প্রকাশিত :  ১৮:৩০
১২ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:১৯
১২ আগষ্ট ২০২৬

ইচ্ছাশক্তি

ইচ্ছাশক্তি

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

মানুষ প্রায়ই জীবনের এক পর্যায়ে এসে অনুভব করে, চারপাশের সব দরজা যেন বুঝে গেছে। চেনা মুখগুলো ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, অর্থের অভাব নিত্যসঙ্গী, আর একের পর এক পরিকল্পনা ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। যে স্বপ্নকে একদিন জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য বলে মনে হয়েছিল, সেটিই আজ অসম্ভব এক মরীচিকা। তখন মানুষ নিজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, আমি কি সত্যিই পারব?

এই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় বাইরে থাকে না। উত্তরটা মানুষের নিজের ভেতরে থাকে।

কিন্তু নিজের ভেতরের সেই উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। কারণ মানুষ যখন ব্যর্থ হয়, তখন নিজের ক্ষমতা দিয়ে নিজেকে মাপে না, মাপে সাম্প্রতিক ফলাফল দিয়ে। ব্যবসা ব্যর্থ হলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে, পরীক্ষায় খারাপ করলে নিজেকে অযোগ্য ভাবে, চাকরি হারালে মনে করে নিজের কোনো মূল্য নেই, সম্পর্ক ভেঙে গেলে নিজেকে ভালোবাসার অযোগ্য বলে ধরে নেয়।

এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মানসিক ভুল। একটি ঘটনা কখনো একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় হয় না। ব্যর্থতা একটি ঘটনা, দারিদ্র্য একটি পরিস্থিতি, ভুল একটি অভিজ্ঞতা, অসফলতা একটি পর্যায়। এগুলোর কোনোটিই মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো তার বদলে যাওয়ার ক্ষমতা। আজ যে মানুষটি ভেঙে পড়েছে, সেই মানুষটিই আগামীকাল নিজের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ হয়ে উঠতে পারে। শর্ত একটাই, তাকে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে।

‘অসম্ভব’ শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দগুলোর একটি। কারণ এটি কোনো দরজা বন্ধ করার জন্য লোহার তালা ব্যবহার করে না, এটি মানুষের মাথার ভেতরে একটি ধারণা তৈরি করে। একবার মানুষ বিশ্বাস করে ফেললে কিছু অসম্ভব, সে চেষ্টা করার আগেই হেরে যায়। এই হারটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। মাঠে নেমে হেরে যাওয়া আর মাঠে নামার আগেই নিজেকে পরাজিত ঘোষণা করা এক জিনিস নয়। যে মানুষ চেষ্টা করেছে, সে অন্তত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। যে চেষ্টা করেনি, সে কেবল একটি সম্ভাবনাকে হত্যা করেছে। জীবনে অনেক কিছুই কঠিন, কিছু স্বপ্ন অর্জনের জন্য বহু বছর লেগে যায়, কিছু লক্ষ্যে পৌঁছাতে অর্থ, শিক্ষা, দক্ষতা, সহযোগিতা এবং অসাধারণ ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। তবু মনে রাখতে হবে, কঠিন মানেই অসম্ভব নয়।

প্রথমবার সাঁতার শেখার সময় পানি ভয় দেখায়, প্রথমবার সাইকেলে উঠলে পড়ে যেতে হয়। প্রথমবার ব্যবসা করলে ভুল হয়, প্রথমবার মঞ্চে দাঁড়ালে কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। প্রথম বইয়ের ভাষা অসম্পূর্ণ থাকে, প্রথম প্রতিষ্ঠান তৈরির সিদ্ধান্তে ভুল হয়। এগুলো ব্যর্থতা নয়, এগুলো শেখার মূল্য। মানুষ এমন এক প্রাণী যে কাজ করতে করতে শিখতে পারে। তাই প্রথম ব্যর্থতাকে শেষ ফলাফল হিসেবে দেখা মানে জীবনের শেখার প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করা। পড়ে গেছ? উঠে দাঁড়াও। আবার পড়েছ? আবার ওঠো। দশবার পড়েছ? এগারোবার ওঠার শক্তি তৈরি করো।

কিন্তু একই জায়গায় বারবার পড়ে গেলে শুধু উঠে দাঁড়ালেই হবে না। কোথায় ভুল হচ্ছে, সেটাও বুঝতে হবে। অন্ধ জেদ আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এক জিনিস নয়। ইচ্ছাশক্তি বলে, আমি ছাড়ব না। বুদ্ধিমত্তা জিজ্ঞেস করে, কীভাবে এগোব? সাফল্যের জন্য দুটোই দরকার।

আমরা প্রায়ই ভাবি, সফল হতে হলে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। আসলে সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হয় নিজের সঙ্গে। একজন মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে দুজন মানুষ বাস করে। একজন বলে, চেষ্টা করো। অন্যজন বলে, কী লাভ? একজন বলে, তুমি পারবে। অন্যজন বলে, তোমার দ্বারা হবে না। একজন ভবিষ্যতের দিকে তাকায়, অন্যজন অতীতের দিকে। এই দুই কণ্ঠের মধ্যে যে কণ্ঠটি প্রতিদিন বেশি শক্তিশালী হয়, ধীরে ধীরে মানুষ সেই মানুষটিতে পরিণত হয়। এ কারণেই চিন্তার গুরুত্ব এত বেশি।

ইতিবাচক চিন্তা মানে সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকা নয়, সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়। এর গভীর অর্থ হলো, খারাপ কিছু ঘটলেও আমি ভেঙে পড়ে সেখানেই শেষ হয়ে যাব না। আমি পরিস্থিতি দেখব, ভুল স্বীকার করব, প্রয়োজন হলে সাহায্য নেব, পরিকল্পনা বদলাব, আবার চেষ্টা করব। এটাই মানসিক শক্তি।

অনেকেই জীবনের শুরুতে টাকার অভাবকে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করে। টাকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জীবনে বাস্তব স্বাধীনতা আনে। কিন্তু মানুষের প্রথম পুঁজি সব সময় টাকা নয়। তার প্রথম পুঁজি হলো নিজের সম্পর্কে তার ধারণা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে সে কিছু শিখতে পারে, তাহলে সে শেখার চেষ্টা করবে। যদি বিশ্বাস করে সে বদলাতে পারে, তাহলে নিজের অভ্যাস বদলাবে। যদি বিশ্বাস করে ব্যর্থ হলেও আবার শুরু করতে পারবে, তাহলে ব্যর্থতা তাকে শেষ করে দিতে পারবে না। অন্যদিকে মানুষ যদি নিজেকে অযোগ্য মনে করে, সুযোগ থাকলেও সে অনেক সময় তা দেখতে পায় না। এখানে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহংকারের পার্থক্য বুঝতে হবে। আত্মবিশ্বাস বলে, আমি শিখতে পারব। অহংকার বলে, আমার শেখার দরকার নেই। আত্মবিশ্বাস মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, অহংকার তাকে স্থবির করে দেয়।

সৃষ্টিকর্তা কাউকে একই মাপে তৈরি করেননি। কেউ গণিতে ভালো, কেউ ভাষায়। কেউ সংগঠনে, কেউ শিল্পে। কেউ মানুষের মন বোঝে, কেউ প্রযুক্তি। মানুষের পার্থক্য আছে, কিন্তু এই পার্থক্যকে নিজের পরাজয়ের অজুহাত বানানো উচিত নয়। জীবনে শুধু জন্মগত প্রতিভাই সবকিছু নির্ধারণ করে না। অভ্যাসের শক্তি আছে, শিক্ষার শক্তি আছে, পরিশ্রমের শক্তি আছে। একজন সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি সে নিজের সামর্থ্যকে অবহেলা না করে। তোমাকে পৃথিবীর সেরা মানুষ হতে হবে না। তোমাকে তোমার নিজের সম্ভাবনার সেরা সংস্করণ হতে হবে। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার আগে নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করো। গত বছরের চেয়ে আজ কি একটু ভালো? গত মাসের চেয়ে কি বেশি জানো? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে তুমি এগোচ্ছ। ধীরে হলেও এগোচ্ছ।

ব্যর্থতা মানেই বিপর্যয়, এটা মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। আসলে ব্যর্থতা একটি তথ্য। তুমি যা করেছিলে, তা প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। এখন তোমার সামনে নতুন তথ্য আছে, এই তথ্য দিয়ে তুমি সিদ্ধান্ত আরও ভালো করতে পারো। একজন ব্যবসায়ী পণ্য বাজারে এনে ব্যর্থ হলে, যদি সে শুধু বলে আমি ব্যর্থ, তাহলে কিছুই শিখল না। কিন্তু যদি প্রশ্ন করে, কেন মানুষ পণ্যটি কিনল না? দাম বেশি ছিল? মান কম ছিল? প্রচার ভুল ছিল? তাহলে ব্যর্থতা তাকে শিক্ষা দিল। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হলে নিজের ভুলের দিকে তাকাতে হয়। এখানেই সাহসের প্রয়োজন। মানুষ নিজের ভুল দেখতে চায় না, সে অন্যকে দোষ দিতে চায়। অর্থনীতিকে দোষ দেয়, পরিবারকে দোষ দেয়, ভাগ্যকে দোষ দেয়। কিন্তু নিজের জীবনের যতটুকু অংশ নিজের হাতে আছে, সেই অংশের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণ মানে সব ঘটনার জন্য নিজেকে দোষী ভাবা নয়, দায়িত্ব গ্রহণ মানে প্রশ্ন করা, এখন আমি কী করতে পারি?

টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়, সম্পদ হারালে আবার তৈরি করা যায়। কিন্তু চলে যাওয়া সময় ফিরে আসে না। এই সত্যটি আমরা সবাই জানি, তবু সবচেয়ে বেশি অপচয় করি সময়ই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রল করি, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক করি, অন্যের জীবন নিয়ে আলোচনা করি। অতীতের অপমান মনে রেখে বর্তমান নষ্ট করি, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় করতে করতে বর্তমানের কাজটি করি না। তারপর একদিন বুঝতে পারি, আমরা অনেক সময় পেয়েছিলাম, শুধু ব্যবহার করিনি। সময়ের মূল্য বোঝা মানে সারাক্ষণ কাজ করা নয়। বিশ্রামও সময়ের সঠিক ব্যবহার, পরিবারের সঙ্গে থাকাও, বই পড়াও। সময় ব্যবস্থাপনার আসল প্রশ্ন হলো, আমি কোন কাজকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করছি? যদি তুমি না জানো তোমার জীবনের অগ্রাধিকার কী, তাহলে অন্য মানুষ তোমার সময়ের অগ্রাধিকার ঠিক করে দেবে।

টাকা জীবনের জন্য দরকার, কিন্তু টাকা জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে গেলে মানুষ অদ্ভুত এক দৌড়ে ঢুকে যায়। সে ভাবে, আরও টাকা, আরও সম্পদ, আরও পরিচিতি। তারপর একদিন বুঝতে পারে, টাকা বাড়লেও শান্তি বাড়েনি। টাকার পেছনে অন্ধভাবে দৌড়ানোর বদলে নিজের মূল্য তৈরি করো। তুমি এমন কী করতে পারো, যার জন্য মানুষ তোমাকে মূল্য দিতে চায়? কোন সমস্যার সমাধান করতে পারো? নিজেকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করো, যার মূল্য আছে। তখন টাকা তোমার কাছে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। নিজেকে ইন্ডাস্ট্রি বানানো মানে নিজের মধ্যে এমন দক্ষতা, সুনাম, চরিত্র ও সৃষ্টিশীলতা তৈরি করা, যা অন্যের কাছে মূল্যবান। তখন তুমি শুধু চাকরি খুঁজবে না, তুমি মূল্য তৈরি করার সুযোগ খুঁজবে।

মানুষ সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করে, ব্যাংকে টাকা রাখে, শেয়ার কেনে। কিন্তু নিজের ওপর বিনিয়োগ করতে ভুলে যায়। একটা বই কেনার সময় ভাবে টাকা খরচ, একটা প্রশিক্ষণে যাওয়ার সময় ভাবে অনেক খরচ। অথচ এগুলোই দীর্ঘমেয়াদে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে। নিজের ওপর বিনিয়োগ মানে শুধু শিক্ষা নয়, এর মধ্যে রয়েছে নিজের চিন্তার উন্নতি, শরীরের যত্ন, মানসিক স্থিতি, যোগাযোগ দক্ষতা, চরিত্র ও সময় ব্যবস্থাপনা। যে মানুষ নিজের ওপর বিনিয়োগ করে, সে ধীরে ধীরে নিজের মূল্য বাড়ায়।

অনেক প্রতিভাবান মানুষ জীবনেও বড় কিছু করতে পারে না, আবার অনেক সাধারণ ক্ষমতার মানুষ অসাধারণ কিছু তৈরি করে। পার্থক্যটা অনেক সময় শৃঙ্খলায়। প্রতিভা শুরুতে এগিয়ে দিতে পারে, কিন্তু শৃঙ্খলা দীর্ঘ পথে টিকিয়ে রাখে। তুমি অনুপ্রেরণা পেলে কাজ করবে, এমন জীবন দীর্ঘস্থায়ী নয়। কারণ প্রতিদিন অনুপ্রেরণা থাকবে না, কখনো মন ভালো থাকবে, কখনো থাকবে না। তখন তোমাকে চালাবে শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা বলে, মন চাইছে না তবু করো, আজ ফল আসছে না তবু করো, কেউ দেখছে না তবু করো। কারণ তুমি জানো, প্রতিদিনের ছোট কাজগুলোই একদিন বড় ফল তৈরি করবে।

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ধারণা আছে, যে মানুষ কম ঘুমায়, সে যেন বেশি পরিশ্রমী। কিন্তু শরীর ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন। ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যে মানুষ দীর্ঘ জীবন, সুস্থ শরীর এবং স্থির মন চায়, তাকে নিজের ঘুমকে গুরুত্ব দিতে হবে। সময়মতো ঘুম, ঘুমের আগে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন কমানো, শরীরের সংকেত শোনা, এগুলো শৃঙ্খলার অংশ। মানুষ ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য শরীরকে ব্যবহার করে, তাই শরীরকে ধ্বংস করে ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায় না।

আমরা যা খাই, তার সঙ্গে আমাদের শরীরের সম্পর্ক গভীর। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি, লবণ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওপর চাপ তৈরি করে। তাই খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা দরকার। কিন্তু নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রণ নয়, নিজেকে ভালো রাখার জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রণ। নিজেকে ভালোবাসা মানে নিজের শরীরকে সম্মান করা। শরীর কোনো মেশিন নয় যে সারাদিন চালিয়ে যাব এবং নষ্ট হলে বদলে ফেলব। আমরা ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাই, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য স্বাস্থ্য জমাই না। এই ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রত্যেক মানুষের অতীত আছে। কারও অতীত সুন্দর, কারও কষ্টে ভরা। কেউ অর্থ হারিয়েছে, কেউ বিশ্বাস হারিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন পর্যন্ত? কতদিন তুমি একই ভুলের জন্য নিজেকে শাস্তি দেবে? অতীতকে মুছে ফেলতে হবে না, অতীতকে নতুন অর্থ দিতে হবে। যে ব্যর্থতা একদিন তোমাকে অপমানিত করেছিল, সেটাই হয়তো তোমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যা অন্য কোনো বই দিতে পারত না। যে সম্পর্ক ভেঙেছে, তা হয়তো তোমাকে নিজের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে। অতীতের দরজা বন্ধ করো, কিন্তু চাবিটা ফেলে দিও না। কারণ মাঝে মাঝে পেছনে তাকিয়ে মনে করিয়ে দিতে হয়, তুমি কতটা পথ অতিক্রম করেছ।

অতীত স্মৃতি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বর্তমান বাস্তবতা। তবু মানুষ সবচেয়ে কম সময় বর্তমানে থাকে। সে হয় অতীতে থাকে, অথবা ভবিষ্যতের ভয়ে। ‘যদি’ শব্দটি অনেক মানুষের জীবন নষ্ট করে। কারণ জীবন কোনোদিন নিশ্চিত নয়। নিশ্চয়তা খুঁজতে খুঁজতে মানুষ অনেক সময় জীবন শুরুই করতে পারে না। তাই বর্তমানের কাজটি করো। আজ যে ফোনটা করা দরকার, করো। আজ যে বই পড়া দরকার, পড়ো। আজ যে ভুল স্বীকার করা দরকার, স্বীকার করো। কারণ আগামীকাল কখনো আসে, আবার কখনো আসে না।

অনেকে ইতিবাচক চিন্তাকে ভুল বোঝে। তারা ভাবে, সব সময় ভালো কথা বলব, খারাপ কিছু নিয়ে ভাবব না। এটা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষের জীবনে দুঃখ, ভয়, রাগ, হতাশা থাকবেই। মানুষকে সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে হবে না। কাঁদা দুর্বলতা নয়, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, কিছুদিন থেমে যাওয়াও পরাজয় নয়। সমস্যা হলো, থেমে যাওয়াকে যদি স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলো। তাই ইতিবাচক চিন্তার প্রকৃত অর্থ হলো, আমি সমস্যাকে দেখছি, কিন্তু সমস্যা আমাকে সংজ্ঞায়িত করবে না।

মানুষ সামাজিক প্রাণী, আমরা একে অপরের কাছ থেকে চিন্তা গ্রহণ করি। একজন মানুষ সারাক্ষণ অভিযোগ করলে তার সঙ্গে থাকা অন্য মানুষের মনেও অভিযোগ বাড়তে পারে। তাই নিজের মানসিক পরিবেশ বেছে নিতে হবে। তবে সব সমালোচনা নেতিবাচকতা নয়। কেউ তোমার ভুল ধরিয়ে দিলে সে শত্রু নয়। সত্যিকারের বন্ধু অনেক সময় এমন কথা বলে যা শুনতে ভালো লাগে না। নেতিবাচক মানুষ হলো সে, যে তোমার উন্নতির চেষ্টাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো বাস্তব সমাধান দেয় না। সমালোচনা গ্রহণ করো, কিন্তু অপমান গ্রহণ করো না।

‘নিজেকে ভালোবাসো’ কথাটা আমরা খুব সহজে বলি, কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ গভীর। নিজেকে ভালোবাসা মানে নিজের সব ভুলকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়, অলসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। নিজেকে ভালোবাসা মানে নিজের প্রতি ন্যায়বিচার করা। ভুল করেছ? স্বীকার করো, কিন্তু নিজেকে ধ্বংস করো না। ক্লান্ত? বিশ্রাম নাও, কিন্তু স্বপ্ন ছেড়ে দিও না। প্রত্যাখ্যাত হয়েছ? নিজের মূল্য কমিয়ে দিও না। নিজেকে ভালোবাসা মানে নিজের জীবনের প্রতি দায়িত্ব নেওয়া।

যে নিজেকে ভালোবাসে না, সে অন্যের ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে। কারণ তার ভেতরে একটা শূন্যতা থাকে। সে চায় অন্য কেউ এসে বলুক, তুমি যথেষ্ট, তুমি গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বীকৃতি মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন নিজের মূল্য নির্ধারণের সম্পূর্ণ ক্ষমতা অন্য একজন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তখন সম্পর্ক ভালোবাসা থেকে নির্ভরশীলতায় পরিণত হয়। সুস্থ ভালোবাসা বলে, আমি তোমাকে চাই, কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব অর্থহীন নয়। নিজেকে ভালোবাসা শেখার পর ভালোবাসা আরও গভীর হয়, কারণ তখন ভালোবাসা আসে অভাব থেকে নয়, পরিপূর্ণতা থেকে।

নিজেকে ভালোবাসা যেমন জরুরি, অন্য মানুষকে ভালোবাসাও তেমন জরুরি। কিন্তু ভালোবাসার আগে মানবিকতা দরকার। একজন সফল মানুষ যদি তার কর্মচারীকে অপমান করে, তাহলে তার সাফল্য অসম্পূর্ণ। একজন শিক্ষিত মানুষ যদি অশিক্ষিত মানুষকে ঘৃণা করে, তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যকে নিচে নামিয়ে নয়, অন্যকে উঠতে সাহায্য করার মধ্যে। তুমি যত বড় হবে, তত মানুষের কথা শুনতে শেখো। ক্ষমতা না থাকলে সবাই ভদ্র হতে পারে, ক্ষমতা পাওয়ার পরও ভদ্র থাকা চরিত্রের পরিচয়।

একজন মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি টাকা থাকতে পারে, কিন্তু যদি সে রাতে ঘুমাতে না পারে, যদি তার সন্তান তার সঙ্গে কথা বলতে না চায়, যদি তার বন্ধু না থাকে, তাহলে তাকে সফল বলা যাবে কি? সাফল্যের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে হবে। সাফল্য হলো অর্থনৈতিক স্থিতি, স্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি, অর্থপূর্ণ কাজ, ভালো সম্পর্ক এবং আত্মসম্মান। সাফল্য হলো এমন জীবন তৈরি করা, যেটা অন্যের দেখানোর জন্য নয়, নিজের বাঁচার জন্য।

একটি রাষ্ট্র যেমন সংবিধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে পরিচালিত হতে পারে না, একজন মানুষেরও নিজের কিছু নীতি থাকা দরকার। আমি কেমন মানুষ হতে চাই? আমি কোন কাজ কখনো করব না? আমি ব্যর্থ হলে কী করব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে ফেলো। কারণ যা লেখা হয়, তা নিয়ে মানুষ বেশি সচেতন হয়।

সাফল্য অনেক সময় নাটকীয়ভাবে আসে না। কোনো এক সকালে দরজা খুলে সাফল্য এসে দাঁড়ায় না। সাফল্য তৈরি হয় ছোট ছোট কাজের স্তরে। আজ ত্রিশ মিনিট পড়া, আজ সময়মতো ঘুমানো, আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করা। এই ছোট কাজগুলো এত সাধারণ যে মানুষ এগুলোকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু জীবন আসলে ছোট কাজের সমষ্টি। তোমার বর্তমান জীবন তোমার পুরোনো অভ্যাসের ফল, তোমার ভবিষ্যৎ জীবন হবে তোমার বর্তমান অভ্যাসের ফল। তাই ভবিষ্যৎ বদলাতে চাইলে আজকের অভ্যাস বদলাও।

একটি মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে মানুষের মনে হয়, আজ থেকে সব বদলে দেব। সেই অনুভূতি কয়েক ঘণ্টা থাকে, পরদিন আবার পুরোনো অভ্যাস ফিরে আসে। কারণ অনুপ্রেরণা আবেগ তৈরি করে, শৃঙ্খলা জীবন তৈরি করে। তুমি প্রতিদিন অনুপ্রাণিত থাকবে না। তাই নিজেকে এমনভাবে তৈরি করো, যাতে অনুপ্রেরণা না থাকলেও কাজ করতে পারো। এটাই চরিত্র।

জীবনের কিছু পথ একাই হাঁটতে হয়। সবাই তোমাকে বুঝবে না, সবাই তোমার স্বপ্নকে সমর্থন করবে না। কেউ হাসবে, কেউ সন্দেহ করবে। তখন নিজেকে প্রশ্ন করো, আমি কি নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে অন্যের মতামত শুনো, কিন্তু নিজের জীবন অন্যের হাতে দিও না। একা চলার অর্থ সবার পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা নয়। ভালো মানুষের পরামর্শ গ্রহণ করো, বিশেষজ্ঞের জ্ঞান গ্রহণ করো, কিন্তু সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিজের কাছে রাখো।

সমাজ অনেক সময় শেখায়, কাঁদবে না, দুর্বলতা দেখাবে না, সব নিজে সামলাবে। কিন্তু মানুষ সব সময় সবকিছু একা সামলাতে পারে না। কখনো একজন বন্ধুর দরকার হয়, কখনো পরিবারের, কখনো একজন অভিজ্ঞ পরামর্শকের। আর কখনো মানসিক স্বাস্থ্যের পেশাদারের সাহায্য নেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে। নিজের সমস্যাকে স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং নিজের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

ব্যর্থতা মানুষকে কাঁদায়, সাফল্য মানুষকে বদলে দিতে পারে। সাফল্যের পর মানুষ যদি নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায়, তখন পতনের শুরু হয়। সে ভাবতে শুরু করে, আমি সব জানি, আমার ভুল হতে পারে না। এই অবস্থায় মানুষ নিজের চারপাশে এমন লোক তৈরি করে যারা শুধু তার প্রশংসা করে। তারপর সত্য ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তাই সফল হলেও নিজের জন্য এমন মানুষ রাখতে হবে যারা সত্য কথা বলবে। যে বন্ধু বলবে, এখানে তুমি ভুল করেছ। সত্যিকারের ভালোবাসা সব সময় প্রশংসা করে না, কখনো কখনো সতর্ক করে।

একটি দিনের ব্যর্থতা দিয়ে জীবনকে বিচার করা যায় না, একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে বুদ্ধিমত্তা বিচার করা যায় না। জীবন দীর্ঘ, তাই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করো। আজ তুমি যেখানে আছ, সেখান থেকে পাঁচ বছর পরে কোথায় থাকতে চাও? কী শিখতে হবে? কী বাদ দিতে হবে? এই প্রশ্নগুলোই জীবনের দিকনির্দেশনা দেয়।

অন্যের সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া যায়, কিন্তু হিংসা করলে নিজের শক্তি নষ্ট হয়। পৃথিবীতে একজনের সাফল্যের জন্য অন্যজনকে ব্যর্থ হতে হয় না। একজন ভালো লেখক হওয়ায় আরেকজন খারাপ লেখক হয়ে যায় না। তোমার পথ তোমার।

অনেক মানুষ সফল হতে চায় শুধু সাফল্যের জন্য নয়, সে কাউকে দেখাতে চায়। যে তাকে অবহেলা করেছে তাকে দেখাতে চায়, সমাজকে দেখাতে চায়। এই আগুন শুরুতে শক্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষকে ক্লান্ত করে। কারণ তুমি তখন নিজের জন্য বাঁচছ না, অন্যের চোখে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে বাঁচছ। একদিন বুঝবে, যাদের দেখানোর জন্য এত কিছু করেছিলে, তারা হয়তো তোমার কথা ভাবছেই না। তখন সত্যিকারের প্রশ্নটা সামনে আসবে, আমি নিজের জন্য কী করেছি? সেই দিন থেকে আসল স্বাধীনতা শুরু হয়।

