল্য তৈরি করার সক্ষমতা আছে।

তবে ডাইরেক্ট লিস্টিং যেন ভালো কোম্পানিকে দ্রুত বাজারে আনার পথ হয়, কোনোভাবেই দুর্বল কোম্পানিকে নিয়ম এড়িয়ে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পথ না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে ‘যোগ্য কোম্পানি’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তার মাপকাঠি স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। আয়, সম্পদ, করপোরেট গভর্ন্যান্স, নিরীক্ষা, ঋণ, মালিকানা কাঠামো ও তথ্যের স্বচ্ছতা, সবকিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

বন্ড বাজারের দিকে নজর দেওয়া জরুরি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংক ব্যবস্থা। বড় ব্যবসা করতে গেলে ব্যাংকঋণ নিতে হয়। এতে ব্যাংকের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ বাড়ে এবং অর্থনীতির আর্থিক ঝুঁকিও একটি নির্দিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

এখানে পুঁজিবাজারের বন্ড অংশ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

নতুন কমিশন বন্ডকে আরও কার্যকরভাবে বাজারে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। মূল বোর্ডে বন্ড তালিকাভুক্তির সুযোগ, তালিকাভুক্তির খরচ কমানো এবং বন্ড বাজারকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টি+২ থেকে টি+১ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় যাওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে।

এগুলো কেবল পুঁজিবাজারের সংস্কার নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কারের অংশ।

একটি পরিণত অর্থনীতিতে ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও বন্ড বাজার, তিনটিই দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অংশীদার। বাংলাদেশে এই ভারসাম্য এখনো তৈরি হয়নি।

এআই দিয়ে নজরদারি: সময়ের দাবি

পুঁজিবাজারের কারসাজি এখন আগের মতো শুধু মানুষের চোখে দেখে শনাক্ত করার বিষয় নয়। হাজার হাজার বিনিয়োগকারী, লাখ লাখ লেনদেন এবং অসংখ্য অ্যাকাউন্টের তথ্য বিশ্লেষণ করতে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।

এই জায়গায় এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখতে হয়। ডিএসইর সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা আরও আধুনিক করার পাশাপাশি আগামী এক বছরের মধ্যে এআইভিত্তিক নজরদারির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি বা লেনদেন শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ধারণাও সামনে এসেছে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুর কাঠি নয়।

এআই একটি অস্বাভাবিক প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু সেটি কেন ঘটেছে, তা নির্ধারণের জন্য মানুষের বিচারবোধ দরকার। একটি শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তেই পারে কোনো বাস্তব ব্যবসায়িক খবরের কারণে। আবার একই ধরনের দরবৃদ্ধি কারসাজির ফলও হতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয় জরুরি।

‘মার্কেট প্লেয়ার’ কি শত্রু?

নিয়ন্ত্রক কঠোর হলে বাজারের কিছু অংশ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, বাজারের সক্রিয় ট্রেডাররা কি তাহলে সন্দেহের চোখে দেখা হবে?

এখানে উত্তরটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। ট্রেডার বা মার্কেট প্লেয়ার হওয়া অপরাধ নয়। বরং সক্রিয় ট্রেডার বাজারের তারল্যের জন্য প্রয়োজনীয়।

সমস্যা হলো, বৈধ ট্রেডিং ও কারসাজির মধ্যে সীমারেখা কোথায়।

একজন মার্কেট প্লেয়ার ঝুঁকি নেবেন, দাম কম মনে হলে কিনবেন এবং বেশি মনে হলে বিক্রি করবেন। এটাই বাজারের স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু যদি তিনি কয়েকজনের সঙ্গে যোগসাজশ করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ান, ভুয়া তথ্য ছড়ান, নিজেদের মধ্যে শেয়ার হাতবদল করে লেনদেনের মিথ্যা চিত্র তৈরি করেন এবং পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে দেন, সেটি আর বৈধ বাজার কর্মকাণ্ড নয়।

