প্রকাশিত : ১৩:৩৮
১১ আগষ্ট ২০২৬
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ২০ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পিছিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
এর আগে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব না হওয়ায় আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবিরের আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দিতে পারেনি। পরে আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান, প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৭ অক্টোবর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন বিচারক।
ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি করেন। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণের পর বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ মামলাটি আমলে নেন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলায় ২০ আসামির বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক যোগসাজশে’ ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় মামলা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়েরের সুযোগ নেই। তবে মামলাটি দায়েরের সময় মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে, যখন তিনি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
মামলার এজাহারে ১২ নম্বর আসামি হিসেবে মো. শাহাবুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। নামের পাশে বন্ধনীতে লেখা হয়েছে, ‘জে এম সি বিল্ডার্স লিমিটেড কর্তৃক মনোনীত এবং ১ নম্বর ও ৩ নম্বর আসামির যোগসাজসে নির্বাচিত।’
জে এম সি বিল্ডার্স লিমিটেডের প্রতিনিধি হিসেবে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন দুদকের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি ব্যাংকের অডিট কমিটির সদস্যও ছিলেন। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালকের পদ ছেড়ে দেন তিনি।
মামলাটি প্রকাশ্যে আসার পর বাদী আবদুচ ছামাদ জানিয়েছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনই মামলার আসামি। তবে মামলায় যে সময়ের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের ঘটনা। ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হিসেবে তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপ ও এস আলম সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম এবং ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন।
এ ছাড়া আরাস্ত খান, অধ্যাপক মো. নাজমুল হাসান, আবু সাইদ মোহাম্মদ কাশেম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হোসেন, আহসান আলম, ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, শওকত হোসেন, খুরশিদ-উল-আলম, ডা. কাজী শহীদুল আলম, মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মতিন, জামাল মোস্তফা চৌধুরী ও ডা. মো. সিরাজুল করিমও মামলার আসামি।
মামলায় অভিযোগ কী?
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড ইসলামী ব্যাংকের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার কিনেছিল। ব্যাংকের মোট শেয়ারের হিসাবে এর পরিমাণ ৪ দশমিক ৮১৬০ শতাংশ। এসব শেয়ারের মোট মূল্য ছিল ২৫১ কোটি টাকা।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ছিল ৫০ কোটি টাকা। কিন্তু কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৮ লাখ টাকা। ফলে মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার কেনা তার আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ কারণেই আসামিরা ‘পরিকল্পিতভাবে, পরস্পরের যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে’ এই লেনদেন সম্পন্ন করেছেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ২৪টি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি অধিগ্রহণ করেছিল। এসব কোম্পানির অনেকগুলোই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া, অর্থের উৎস এবং কেনাবেচার তারিখ বিশ্লেষণ করে মামলায় বলা হয়েছে, শেয়ার বিক্রি ও কেনার তারিখ একই ছিল। এর ফলে শেয়ার হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্বপরিকল্পিত এবং নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
মামলার আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘এস আলম গ্রুপ, তার মালিক এবং উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি এবং তাদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে এই ব্যাংকের উপর দখল প্রতিষ্ঠার কৌশল অবলম্বন করেছেন এবং তার দায়-দায়িত্বও সম্মিলিতভাবেই তাদের উপর বর্তায়। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অবৈধভাবে নিজেরা লাভবান হয়ে জনগণের অর্থের তসরূপে একই অভিপ্রায়ে ফৌজদারী বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে।’