প্রকাশিত :  ১৮:২৫
১৭ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৮
১৭ আগষ্ট ২০২৬

পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণের নতুন বিধিমালা: শৃঙ্খলা ও আস্থার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি

সম্পাদকীয় কলাম

পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণের নতুন বিধিমালা: শৃঙ্খলা ও আস্থার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি

✍️ রেজুয়ান আহমেদের 

দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোর প্রশ্নটি এখন শুধু শেয়ারের দাম বাড়ানো বা সূচককে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাজার কতটা স্বচ্ছ, বিনিয়োগকারীর অর্থ কতটা নিরাপদ, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দায়িত্বশীল এবং ঝুঁকি তৈরি হলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন মার্জিন বিধিমালা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

১৩ আগস্ট অনুমোদনের পর ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণের ব্যবহারকে আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। একদিকে বাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঋণ, কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি, স্বার্থের সংঘাত এবং দুর্বল তদারকির সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর জন্য একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং সঠিক ব্যবস্থাপনার অধীনে এটি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, বাজারে লেনদেনের গভীরতা তৈরি করতে পারে এবং ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে তারল্য বাড়াতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা এবং ঝুঁকি বহনের সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়। নতুন বিধিমালার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

সংশোধিত বিধিমালায় ‘systematic risk’-এর পরিবর্তে ‘systemic risk’ শব্দের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিষয়টি শুধু একটি পরিভাষার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে বাজারের ঝুঁকিকে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে না দেখে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বা মার্চেন্ট ব্যাংক অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে সমস্যায় পড়লে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আস্থার সংকট তৈরি হলে তা অন্য প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং তা আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

এই কারণে প্রতিটি মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানে অন্তত দুই সদস্যের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। বছরে অন্তত চারবার কমিটির সভা আয়োজন এবং পরিচালনা পর্ষদের কাছে সভার কার্যবিবরণী উপস্থাপনের নিয়ম থাকায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ কমবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা প্রতি তিন মাসে পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা। বাজার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। সুদের হার, শেয়ারের মূল্য, তারল্য, বিনিয়োগকারীর আচরণ এবং অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে ঝুঁকির ধরনও বদলায়। তাই বছরে একবার নীতিমালা পর্যালোচনা যথেষ্ট নয়। তিন মাস অন্তর পর্যালোচনার বিধান বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করবে।

পৃথক ব্যাংক হিসাব: স্বচ্ছতার বড় পদক্ষেপ

মার্জিন অর্থায়নের জন্য আলাদা ব্যাংক হিসাব পরিচালনার বিধানও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীর অর্থ ও মার্জিন ঋণের অর্থের ব্যবস্থাপনা যত পরিষ্কার হবে, তহবিল ব্যবহারের স্বচ্ছতাও তত বাড়বে।

বিশেষ করে শাখা ও ডিজিটাল বুথের নামে পৃথক মার্জিন ব্যাংক হিসাব না রাখার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। ইতোমধ্যে থাকা এসব হিসাব ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর কমিশনের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা যাবে না। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটের একটি বড় কারণ হলো তথ্যের ঘাটতি এবং জবাবদিহির দুর্বলতা। একটি প্রতিষ্ঠানের কোন অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কী পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে এবং ঝুঁকির মাত্রা কতটা, এসব বিষয়ে পরিষ্কার হিসাব থাকা প্রয়োজন। পৃথক ব্যাংক হিসাবের বিধান সেই স্বচ্ছতার ভিত্তি আরও শক্ত করতে পারে।

বিনিয়োগকারীর জন্য সুযোগও বাড়ছে

নতুন বিধিমালাকে শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যাবে। এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু সুযোগও বাড়ানো হয়েছে।

মার্জিন ঋণের জন্য তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে ন্যূনতম বিনিয়োগের সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে তুলনামূলক কম মূলধনের বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মার্জিন সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন। বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে।

তবে ঋণের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। বিনিয়োগকারীর নিজের অর্থের সঙ্গে ঋণের অর্থ যুক্ত হলে সম্ভাব্য লাভ যেমন বাড়তে পারে, তেমনি লোকসানের চাপও বাড়তে পারে। তাই এই সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। শুধু ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেই ঋণ কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে বাজারে আর্থিক শিক্ষাও বাড়াতে হবে।

ঋণের সীমা নির্ধারণে ভারসাম্য

গ্রাহকের নিজস্ব ইক্যুইটির সমপরিমাণের বেশি মার্জিন ঋণ না দেওয়ার ১:১ অনুপাত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চার গুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।

এই সীমা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা যদি তার মূলধনের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে বাজার ভালো থাকার সময় সেটি বড় সমস্যা মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে সেই অতিরিক্ত ঋণই প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একটি নির্দিষ্ট শেয়ারে মোট মার্জিন ঋণের ২০ শতাংশের বেশি না দেওয়ার বিধানও একইভাবে ঝুঁকি ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। কোনো একটি কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হলে ওই শেয়ারের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে বহু বিনিয়োগকারী এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে চাপে পড়তে পারে। নতুন সীমা সেই সম্ভাবনা কমাতে পারে।

ভালো শেয়ারে অর্থায়নের সুযোগ

মার্জিনযোগ্য শেয়ার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিমালায় একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা রয়েছে। প্রধান বোর্ডে তালিকাভুক্ত সাধারণ শেয়ারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘G’, ‘N’ ও ‘Z’ ক্যাটাগরির শেয়ার এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মের সিকিউরিটিজকে মার্জিন অর্থায়নের বাইরে রাখা হয়েছে।