নিয়ন্ত্রকের কাজ তাই ট্রেডারবিরোধী হওয়া নয়, বরং কারসাজিবিরোধী হওয়া।

এই পার্থক্যটি যত স্পষ্ট হবে, বাজার তত বেশি স্বাভাবিক থাকবে।

করপোরেট অভিজ্ঞতা বনাম বাজারের মনস্তত্ত্ব

মাসুদ খানের দীর্ঘ করপোরেট অভিজ্ঞতা তাঁর বড় শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তাঁর জন্য একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জও।

কারণ করপোরেট ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্দিষ্ট তথ্য, বাজেট, আর্থিক ফলাফল ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। পুঁজিবাজারে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা।

আজ একটি কোম্পানির আয় কম হতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন আগামী দুই বছরে আয় বাড়বে, তাহলে শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। আবার একটি কোম্পানি লাভ করলেও বাজার যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়, শেয়ারের দাম কমতে পারে।

অর্থাৎ, শেয়ারবাজার ভবিষ্যৎকে বর্তমান দামে মূল্যায়ন করে।

এখানে আচরণগত অর্থনীতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সব সময় যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেয় না। ভয় ও লোভ দুটিই বাজারকে প্রভাবিত করে। তাই নিয়ন্ত্রকের কাজ শুধু কোম্পানির হিসাব দেখা নয়, বাজারের আচরণও বুঝতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে একটি বড় সমস্যা হলো নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। এক কমিশন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পরের কমিশন সেটি বদলে দিয়েছে। কখনো ফ্লোর প্রাইস, কখনো নতুন মার্জিন নিয়ম, কখনো তালিকাভুক্তির নিয়ম, এভাবে বারবার পরিবর্তনের ফলে বাজারের অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কঠিন হয়েছে।

নতুন কমিশনের সামনে তাই সবচেয়ে বড় কাজ শুধু নতুন নিয়ম তৈরি করা নয়, বরং একটি পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবেশ তৈরি করা।

বিনিয়োগকারীরা যেন জানেন, আগামীকাল নিয়ম কী হবে। কোম্পানি যেন জানে, তালিকাভুক্ত হতে কী শর্ত পূরণ করতে হবে। ব্রোকাররা যেন জানেন, কোন আচরণে শাস্তি হবে। আর কারসাজিকারীরা যেন জানেন, অপরাধ করলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

এই পূর্বানুমানযোগ্যতাই সুশাসনের ভিত্তি।

ডিএসই ও বিএসইসির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ

বাজার তদারকিতে বিএসইসি সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও প্রতিদিনের লেনদেন সবচেয়ে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে স্টক এক্সচেঞ্জ।

তাই ডিএসই ও সিএসইকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কার্যকর ফ্রন্টলাইন রেগুলেটর হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

বিএসইসি যদি প্রতিটি ছোটখাটো লেনদেনে সরাসরি জড়িত হওয়ার পরিবর্তে নীতিনির্ধারণ, তদারকি, তদন্তের মান নিয়ন্ত্রণ ও আপিল কাঠামোয় বেশি মনোযোগ দেয় এবং এক্সচেঞ্জগুলোকে দৈনন্দিন নজরদারিতে শক্তিশালী করে, তাহলে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়তে পারে।

তবে এর জন্য এক্সচেঞ্জগুলোর নিজস্ব জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতা হস্তান্তর মানে দায়মুক্তি নয়।

বিনিয়োগকারী শিক্ষাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

শুধু বিএসইসি, ডিএসই বা ব্রোকারকে দায়ী করে পুঁজিবাজারের সব সমস্যা সমাধান করা যাবে না।

একজন বিনিয়োগকারী যদি কোনো কোম্পানির ব্যবসা, আয়, ঋণ, নগদ প্রবাহ বা পরিচালনা পর্ষদ সম্পর্কে না জেনে শুধু ফেসবুকের পোস্ট বা কারও পরামর্শে শেয়ার কেনেন, তাহলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এ কারণে আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি।

বিনিয়োগকারীদের শেখাতে হবে, শেয়ার কেনা মানে কেবল দাম বাড়ার ওপর বাজি ধরা নয়, বরং একটি ব্যবসার অংশীদার হওয়া। কোম্পানির মৌলভিত্তি, আয়, ঋণ, ব্যবস্থাপনা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং মূল্যায়ন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

