প্রকাশিত : ১৮:১৭
১২ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বিশ্বায়নের বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (এফপিআই) আকর্ষণের লড়াই এখন তুঙ্গে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো যখন বিদেশি পুঁজি টানতে আইনি জটিলতা নিরসন ও আমলাতান্ত্রিক শিথিলতার পরিচয় দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে একটি উদার ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যমুক্ত পরিবেশ গড়া ছাড়া বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, দেশের শিল্পায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের বাইরে গিয়ে বিদেশ থেকে বড় অঙ্কের মূলধন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে শুধু ট্যাক্স হোলিডে প্রদান কিংবা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক পুঁজি টানা সম্ভব নয়। বিশ্ব বিনিয়োগকারীদের কাছে আসল আকর্ষণ হলো আন্তর্জাতিক মানের স্থিতিশীল নীতি, অর্জিত মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার (রিপ্যাট্রিয়েশন) আইনি নিরাপত্তা এবং একটি আধুনিক পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকৃত মূলধনী লাভ বা লভ্যাংশ যদি সময়মতো নিজ দেশে ফেরত না পাঠানো যায়, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই ঝুঁকি নিতে চায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কিছু অসংগতিপূর্ণ নিয়ম। যেমন, স্পনসর ও পরিচালকদের জন্য যৌথভাবে ৩০ শতাংশ এবং ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা, যা আন্তর্জাতিক প্রচলিত বাজার ব্যবস্থার একেবারে বিপরীত।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বিডা যে পরিসংখ্যান পেশ করেছে, তাতে দেখা যায় বিশ্বব্যাপী আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে নিট এফডিআই প্রবাহ প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১,৭৭০ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ১,২৭০ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলার। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) এই সাময়িক বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোর কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেনি।
পরিসংখ্যানটির একটু গভীরে চোখ বুলালেই প্রকৃত সংকট উন্মোচিত হয়। দেখা যায়, এই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি কিন্তু নতুন বিদেশি কোম্পানি বা ফ্রেশ ইক্যুইটি নয়। মোট বিনিয়োগ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে দেশে ইতোমধ্যে কর্মরত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ (রিইনভেস্টেড আর্নিংস) এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন ইক্যুইটি মূলধন এসেছে ৫৫৪ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। অথচ পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ছিল ৪৩৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার, যার বৃদ্ধি ৩১৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর আন্তঃকোম্পানি ঋণ ছিল ৭৮১ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার, যা প্রবৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
এই সংখ্যাগুলো নির্দেশ করে যে, পুনর্বিনিয়োগে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন আসলে নতুন বিনিয়োগকারী আসার লক্ষণ নয়। ডলার সংকট, ব্যাংকিং বিধিনিষেধ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে অর্জিত লভ্যাংশ দেশে আটকে রেখেছিল এবং সেটিকে বাধ্য হয়ে পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়েছে। পক্ষান্তরে প্রকৃত ভিত্তিমূল অর্থাৎ ফ্রেশ ইক্যুইটির প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশে। সম্ভাবনাময় বাজার হওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিশ্ব বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প নিয়ে এগোতে ভয় পাচ্ছেন।
মুনাফা ফেরত নেওয়ার সহজ পথই বিনিয়োগের মূল চাবিকাঠি
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত কেবল কাগজে-কলমে থাকা নীতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় প্রয়োগযোগ্য আইনি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে মূলধন ও লভ্যাংশ স্থানান্তরের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অহেতুক নিরীক্ষা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলার ঘাটতির কারণে বিদেশিরা ধাক্কা খান।
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কোথাও প্রবেশের আগে বের হওয়ার পথ বা এক্সিট স্ট্র্যাটেজি খতিয়ে দেখে। নিজ পাওনা বা মুনাফা তুলতে যদি ব্যাংকিং পাড়ায় ঘুরতে হয় কিংবা অনুমোদনের অপেক্ষায় মাসের পর মাস পার হয়, তবে সেই দেশের ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান ক্ষুণ্ন হয়। ফলে নতুন বিনিয়োগের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের পাশে দাঁড়ালে আমাদের পলিসি ঘাটতি ধরা পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনামে বার্ষিক নিরীক্ষা ও কর পরিশোধের পরই বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের নির্দিষ্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শতভাগ মুনাফা নিজ দেশে পাঠাতে পারে। ভারতে অটোমেটিক রুটের মাধ্যমে লভ্যাংশ ও ইক্যুইটি বিক্রির টাকা সরাসরি স্থানান্তরিত হয়। অথচ আমাদের দেশে মুদ্রা সংকট ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার জালে আটকে থাকতে হয়।
অনুরূপ পার্থক্য দেখা যায় শেয়ার ধারণের বিধিতেও। ভিয়েতনামে স্পনসরদের জন্য নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন শেয়ার রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভারতেও ফ্রি-ফ্লোট ঠিক থাকলে ৩০ শতাংশের নিয়ম নেই। এছাড়া আমাদের দেশে আইপিও শেয়ারের ক্ষেত্রে স্পনসরদের জন্য ৩ বছরের কঠিন লক-ইন বাধ্যতামূলক, যা ভিয়েতনাম বা ভারতে নমনীয় ও চুক্তিভিত্তিক করা হয়েছে। ভিয়েতনামের বাজার উদারীকরণের ফল আজ হাতেনাতে মিলছে, অন্যদিকে আমরা এখনো পুরোনো ধ্যানধারণায় আটকে আছি।
বিএসইসির ৩০% ও ২% বিধিমালা: একটি অপ্রয়োজনীয় জট
বিএসইসি ২০১১ সালে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির স্পনসর ও পরিচালকদের জন্য যৌথভাবে ৩০ শতাংশ এবং প্রত্যেক পরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক করে। ২০১০ সালের বাজার ধসের পর তৎকালীন উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রি ঠেকানো এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার অঘোষিত লক্ষ্যে এই নিয়ম আনা হয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই নিয়ম নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম বড় ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আধুনিক করপোরেট ব্যবস্থার মূলভিত্তি হলো কোম্পানির মালিকানা ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনার পৃথকীকরণ। উন্নত ও উদীয়মান বাজারে কোম্পানি চালান দক্ষ সিইও ও পেশাদার পর্ষদ, সেখানে বৃহৎ শেয়ারহোল্ডারদের বাধ্য হয়ে পর্ষদে বসে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এই অনমনীয় নিয়মের কারণে বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা চাইলেও ভালো দেশীয় কোম্পানির ইক্যুইটি কিনতে পারছেন না বা বোর্ডে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশে তাদের ক্যাপিটাল সরিয়ে নিচ্ছেন।
আরও ক্ষতিকর বিষয় হলো, কোনো সংকটে পড়া ব্যাংক বা কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ দেয়, তখন পূর্বের স্পনসরদের শেয়ার ধারণের হার ৩০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এতে বিএসইসি ওই কোম্পানির নতুন শেয়ার ইস্যু, মূলধন বৃদ্ধি ও ঋণ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়। যে কোম্পানি ঘুরে দাঁড়াতে চাইছিল, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্ববিরোধী আইনের চাপে পড়ে চিরতরে নিভে যায়। সম্প্রতি পুনর্গঠিত ছয়টি ইসলামী ব্যাংকসহ ৪৪টি কোম্পানির ক্ষেত্রে এই আইনি জটিলতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। যে কোম্পানি স্বাভাবিক ব্যবসা হারিয়ে ফেলছে, তার উদ্যোক্তাদের শেয়ার কিনতে বাধ্য করা অসম্ভব এক দাবি।
নীতি সংস্কারে সরকারের করণীয়
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে এবং পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করতে চার ধাপে অবিলম্বে নীতিগত আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।
১. মুনাফা ও ক্যাপিটাল গেইন প্রত্যাবাসন অটোমেশন
অর্জিত লভ্যাংশ ফেরত পাঠাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল উইন্ডো চালু করতে হবে, যেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংক সর্বোচ্চ ৫ কর্মদিবসের মধ্যে অর্থ অনুমোদন করবে। সেই সঙ্গে রেজিস্টার্ড কাস্টোডিয়ান ব্যাংকের মাধ্যমে ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টে সম্পূর্ণ রূপান্তরযোগ্যতা ও স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
২. অনমনীয় শেয়ার বিধিমালা বাতিল
বিএসইসির ২০১১ সালের বিতর্কিত ৩০ শতাংশ ও ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের প্রজ্ঞাপন বাতিল করতে হবে। চাপিয়ে দেওয়া বিধির বদলে ২০১৮ সালের করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড সংস্কার করে স্বাধীন পরিচালকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও আর্থিক রিপোর্টে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নিয়ম প্রবর্তন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে উদ্যোক্তা শেয়ারের চেয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারী বা ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
৩. আইপিও লক-ইন শিথিলকরণ
পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫ সংশোধন করে আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, প্রাইভেট ইক্যুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের জন্য ৩ বছরের লক-ইন কমিয়ে ৬ মাস থেকে ১ বছরে আনতে হবে। এতে মূলধন খালাস করে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের পথ সহজ হবে।
৪. আধুনিক ট্রেডিং ব্যবস্থা চালু
বাজারের ঝুঁকি কমাতে শর্ট সেলিং, ফিউচারস অ্যান্ড অপশনস এবং আধুনিক হেজিং সুবিধা চালু করতে হবে। কাস্টোডিয়ান ব্যাংকিংয়ে অনাবাসীদের জন্য কাগজপত্র জমার জটিলতা সহজ করে সরাসরি বিনিয়োগের পথ মসৃণ করতে হবে।
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেকটাই দৃশ্যমান হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আধুনিকায়ন না হলে বৈশ্বিক পুঁজি আনা সম্ভব হবে না। তথ্য প্রমাণ বলছে, মুনাফা আটকে যাওয়ার ভয় এবং অনমনীয় আইনই আমাদের নতুন ফ্রেশ ইক্যুইটির গতি থামিয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মূলধন অত্যন্ত সংবেদনশীল। যেখানে মূলধন আটকে থাকার ভয় থাকে, সেখানে কেউ বিনিয়োগ করে না। বিএসইসির বিতর্কিত নিয়মকানুনগুলো রহিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ন্যূনতম শর্ত। শতভাগ ঝামেলামুক্ত উপায়ে মুনাফা ও ইক্যুইটি নিজ দেশে ফেরানোর আইনি সুনিশ্চয়তা দিতে পারলে বিশ্ববাজার নিজেই বাংলাদেশে পা বাড়াবে। কালক্ষেপণ না করে এই নীতি সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাই হবে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।