নিজের জীবনের নায়ক হওয়ার অর্থ অন্যকে পরাজিত করা নয়। এর অর্থ নিজের ভয়কে অতিক্রম করা, নিজের ভুল স্বীকার করা, নিজের ভবিষ্যৎকে নিজের হাতে নেওয়া। তোমার গল্পে ভিলেন থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, কঠিন সময় থাকবে। কিন্তু গল্পের শেষ অধ্যায় তুমি এখনো লেখোনি। এই কথাটাই মনে রেখো। শেষ অধ্যায় লেখা না হওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষকে ব্যর্থ বলা যায় না।

জীবনকে ভালোবাসা মানে শুধু আনন্দ করা নয়, জীবনকে সম্মান করা মানে নিজের সময়, শরীর, মন এবং কাজকে সম্মান করা। তুমি হয়তো পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করতে পারবে না, কিন্তু নিজের ঘরের একটি সমস্যা সমাধান করতে পারো, একজন হতাশ মানুষকে আশার কথা বলতে পারো। মানুষের মূল্য অনেক সময় তার কত বড় কাজ করেছে তাতে নয়, সে কতজন মানুষের জীবনে আলো এনেছে, তাতেও।

জীবনের শেষদিকে মানুষ সাধারণত তিনটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়। আমি কী করেছি? আমি কাকে ভালোবেসেছি? আমি কী রেখে যাচ্ছি? সেই সময় কেউ জিজ্ঞেস করবে না তুমি কত ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছিলে। তখন গুরুত্বপূর্ণ হবে তুমি কেমন জীবন বেঁচেছিলে। তুমি কি সত্যিই বেঁচেছিলে, নাকি শুধু অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করেছিলে?

‘কাল থেকে শুরু করব’ এই বাক্যটি পৃথিবীর অসংখ্য স্বপ্নের কবর। কাল থেকে ব্যায়াম করব, কাল থেকে পড়ব। কিন্তু কাল আসে এবং মানুষ আবার বলে, পরশু থেকে। জীবন বদলানোর জন্য সব কিছু প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো না। প্রথম পদক্ষেপ নাও, ছোট হোক, কিন্তু বাস্তব হোক। আজ দশ পৃষ্ঠা পড়ো, আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোন করো। ছোট কাজকে ছোট মনে করো না। বড় পরিবর্তনের শুরু প্রায়ই খুব ছোট হয়।

মানুষ নিজের ক্ষমতার সীমা অনেক সময় নিজেই নির্ধারণ করে। ‘আমি এতটুকুই পারি’ এই বাক্যটি বিপজ্জনক। আজ যে কাজ কঠিন, আগামী বছর সেটা সহজ হতে পারে। আজ যে ভাষা বুঝতে পারো না, একদিন সাবলীলভাবে বলতে পারো। তাই নিজের বর্তমান অবস্থাকে নিজের চূড়ান্ত সীমা ভাবো না। বর্তমান তোমার অবস্থান, তোমার সীমা নয়।

মানুষ অন্যকে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু অনেক সময় নিজের সঙ্গে তার সম্পর্কই ভাঙা। নিজের শরীরকে ঘৃণা করে, নিজের অতীতকে ঘৃণা করে। তারপর সে অন্যের কাছ থেকে নিখুঁত ভালোবাসা আশা করে। এটা সম্ভব নয়। নিজের সঙ্গে কথা বলার ধরন বদলাও। ‘আমি ব্যর্থ’ বলার বদলে বলো, ‘আমি ব্যর্থ হয়েছি।’ প্রথমটি পরিচয়, দ্বিতীয়টি ঘটনা। ভুল সংশোধন করা যায়, কিন্তু পরিচয়কে শাস্তি দিয়ে কোনো লাভ নেই।

ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়, ক্ষমা মানে অন্যায়কে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। ক্ষমা মানে নিজের ভেতরে সেই ঘটনার বিষ আর বহন না করা। কেউ তোমাকে আঘাত করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা করতে পারো, কিন্তু আবার তাকে একই সুযোগ দিতে হবে না। নিজেকে রক্ষা করা নিষ্ঠুরতা নয়, আত্মসম্মান।

সবাইকে খুশি করতে গিয়ে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে। না বলতে পারে না, অন্যের সমস্যা নিজের কাঁধে তুলে নেয়। মনে রাখো, ভালো মানুষ হওয়া এবং সবার জন্য নিজেকে বিসর্জন দেওয়া এক জিনিস নয়। তুমি সাহায্য করবে, কিন্তু নিজের জীবন ধ্বংস করে নয়। তুমি ভালোবাসবে, কিন্তু আত্মসম্মান হারিয়ে নয়।

আমরা অনেক সময় অন্য মানুষকে বদলাতে চাই, কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজে পরিবর্তন না চাইলে তাকে জোর করে বদলানো কঠিন। তুমি অন্যের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না, কিন্তু নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারো। এই উপলব্ধি মানসিক স্বাধীনতা দেয়।

কখনো কখনো একজন মানুষ চলে যায়, সম্পর্ক ভেঙে যায়। এই শূন্যতা বাস্তব, এটা অস্বীকার করার দরকার নেই। কিন্তু একজন মানুষ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার নিজের অস্তিত্বও চলে যায় না। তোমার স্বপ্ন আছে, তোমার ভবিষ্যৎ আছে। তাই শোক করো, কাঁদো, কিন্তু একদিন উঠে দাঁড়াও।