এই জায়গায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব পক্ষের ভূমিকা রয়েছে।

কঠোরতা ও গতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য

মাসুদ খানের নীতিগত অবস্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি আস্থা পুনর্গঠনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি, বন্ড বাজারের উন্নয়ন এবং দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, সবই বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর দিকে যায়।

কিন্তু এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরনটির ওপর।

বাজারে শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে যদি বৈধ ট্রেডিংও নিরুৎসাহিত হয়, তাহলে তারল্য কমবে। আবার বাজারের গতিশীলতার কথা বলে যদি কারসাজিকে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে আস্থা ফিরবে না।

তাই পথটি হতে হবে মাঝামাঝি নয়, বরং সুনির্দিষ্ট।

কারসাজির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা থাকবে। কিন্তু বৈধ ঝুঁকি নেওয়া, ট্রেডিং ও মার্কেট মেকিংয়ের সুযোগ থাকবে। অপরাধের জন্য শাস্তি হবে কঠোর, কিন্তু নিয়মভঙ্গের সংজ্ঞা হবে পরিষ্কার। প্রযুক্তি দিয়ে নজরদারি হবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।

এখন দরকার ফলাফল

নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজার বক্তৃতায় বদলায় না। বদলায় কার্যকর নীতি, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক প্রয়োগের মাধ্যমে।

বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান, কারসাজির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না। দেখতে চান, দুর্বল কোম্পানির অস্বাভাবিক লেনদেন বন্ধ হয়েছে কি না। দেখতে চান, ভালো কোম্পানি বাজারে এসেছে কি না। দেখতে চান, বন্ড বাজার বড় হচ্ছে কি না। দেখতে চান, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে কোনো পক্ষপাত আছে কি না।

সবচেয়ে বড় কথা, তাঁরা দেখতে চান, তাঁদের অর্থের প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়বদ্ধতা আছে কি না।

একটি পুঁজিবাজারকে শুধু সূচক দিয়ে বিচার করা ভুল। বাজারের স্বাস্থ্য বোঝার জন্য দেখতে হবে তার গভীরতা, তারল্য, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মান, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, করপোরেট সুশাসন, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা।

মাসুদ খানের সামনে তাই কাজটি সহজ নয়। তাঁকে একই সঙ্গে কঠোর নিয়ন্ত্রক এবং বাজারবান্ধব নীতিনির্ধারক হতে হবে। তাঁকে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে অপরাধী ভয় পাবে, কিন্তু বৈধ বিনিয়োগকারী ভয় পাবেন না।

এটাই মূল ভারসাম্য।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের এখন আর কৃত্রিমভাবে সূচক ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। দরকার এমন একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ করবে, বিনিয়োগকারীরা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে এবং কারসাজি করে রাতারাতি সম্পদ তৈরির সুযোগ কমে আসবে।

সেই বাজার তৈরি করতে হলে কঠোর আইন দরকার, কিন্তু শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট নয়। দরকার দক্ষ প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা।

মাসুদ খানের করপোরেট অভিজ্ঞতা এই সংস্কারের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি দিতে পারে। কিন্তু তাঁর সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হবে তিনি কত কঠোর ছিলেন, তা নয়। বরং তাঁর মেয়াদ শেষে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কতটা বিশ্বাসযোগ্য, গভীর, স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়েছে, সেটিই হবে আসল প্রশ্ন।

পুঁজিবাজারে আস্থা এক দিনে তৈরি হয় না। আবার একদিনেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকতে হবে, কিন্তু বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতার পথও বন্ধ করা যাবে না।

শেষ পর্যন্ত একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের মূলমন্ত্র খুব জটিল নয়: অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা, বৈধ লেনদেনে স্বাধীনতা এবং সবার জন্য একই নিয়ম।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন কমিশনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, এই তিনটি বিষয়কে একই সঙ্গে বাস্তব করে তোলা।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর