প্রকাশিত :  ১০:২৬
১৩ আগষ্ট ২০২৬

বন্ধ কারখানা চালু হোক, অপচয় নয়

বন্ধ কারখানা চালু হোক, অপচয় নয়

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে থাকা সরকারি কলকারখানাগুলো যেন দেশের অর্থনীতির এক একটি নীরব স্মৃতিস্তম্ভ। কোথাও বিশাল জমি, কোথাও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবকাঠামো, কোথাও তৈরি কারখানা ভবন, অথচ উৎপাদন নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ পড়ে আছে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক ব্যবহার নেই। এই বাস্তবতায় বন্ধ ও লোকসানি সরকারি কারখানাগুলো বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগটি তাই সময়োপযোগী। তবে উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতগুলো কারখানা ইজারা দেওয়া হলো, তার ওপর নয়। নির্ভর করবে কতগুলো কারখানা সত্যিকার অর্থে উৎপাদনে ফিরল, কত কর্মসংস্থান হলো এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের কতটা কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেল, তার ওপর।

দেশের ১৪টি শিল্পগোষ্ঠী বন্ধ সরকারি কারখানা ও শিল্প ইউনিট পুনরায় চালুর জন্য মোট ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এসব প্রস্তাবের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। একই কারখানার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দেখানোও ইতিবাচক। এতে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং সরকার যোগ্য বিনিয়োগকারী বাছাইয়ের সুযোগ পাচ্ছে।

সরকার প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি বন্ধ ও লোকসানি ইউনিটকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কারখানার অনেকগুলোর সমস্যা শুধু ব্যবস্থাপনায় নয়, প্রযুক্তির পশ্চাৎপদতা, অতিরিক্ত ব্যয়, বাজারের পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও এর সঙ্গে জড়িত। তাই শুধু পুরোনো কারখানা খুলে দিলেই হবে না, প্রয়োজন হবে নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা।

এই জায়গাতেই বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা সবচেয়ে বেশি। একজন উদ্যোক্তা যখন নিজের অর্থ বিনিয়োগ করবেন, তখন উৎপাদনশীলতা, বাজার, প্রযুক্তি ও ব্যয়ের দিকে স্বাভাবিকভাবেই বেশি নজর দেবেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা বেসরকারি খাতের হাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানার আরেকটি বড় সুবিধা হলো প্রস্তুত অবকাঠামো। নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগসহ নানা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় চলে যায়। অথচ বন্ধ কারখানাগুলোর অনেকগুলোর জমি, ভবন, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, সড়ক যোগাযোগ এবং অন্যান্য অবকাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। ফলে সঠিক বিনিয়োগকারী নির্বাচন করা গেলে তুলনামূলক কম মূলধনে এবং কম সময়ে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব।

এতে শুধু রাষ্ট্রের অলস সম্পদ কাজে লাগবে না, নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পায়নের চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় সতর্কতার প্রয়োজন। সরকারি সম্পদ বেসরকারি খাতে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, মূল্যবান শিল্পজমি যেকোনো ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হবে। অতীতে শিল্পের জন্য বরাদ্দ করা জমি অন্য কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ও নজির রয়েছে। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইজারা বা অংশীদারত্ব চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, যে উদ্দেশ্যে কারখানা বা জমি দেওয়া হচ্ছে, সেই উদ্দেশ্যেই তা ব্যবহার করতে হবে। শিল্পের নামে জমি নিয়ে পরে আবাসন, শপিং মল বা অন্য কোনো অনুৎপাদনশীল প্রকল্প করার সুযোগ রাখা যাবে না। চুক্তি ভঙ্গ হলে জমি ও সম্পদ রাষ্ট্রের কাছে ফেরত নেওয়ার কার্যকর আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী নির্বাচনে শুধু সর্বোচ্চ আর্থিক প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিলে চলবে না। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা, অর্থায়নের উৎস, কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা, পরিবেশগত প্রভাব এবং রপ্তানির সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে। কে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, এর পাশাপাশি তিনি কত দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন এবং কতটা টেকসই শিল্প গড়ে তুলতে পারবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের অধীনে বন্ধ পাটকল বেসরকারি খাতে দেওয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কিছুটা আশাবাদ তৈরি করেছে। কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে পাটপণ্য, পোশাক, জুতা, খেলনা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈদ্যুতিক যান, কৃষি যন্ত্রপাতি, সৌরবিদ্যুৎ ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো খাতে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ পুরোনো শিল্প অবকাঠামোকে নতুন শিল্পের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। কোনো কারখানা বন্ধ থাকার পেছনে যদি পুরোনো প্রযুক্তি বা বাজার সংকট থাকে, তাহলে একই ধরনের পুরোনো উৎপাদন পদ্ধতি ফিরিয়ে এনে সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে।

সরকারের প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, মুনাফা ভাগাভাগি ও সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মডেলগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে রাষ্ট্র ও উদ্যোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। তবে যে মডেলই নেওয়া হোক, চুক্তির শর্ত হতে হবে স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক।

বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোও জরুরি। উদ্যোক্তারা যদি বছরের পর বছর অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেন, তাহলে এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। বিনিয়োগ প্রস্তাব যাচাই, চুক্তি সম্পাদন, অনুমোদন ও দখল হস্তান্তরের প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। কোনো দপ্তরের বিলম্ব যেন পুরো প্রকল্পকে আটকে না দেয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ৮৬টি প্রস্তাবের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপা যাবে না। সাফল্য মাপতে হবে বাস্তব উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও রাজস্বের মাধ্যমে। কতটি কারখানা সত্যিকার অর্থে চালু হলো, কতটি টেকসইভাবে চলছে এবং কতটি প্রকল্প মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেল, তার স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের সম্পদ। তাই এই সম্পদ বেসরকারি খাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে যেমন অতিসতর্কতা দরকার, তেমনি অকারণে সিদ্ধান্ত আটকে রাখাও কাম্য নয়। যে সম্পদ বছরের পর বছর পড়ে আছে, সেটিকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার এখনই সময়।

সরকার যদি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা, কঠোর চুক্তি, যোগ্য বিনিয়োগকারী নির্বাচন এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বন্ধ সরকারি কারখানাগুলো অর্থনীতির বোঝা না হয়ে নতুন শিল্পায়নের শক্তিতে পরিণত হতে পারে। আর সেটিই হওয়া উচিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। শুধু বন্ধ কারখানার তালিকা ছোট করা নয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নতুন কর্মসংস্থান, নতুন বিনিয়োগ ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করাই হোক চূড়ান্ত সাফল্য।


Leave Your Comments




শিল্প বাণিজ্য এর আরও খবর