নিজেকে ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করার অর্থ এমন একটি ব্যক্তিত্ব তৈরি করা, যার মধ্যে বহু মূল্যবান সম্পদ একসঙ্গে থাকে। জ্ঞান, দক্ষতা, সুনাম, শৃঙ্খলা, সততা, যোগাযোগ, সৃষ্টিশীলতা, নেতৃত্ব এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। এই সম্পদগুলো একসঙ্গে একজন মানুষকে শক্তিশালী করে। তখন সে শুধু টাকা উপার্জনকারী নয়, সে মূল্য সৃষ্টিকারী। আর দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সৃষ্টিকারী মানুষদের প্রয়োজন সব সময় থাকে।

একজন মানুষ একা সফল হতে পারে, কিন্তু বড় সাফল্য টেকসই করতে হলে মানুষ তৈরি করতে হয়। তুমি যদি একা উপরে ওঠো এবং সবাইকে নিচে ফেলে যাও, তাহলে তোমার সাফল্য হয়তো বড়, কিন্তু তার মানবিকতা ছোট। যে মানুষ নিজের সঙ্গে অন্যকেও উঠতে সাহায্য করে, তার সাফল্যের গভীরতা বেশি।

শেষ পর্যন্ত মানুষ তার চরিত্রই। টাকা যাবে, ক্ষমতা যাবে, চেহারা বদলাবে, কিন্তু চরিত্রের প্রভাব থেকে যায়। মানুষ তোমার কথা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু তুমি তাকে কেমন অনুভূতি দিয়েছিলে, তা অনেক সময় মনে থাকে। তাই সফল হও, কিন্তু ভদ্র থাকো। ধনী হও, কিন্তু মানবিক থাকো। জনপ্রিয় হও, কিন্তু সত্য হারিও না।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ অনেক সময় নিজের ভেতরের মানুষটি। অলসতা, ভয়, অহংকার, লোভ, হিংসা, রাগ, অতীতের প্রতি আসক্তি। এই জিনিসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা মানে নিজের ওপর ক্ষমতা অর্জন করা। নিজেকে জয় করা মানে অনুভূতিহীন হওয়া নয়। বরং অনুভূতি থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত সব সময় অনুভূতির হাতে থাকবে না। রাগ হবে, কিন্তু রাগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেবে না। ভয় হবে, কিন্তু ভয়ের কারণে সব সুযোগ ছেড়ে দেবে না। এই হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ।

মানুষ ভাবে স্বাধীনতা মানে অনেক টাকা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আরও গভীর স্বাধীনতা হলো নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। তুমি জানো কী চাইছ, তুমি নিজের মূল্য জানো। টাকার জন্য মূল্যবোধ বিক্রি করো না, একাকিত্বের ভয়ে ভুল সম্পর্কে থাকো না, সমাজের ভয়ে নিজের স্বপ্ন হত্যা করো না। এটাই স্বাধীনতা।

তুমি এখন যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছ, হয়তো তুমি জানো না সেটার ভবিষ্যৎ মূল্য কী। একদিন তুমি পেছনে তাকিয়ে বলতে পারো, সেই সময়টা না এলে আমি আজকের মানুষটি হতাম না। যে রাতগুলোতে কেঁদেছ, সেগুলো তোমাকে সংবেদনশীল করতে পারে। যে ব্যর্থতা তোমাকে ভেঙেছিল, সেটাই তোমাকে শক্ত করতে পারে। তাই কষ্টকে মহিমান্বিত করো না, কিন্তু কষ্ট থেকে শিক্ষা নিতে ভয় পেয়ো না।

যদি তুমি এই লেখা পড়ে থাকো এবং মনে হয় তোমার জীবন এলোমেলো, তাহলে একটা কথা মনে রেখো, তুমি এখনো শেষ হয়ে যাওনি। তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি? তবু তুমি শিখতে পারো। সম্পর্ক ভেঙেছে? তবু নিজেকে ভালোবাসতে শিখতে পারো। বয়স বেড়েছে? তবু নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারো। তুমি আজ যেখানে আছ, সেটাই তোমার শেষ ঠিকানা নয়। জীবন কোনো স্থির ছবি নয়, জীবন চলমান। তুমি বদলাবে, তোমার চিন্তা বদলাবে, তোমার স্বপ্ন বদলাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যে একটি জিনিস ধরে রাখো, নিজের প্রতি সম্মান।

নিজেকে ভালোবাসো, নিজেকে শাসন করো, নিজেকে ক্ষমা করো, নিজেকে উন্নত করো। টাকার পেছনে অন্ধভাবে ছুটো না, নিজেকে এমন মানুষে পরিণত করো যার জ্ঞান, দক্ষতা ও চরিত্রের মূল্য আছে। ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়ো না, ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করো। অতীতকে অস্বীকার করো না, অতীত থেকে শিক্ষা নাও। বর্তমানকে অবহেলা করো না, কারণ ভবিষ্যৎ বর্তমানের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে। নেতিবাচকতা থেকে নিজেকে রক্ষা করো, কিন্তু বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যেও না। স্বপ্ন দেখো, কিন্তু স্বপ্নের সঙ্গে শৃঙ্খলা যোগ করো। মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হও, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে নয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো, কিন্তু নিজের ভুল দেখার সাহসও রাখো।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, তোমার জীবনকে অন্যের চোখ দিয়ে বিচার করা বন্ধ করো। তোমার জীবন তোমার, তোমার পথ তোমার। তোমার ভবিষ্যৎও অনেকখানি তোমার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। হয়তো তুমি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষ নও, হয়তো তোমার হাতে টাকা নেই, হয়তো তুমি বহুবার ব্যর্থ হয়েছ। তবু তোমার হাতে একটি জিনিস এখনো আছে, পরবর্তী সিদ্ধান্ত। আজ তুমি কী সিদ্ধান্ত নেবে? নিজেকে হারিয়ে ফেলবে, নাকি নিজেকে আবার তৈরি করবে? এই সিদ্ধান্তগুলোই ধীরে ধীরে তোমাকে অন্য মানুষে পরিণত করবে।

