প্রকাশিত : ১৫:৪৯
১৬ আগষ্ট ২০২৬
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে হাজারো কুর্দি যোদ্ধাকে প্রবেশ করিয়ে দেশটির ইসলামি সরকার পতনের পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের তীব্র আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত ওই গোপন অভিযান বাতিল করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধাকে ইরানের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করানো এবং মার্কিন বিমান সহায়তায় তাদের মাধ্যমে দেশটির ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া।
বৈঠকে উপস্থিত ইসরায়েলি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে ইরানের জনগণের সামনে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।
পরিকল্পনাটি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তৈরি করেছিল এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরিকল্পনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। ইরান ও তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সশস্ত্র কুর্দি বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন আঙ্কারা। ফলে কুর্দিদের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দিয়ে ইরানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেন এরদোয়ান।
ইসরায়েলি ও উপসাগরীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এরদোয়ান ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও কুর্দিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ তুরস্ক মেনে নেবে না।
কুর্দিদের নিয়ে তুরস্কের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি পিকেকের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত তুরস্ক। এ সংঘাতে কয়েক দশকে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠী কুর্দিরা মূলত তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ায় বসবাস করে। ইরানের কুর্দিরাও দেশটির রাজতন্ত্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র উভয় আমলেই বৈষম্য ও দমনপীড়নের অভিযোগ করে আসছে।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের কুর্দিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইরানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ব্যবহার করে দেশটির অভ্যন্তরে চাপ তৈরির সম্ভাবনাকেও ইসরায়েল গুরুত্ব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানি কুর্দিদের ৬টি সংগঠনের যোদ্ধাদের নিয়ে একটি জোট গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তাদের ইরানে প্রবেশের সম্ভাব্য তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ মার্চ। তবে অভিযানের জন্য শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর পরিকল্পনাটি আরও বাস্তব রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। পশ্চিম ইরানে দেশটির সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, পুলিশ স্টেশন, বাসিজ বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অবস্থানেও হামলা চালানো হয়। এর ফলে কুর্দিদের সম্ভাব্য অগ্রযাত্রার জন্য ইসরায়েল পথ তৈরি করছে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল।
তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে খোদ কুর্দিদের মধ্যেও সংশয় দেখা দেয়। তারা শুধু সামরিক সহায়তা নয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও দাবি করতে শুরু করেন।
এরই মধ্যে তুরস্কের পক্ষ থেকে পরিকল্পনাটি বাতিলের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও সতর্ক করে দেয়, ইরানের ভেতরে জাতিগত বিভাজন উসকে দিলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর শাসন পরিবর্তনের বিভিন্ন পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিফ করার সময় সেগুলোকে অবাস্তব বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবে এতে ট্রাম্পের আগ্রহ পুরোপুরি থামেনি। ১ মার্চ তিনি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ইরানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।
পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যাওয়ার পর মোসাদের প্রধান রোমান গোফম্যান ইরানের শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাটির দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে গত ২৮ জুলাই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সর্বশেষ ওভাল অফিস বৈঠকেও ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। নেতানিয়াহু নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে এখনও ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সামরিক হামলার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ।
ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগে ও পরে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস, কখনো হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, আবার কখনো ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা কমানোর কথা বলা হয়েছে। তবে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনকে প্রকাশ্যে মার্কিন অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে স্বীকার করেননি ট্রাম্প।
সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