এর ফলে মার্জিন ঋণের অর্থ তুলনামূলকভাবে বেশি স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা বাজারে ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়বে। বিশেষ করে দুর্বল তারল্য বা অতিরিক্ত জল্পনাকেন্দ্রিক শেয়ারে ঋণনির্ভর লেনদেন সীমিত হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও কমতে পারে।

পি/ই অনুপাত সর্বোচ্চ ৪০ রাখার সিদ্ধান্তও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ভালো মৌলভিত্তির অনেক কোম্পানির শেয়ার মার্জিন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ঋণাত্মক ইপিএস থাকা কোম্পানিকে বাদ দেওয়ার বিধান বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে নিয়মিত পি/ই ও পি/বি অনুপাত প্রকাশ করতে হবে। তথ্য প্রকাশের এই বাধ্যবাধকতা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। বাজারে যত বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে পাওয়া যাবে, গুজব ও অনুমাননির্ভর বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা তত কমবে।

মার্জিন কল ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীর জন্য সময়

নতুন বিধিমালার আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো মার্জিন কল ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় দেওয়ার বিধান। গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন ঋণের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে, ই-মেইল, মোবাইল বার্তা বা ফোনের মাধ্যমে সতর্ক করতে হবে। এরপর তিন ট্রেডিং দিবস সময় দেওয়া হবে।

এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শেয়ারের দাম প্রতিদিন একই রকম থাকে না। বাজারে সাময়িক দরপতন হতে পারে। কোনো কোম্পানির মৌলভিত্তি অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে শেয়ারের দাম কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীকে কিছুটা সময় দিলে তিনি অতিরিক্ত অর্থ জমা দিয়ে হিসাব সমন্বয় করতে পারেন।

এতে হঠাৎ করে শেয়ার বিক্রির চাপও কমতে পারে। ফলে একদিকে বিনিয়োগকারীকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকেও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ভারসাম্য বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয়।

বাধ্যতামূলক বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর সুরক্ষা

ইক্যুইটি মার্জিন ঋণের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে। বিষয়টি কঠোর মনে হলেও এর পেছনে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের যুক্তি রয়েছে। ঋণের বিপরীতে জামানতের মূল্য যদি খুব দ্রুত কমে যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে এই ক্ষমতার ব্যবহার অবশ্যই নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ হতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে, কী পরিমাণ শেয়ার বিক্রি হয়েছে এবং কীভাবে হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে, তার যথাযথ রেকর্ড রাখতে হবে। বিনিয়োগকারীর অধিকার ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি, দুই দিকই সমান গুরুত্ব পেলে বিধানটি কার্যকর হবে।

গবেষণার স্বাধীনতা বাড়ানোর সুযোগ

পুঁজিবাজারের মান উন্নয়নে শুধু ঋণের নিয়ম পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। গবেষণা ও বিশ্লেষণের মানও উন্নত করতে হবে। নতুন বিধিমালায় গবেষণা দলের বেতন-ভাতা বা সুবিধা সরাসরি ট্রেডিং কমিশন আয়ের সঙ্গে যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত তাই বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।

গবেষণা বিভাগের কাজ হওয়া উচিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগকারীর সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। গবেষক যদি কোনো নির্দিষ্ট শেয়ার কেনাবেচা বাড়লে সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হন, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। নতুন বিধান সেই সম্ভাবনা কমাতে পারে।

একইভাবে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়নের জন্য পৃথক শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের বিধান বিশেষায়িত আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।

এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের দক্ষতা

নতুন বিধিমালার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন বাস্তবায়ন। ভালো নিয়ম প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা।

বিএসইসিকে নিশ্চিত করতে হবে, মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সীমা মেনে চলছে কি না। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকেও পি/ই, পি/বি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো হালনাগাদ করতে হবে। শাখা ও ডিজিটাল বুথের হিসাব বন্ধের বিষয়টিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ভাষায় বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো প্রকাশ করা প্রয়োজন। একজন বিনিয়োগকারী কখন মার্জিন কল পাবেন, কত সময় পাবেন, কখন শেয়ার বিক্রি হতে পারে এবং ঋণের ঝুঁকি কী, এসব তথ্য স্পষ্টভাবে জানা তার অধিকার।

পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ কখনোই শুধু সূচক বাড়ানোর পথ নয়। একটি সুস্থ বাজারে বিনিয়োগকারী জানবেন, নিয়ম সবার জন্য সমান। মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান জানবে, অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ সীমিত। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানবে, নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নতুন মার্জিন বিধিমালা সেই কাঠামো তৈরির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে বাজারে তারল্য বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, আবার অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ঠেকাতে সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রবেশের বাধা কিছুটা কমানো হয়েছে, পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সিকিউরিটিজে অর্থায়নের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। গবেষণার স্বাধীনতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি, পৃথক ব্যাংক হিসাব এবং একক শেয়ারে ঋণের সীমা প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ভিত্তি আরও শক্ত করতে পারে।

এখন দায়িত্ব বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং বিনিয়োগকারী সবার। নিয়মের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা থাকলে এই সংস্কার শুধু মার্জিন ঋণের ব্যবস্থাপনাই বদলাবে না, পুঁজিবাজারের সামগ্রিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

দেশের পুঁজিবাজারের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। সেই আস্থা এক দিনে তৈরি হয় না। স্বচ্ছ নিয়ম, নির্ভরযোগ্য তথ্য, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে ধীরে ধীরে তা গড়ে ওঠে। নতুন মার্জিন বিধিমালা সেই দীর্ঘ যাত্রায় একটি আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা। তা হলে ঋণনির্ভর লেনদেন ঝুঁকির উৎস না হয়ে পুঁজিবাজারের সুস্থ প্রবৃদ্ধির একটি কার্যকর উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর