প্রকাশিত : ১৪:০৮
১১ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:১৬
১১ আগষ্ট ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
পুঁজিবাজারে আস্থা তৈরি করা কঠিন, ভেঙে দেওয়া সহজ। একটি ভালো সিদ্ধান্তের জন্য যেমন সময়, তথ্য ও বিচক্ষণতা দরকার, তেমনি সিদ্ধান্তহীনতার কারণেও কখনো কখনো বাজারে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা। ডোমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে ঘিরে এখন যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, তার কেন্দ্রবিন্দু শুধু একটি কোম্পানি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি, বিনিয়োগকারীদের অধিকার, ব্যাংকঋণের ঝুঁকি, করপোরেট পুনর্গঠনের সুযোগ এবং সর্বোপরি পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থার বিষয়টি।
ডোমিনেজ স্টিলের স্পন্সর-পরিচালকদের হাতে থাকা প্রায় ৩০ শতাংশ শেয়ার আকিজ রিসোর্সেস লিমিটেড, শেখ জসিম উদ্দিন ও ফারিয়া হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তরের জন্য চুক্তি হয়েছে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে এটি নিছক একটি শেয়ার কেনাবেচার ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে একটি দুর্বল অবস্থায় থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন বিনিয়োগকারী যদি সত্যিই মূলধন, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও শিল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে কোম্পানিটিকে ঘুরে দাঁড় করাতে পারেন, তাহলে সেটি শুধু ওই কোম্পানির জন্য নয়, এর শেয়ারধারী, কর্মী এবং পুঁজিবাজারের জন্যও ইতিবাচক ঘটনা হতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। এই পরিবর্তনের অনুমোদন প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ হচ্ছে কেন?
এই প্রশ্ন তোলা মানেই বিএসইসির ওপর কোনো অভিযোগ আরোপ করা নয়। বরং একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যত বেশি স্বচ্ছ হবে, বাজারে তার গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে। বিএসইসি যদি অতিরিক্ত তথ্য চায়, তার যৌক্তিকতা রয়েছে। ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হলে সেটিও স্বাভাবিক। শেয়ার বন্ধক আছে কি না, কোম্পানির ঋণের দায় কী, নতুন মালিকেরা কোথা থেকে অর্থ আনছেন, তাঁদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
কিন্তু দায়িত্বশীল তদারকি আর সিদ্ধান্তহীনতা এক বিষয় নয়।
ডোমিনেজ স্টিলের পরিচালনা পর্ষদ গত ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় ৩ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার অফ-মার্কেট চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তরের অনুমোদন দেয়। পরদিন সিডিবিএলের উপ-আইন ১১.৬-এর অধীনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষা।
এই অপেক্ষার সময় যত বাড়ে, অনিশ্চয়তাও তত বাড়ে। আর পুঁজিবাজারে অনিশ্চয়তা কখনো নিষ্ক্রিয় থাকে না। সেটি কখনো গুজব তৈরি করে, কখনো জল্পনা বাড়ায়, কখনো শেয়ারের দরে অস্বাভাবিক ওঠানামা ঘটায়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন সেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যাঁরা তথ্যের চেয়ে গুজবের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হন।
ডোমিনেজ স্টিলের শেয়ারদরের সাম্প্রতিক আচরণ এ কারণেই বিশেষভাবে নজর দেওয়ার দাবি রাখে। কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব হয়েছে মাত্র ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ কম। একই সময়ে নিট ক্ষতি হয়েছে ৯৪ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়েও শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ঋণাত্মক। অথচ অধিগ্রহণের খবর সামনে আসার পর শেয়ারদরে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।
এখানে নিয়ন্ত্রকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাজারে এই দরবৃদ্ধির পেছনে তথ্যভিত্তিক প্রত্যাশা কতটা এবং কৃত্রিম জল্পনা কতটা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। তবে এর দায়িত্ব শুধু বিএসইসির নয়। স্টক এক্সচেঞ্জ, কোম্পানি, পরিচালক, বড় বিনিয়োগকারী এবং বাজারের অন্যান্য অংশীজনেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো কোম্পানির সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তনের খবরকে কেন্দ্র করে যদি শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদেরও সতর্ক হতে হবে। একটি সম্ভাব্য অধিগ্রহণ কখনোই একটি দুর্বল কোম্পানির মৌলিক ভিত্তিকে রাতারাতি শক্তিশালী করে না।
আবার উল্টো দিকটিও ভুলে গেলে চলবে না।
একটি কোম্পানি আজ দুর্বল মানেই আগামীকালও দুর্বল থাকবে, এমন কোনো অর্থনৈতিক নিয়ম নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুর্বল বা লোকসানি কোম্পানিকে নতুন ব্যবস্থাপনা, নতুন মূলধন ও নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মাধ্যমে পুনর্গঠনের নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও এমন সুযোগ থাকা দরকার। বরং পুঁজিবাজারের বড় সংস্কারের একটি অংশ হওয়া উচিত, রুগ্ণ তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কীভাবে দক্ষ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের হাতে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যায়।
এই জায়গায় ডোমিনেজ স্টিলের ঘটনা একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে।
আকিজ রিসোর্সেসের মতো শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীরা যদি কোম্পানিটির ব্যবসা পুনর্গঠনের বাস্তব পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে বিষয়টিকে কেবল মালিকানা বদলের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, নতুন বিনিয়োগকারীরা কী ধরনের মূলধন আনছেন, কারখানা কীভাবে চালু করবেন, কর্মসংস্থান কতটা বাড়বে, ব্যাংকের দায় কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, উৎপাদন কীভাবে বাড়বে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কীভাবে উপকৃত হবেন।
তবে বড় শিল্পগোষ্ঠীর নাম থাকলেই কোনো চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদনযোগ্য হয়ে যায় না। এটিও মনে রাখা জরুরি। নিয়ন্ত্রকের কাজ হলো নাম বা পরিচয় দেখে নয়, তথ্য ও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এ কারণেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনাপত্তিপত্রের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে পুঁজিবাজারে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ঋণসংক্রান্ত জটিলতা পরে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইয়াখিন পলিমারের অভিজ্ঞতা বাজারকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। কোনো কোম্পানির শেয়ার বা সম্পদ যদি ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকে, তাহলে মালিকানা বদলের পর সেই দায় কার ওপর থাকবে, কীভাবে তা নিষ্পত্তি হবে এবং ঋণদাতার অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে নিয়ন্ত্রকের অনুমোদন দেওয়া নিশ্চয়ই দায়িত্বশীল কাজ হবে না।
তাই বিএসইসি তথ্য চাইলে বাজারের উচিত সেটিকে বাধা হিসেবে দেখা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, সেই তথ্য যাচাইয়ের জন্য কত সময় প্রয়োজন।
এখানেই মূল সমস্যা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা জানিয়ে দেয়, তাহলে বাজারে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে। ধরা যাক, কোনো আবেদন পাওয়ার পর ১৫ বা ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে। অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট তালিকা দিয়ে তা চাওয়া হবে। নথি জমা পড়ার পর আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অনুমোদন না দিলে তার কারণ লিখিতভাবে জানানো হবে। এতে আবেদনকারী যেমন নিজের অবস্থান বুঝতে পারবেন, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও জানতে পারবেন প্রক্রিয়াটি কোথায় আটকে আছে।
এ ধরনের প্রক্রিয়াই একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য।
নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা থাকা দরকার, কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকা দরকার। বিএসইসি কোনো প্রস্তাব অনুমোদন করবে কি না, সেটি তার আইনগত এখতিয়ার। কিন্তু একটি আবেদন মাসের পর মাস নিষ্পত্তি না হলে বাজারের জানার অধিকার আছে, সেটি কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কী কারণে সিদ্ধান্ত হচ্ছে না।
এখানে স্বচ্ছতা মানে গোপনীয় নথি প্রকাশ করা নয়। স্বচ্ছতা মানে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা।
কোনো নথি অসম্পূর্ণ হলে বলা হোক, কোন নথি প্রয়োজন। কোনো আইনগত সমস্যা থাকলে বলা হোক, কোন বিধানের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হলে তা স্পষ্টভাবে জানানো হোক। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দুর্বল হলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু সবকিছুর পরও যদি শুধু ফাইল চলাচল করতে থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরি হবে কীভাবে?
আরেকটি বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রকের কাজ শুধু ভুল ধরার নয়, বাজারকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাও। নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাজারকে থামিয়ে রাখা নয়, বরং নিরাপদভাবে এগিয়ে নেওয়া।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বহু বছর ধরে একটি সমস্যা রয়েছে। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে অনাগ্রহী। আবার তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানি দুর্বল হয়ে পড়লে সেগুলো পুনর্গঠনের পথও সহজ নয়। ফলে একদিকে নতুন ভালো কোম্পানি আসছে না, অন্যদিকে পুরোনো দুর্বল কোম্পানিগুলোও বাজারের বোঝা হয়ে থাকছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর পুনর্গঠন কাঠামো দরকার।
যে কোম্পানি আর্থিকভাবে দুর্বল, কিন্তু তার সম্পদ, ব্র্যান্ড, কারখানা বা ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে নতুন উদ্যোক্তার হাতে পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় ছোট বিনিয়োগকারীর স্বার্থকে সবার আগে রাখতে হবে। নতুন মালিক এসে পুরোনো দায় এড়িয়ে যাবেন, আর সাধারণ শেয়ারধারী অনিশ্চয়তায় থাকবেন, এমন মডেল গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আবার এমনও হওয়া উচিত নয় যে, আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কোনো সম্ভাব্য পুনর্গঠন শুরু হওয়ার আগেই তা থেমে যায়।
ডোমিনেজ স্টিলের ঘটনা তাই একটি বৃহত্তর সংস্কারের সুযোগ তৈরি করেছে। বিএসইসি চাইলে এই ধরনের মালিকানা পরিবর্তনের জন্য একটি আলাদা দ্রুত নিষ্পত্তি কাঠামো তৈরি করতে পারে। সেখানে ঝুঁকি যাচাই হবে, ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হবে, বিনিয়োগকারীর অধিকার নিশ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও থাকবে।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়া আরও সহজ করা সম্ভব। একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় আবেদনকারী দেখতে পারবেন তাঁর আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে। কোন নথি প্রয়োজন, কোন কর্মকর্তা বা বিভাগে বিষয়টি রয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। এতে একদিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ কমবে।
পুঁজিবাজারে আস্থা তৈরির জন্য এমন ছোট ছোট সংস্কারই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডোমিনেজ স্টিলের শেয়ারদর নিয়ে যে অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে, সেটিও যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা। কোনো বিনিয়োগকারী যেন কেবল সম্ভাব্য অধিগ্রহণের গুজবে শেয়ার কিনে বড় ক্ষতির মুখে না পড়েন, সেটি নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব। একই সঙ্গে যদি কোনো পক্ষ গোপন তথ্য ব্যবহার করে থাকে বা বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু জরিমানা করা নয়। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অনিয়ম করার সুযোগ কমে যায় এবং বিনিয়োগকারী নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিএসইসির প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত বিনিয়োগকারীর আস্থা।
সেই আস্থা তখনই তৈরি হবে, যখন বিনিয়োগকারী বুঝবেন, একটি কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য সমান। বড় শিল্পগোষ্ঠী হোক বা ছোট উদ্যোক্তা, একই নিয়মে যাচাই হবে। আবার কোনো উদ্যোক্তা যদি সব শর্ত পূরণ করেন, তাহলে শুধু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তাঁর বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে না।
ডোমিনেজ-আকিজ চুক্তির ক্ষেত্রে তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দ্রুততা নয়, বরং দ্রুততার সঙ্গে স্বচ্ছতা।
বিএসইসি যদি মনে করে প্রয়োজনীয় নথি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, তাহলে তা স্পষ্টভাবে জানানো উচিত। যদি কোনো আইনগত বাধা থাকে, সেটিও জানানো উচিত। আর যদি সব প্রয়োজনীয় নথি জমা পড়ে থাকে এবং বড় কোনো বাধা না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর বিলম্বের কারণ কী, সেটিও বাজারকে বোঝানো প্রয়োজন।
কারণ পুঁজিবাজার শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি মানুষের সঞ্চয়, উদ্যোক্তার মূলধন এবং দেশের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে বহু মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে।
ডোমিনেজ স্টিল হয়তো শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াবে, হয়তো দাঁড়াবে না। নতুন মালিকানা কাঠামো সফল হবে কি না, অথবা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না, সেটিও ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু এই ঘটনা থেকে একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে মালিকানা পরিবর্তন, কোম্পানি পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
নিয়ন্ত্রককে এমন হতে হবে, যাতে অসৎ উদ্দেশ্যের দরজা বন্ধ থাকে, কিন্তু সৎ বিনিয়োগের দরজা খোলা থাকে।
একটি রুগ্ণ কোম্পানিকে বাঁচাতে পারে দক্ষ ব্যবস্থাপনা। একটি বন্ধ কারখানা আবার চালু করতে পারে নতুন মূলধন। একটি দুর্বল ব্যবসা নতুন উদ্যোক্তার হাতে নতুন জীবন পেতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পথ যদি অযথা দীর্ঘ হয়, তাহলে সুযোগটি হারিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির এই সময়ে সেই সুযোগ হারানোর মতো বিলাসিতা আমাদের নেই।
তাই ডোমিনেজ স্টিলের ফাইলটি শুধু একটি কোম্পানির ফাইল হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্কারের একটি পরীক্ষাও। বিএসইসি দেখাতে পারে, কীভাবে কঠোর তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত পাশাপাশি চলতে পারে। কীভাবে ব্যাংকের স্বার্থ, সাধারণ বিনিয়োগকারীর অধিকার এবং উদ্যোক্তার বিনিয়োগ পরিকল্পনা একই কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষিত রাখা যায়।
শেষ পর্যন্ত বাজারে আস্থা আসে একটি বিষয় থেকেই, কথা ও কাজের মিল থেকে।
বিএসইসির কাছে তাই বাজারের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। আইন অনুযায়ী যাচাই করুন, প্রয়োজনীয় তথ্য নিন, ঝুঁকি দেখুন, বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা করুন। তারপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিন।
অনুমোদন দিন বা না দিন, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা যেন সিদ্ধান্তের বিকল্প না হয়ে দাঁড়ায়।
ডোমিনেজ-আকিজ চুক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা কি এমন একটি বাজার চাই, যেখানে ভালো বিনিয়োগকারী এগিয়ে আসবেন, দুর্বল কোম্পানি পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারী স্বচ্ছ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন?
উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রকের দরজা হতে হবে একই সঙ্গে সতর্ক ও উন্মুক্ত।
সতর্ক, যাতে অনিয়ম ঢুকতে না পারে।
উন্মুক্ত, যাতে সৎ বিনিয়োগ আটকে না যায়।
এই ভারসাম্যই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।