একদিন হয়তো তুমি পেছনে তাকাবে, দেখবে সেই মানুষটি আর তুমি নও। যে মানুষটি একদিন বলেছিল, আমি পারব না, সে আজ বলছে, আমি চেষ্টা করব। তারপর একদিন বলবে, আমি শিখেছি। তারপর বলবে, আমি আবার ব্যর্থ হয়েছি, কিন্তু এবার জানি কোথায় ভুল করেছি। তারপর একদিন বলবে, আমি পেরেছি। কিন্তু সেই দিনটিও শেষ নয়। কারণ সত্যিকারের সাফল্য কোনো একটি শিখরে উঠে দাঁড়িয়ে বলা নয়, আমি জিতে গেছি। সত্যিকারের সাফল্য হলো প্রতিটি শিখরের পরও বিনয়ী থাকা, প্রতিটি পতনের পরও উঠে দাঁড়ানো, প্রতিটি পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের মানবিকতা ধরে রাখা।

আর শেষ পর্যন্ত যখন পৃথিবী তোমাকে অনেক কিছু দেবে, তখন যেন তুমি নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে না ফেলো। কারণ পৃথিবী জয় করে নিজের ভেতরটাকে হারিয়ে ফেললে সেই জয় আসলে পরাজয়। অন্যদিকে পৃথিবী তোমাকে খুব বেশি কিছু না দিলেও যদি তুমি নিজের চরিত্র, আত্মসম্মান, ভালোবাসা, সততা, স্বাস্থ্য, জ্ঞান এবং স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারো, তবে তুমি এমন একটি সম্পদ অর্জন করেছ যা কোনো ব্যাংকে রাখা যায় না। সেটি হলো নিজের কাছে নিজের মূল্য। সেই মূল্যই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

তাই চেষ্টা করে দেখো। হয়তো পারবে। আর যদি প্রথমবার না পারো, আবার চেষ্টা করো। যদি আবার না পারো, নতুন পদ্ধতি খুঁজে নাও। যদি পথ ভুল হয়, পথ বদলাও। যদি গতি কম হয়, ধৈর্য ধরো। যদি মানুষ হাসে, হাসতে দাও। কিন্তু কখনোই নিজের জীবনের দরজা নিজে বন্ধ করে দিও না। কারণ তুমি এখনো জানো না, তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি হয়তো এখনো লেখা হয়নি। এবং সেই অধ্যায়ের প্রথম বাক্যটি খুব সাধারণ হতে পারে, আজ আমি আবার শুরু করলাম।

সেখান থেকেই হয়তো একটি নতুন জীবন শুরু হবে। একটি জীবন যেখানে টাকা থাকবে, কিন্তু টাকা তোমার মালিক হবে না। সাফল্য থাকবে, কিন্তু অহংকার তোমাকে গ্রাস করবে না। ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু তুমি নিজের অস্তিত্ব হারাবে না। ব্যর্থতা আসবে, কিন্তু তুমি তাকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করবে। সময় চলে যাবে, কিন্তু তুমি তার মূল্য বুঝে বাঁচবে। মানুষ আসবে, মানুষ চলে যাবে, কিন্তু তুমি নিজের কাছে থেকে যাবে।

আর শেষ পর্যন্ত, যখন কোনো এক সন্ধ্যায় একা বসে নিজের জীবনের দিকে তাকাবে, তখন হয়তো মনে হবে, আমি নিখুঁত ছিলাম না, আমি অনেক ভুল করেছি, অনেকবার পড়েছি, অনেক সুযোগ নষ্ট করেছি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমি নিজেকে ঘৃণা করার বদলে নিজেকে বদলেছি। আমি অন্যের ভালোবাসা পাওয়ার আগে নিজেকে ভালোবাসতে শিখেছি। আমি টাকার পেছনে ছুটে নিজেকে হারাইনি, আমি নিজের মূল্য তৈরি করেছি। আমি সময়কে সম্মান করেছি, শরীরকে অবহেলা করিনি। আমি অতীতকে শিক্ষক করেছি, কারাগার নয়। আমি অন্যকে ভালোবাসতে শিখেছি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমি আমার জীবনকে অন্য কারও গল্প হতে দিইনি, আমি নিজের গল্প নিজেই লিখেছি। হয়তো গল্পটি নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সেটি ছিল আমার। আর সেই কারণেই সেটি ছিল মূল্যবান।

নিজেকে ভালোবাসো, নিজেকে গড়ো, নিজেকে শৃঙ্খলিত করো, নিজের সময়কে সম্মান করো। ব্যর্থতাকে শিক্ষক বানাও, ভবিষ্যৎকে ভয় নয় সম্ভাবনা হিসেবে দেখো। আর যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন মনে রেখো, অসম্ভবের শেষ সীমা অনেক সময় মানুষের কল্পনার শেষ সীমা মাত্র। চেষ্টা করে দেখো, হয়তো তুমি পারবে। কারণ তোমার গল্প এখনো শেষ হয়নি।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর