প্রকাশিত : ১০:১৬
১১ আগষ্ট ২০২৬
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কখনো আস্থার সংকট, কখনো তারল্যসংকট, কখনো অনিয়মের অভিযোগ, আবার কখনো নীতিগত অনিশ্চয়তা বাজারের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অনেকেই বাজার থেকে দূরে সরে গেছেন, নতুন বিনিয়োগকারীদের একটি অংশও সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়েছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক গতি দেখা গেলেও, সেটিকে শুধু সূচকের ওঠানামা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যদি আস্থা ফিরে আসতে শুরু করে, লেনদেনে গতি আসে এবং বাজারের অংশগ্রহণ বাড়ে, তাহলে সেটিকে একটি সম্ভাবনাময় পরিবর্তন হিসেবেই দেখতে হবে। এই পরিবর্তনকে টেকসই করার দায়িত্ব এখন বাজারের সব অংশীজনের।
এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রকের মূল দায়িত্ব বাজারে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো কোম্পানি বা বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিয়ম ভঙ্গ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তবে নিয়ন্ত্রকের কার্যক্রমের লক্ষ্য যেন কেবল জরিমানা আরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
জরিমানা অনিয়ম প্রতিরোধের একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ পুঁজিবাজার গড়ে তোলার একমাত্র উপায় নয়। কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে তার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায় বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোথাও যদি ভুল হয়ে থাকে, সেটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আর যদি ইচ্ছাকৃত অনিয়ম হয়ে থাকে এবং তাতে বিনিয়োগকারীর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অর্থাৎ, শাস্তির পাশাপাশি একটি ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও প্রয়োজন।
পুঁজিবাজারে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলেই বাজার সচল থাকে না। বাজারে প্রয়োজন সক্রিয় বিনিয়োগকারী, ব্রোকার, ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজন। তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। বাজারে তারল্য ও লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও এসব অংশীজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ কারণে বাজারের সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখার পরিবর্তে তাঁদের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নিয়মতান্ত্রিক করার দিকে নজর দেওয়া উচিত। বাজারের কোনো অংশীজনকে বাদ দেওয়া নয়, বরং তাঁরা কীভাবে আরও দায়িত্বশীলভাবে বাজারে ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের অন্যতম লক্ষ্য।
বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রক কঠোর হবে, কিন্তু সেই কঠোরতা হবে পূর্বানুমেয়, স্বচ্ছ ও সবার জন্য সমান। একই সঙ্গে বাজারের অংশীজনদেরও বুঝতে হবে, নিয়ম মেনে ব্যবসা করাই দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের নিজেদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারী যেন মনে করেন, বাজারে তাঁর স্বার্থ সুরক্ষিত। উদ্যোক্তা যেন মনে করেন, পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। আর বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেন জানতে পারে, নিয়ম মেনে কাজ করলে একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় পরিবেশে ব্যবসা করা সম্ভব।
এই জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুঁজিবাজার নিয়ে সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সত্য ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করা। অনিয়ম হলে সেটি তুলে ধরতে হবে, বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটলে সেটিও তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরা প্রয়োজন।
নেতিবাচক খবরের গুরুত্ব আছে, কিন্তু প্রতিটি খবর যদি আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি কোম্পানি বা কয়েকজন বিনিয়োগকারীর ওপর পড়ে না, পুরো বাজারেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই পুঁজিবাজারের সংবাদে উত্তেজনা নয়, তথ্য; গুজব নয়, যাচাই; আতঙ্ক নয়, বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারের দুর্বলতা বা অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। বরং অনুসন্ধানী ও সাহসী সাংবাদিকতা পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে। কিন্তু সেই সাংবাদিকতার ভিত্তি হতে হবে সঠিক তথ্য ও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ।
আমাদের আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। প্রতিষ্ঠানও ভুল করতে পারে। একটি ভুলের কারণে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চিরস্থায়ীভাবে ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করা সমাধান নয়। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে আরও ভালো ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত মূল চিন্তা।
পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে তাই এখন প্রয়োজন সম্মিলিত ইতিবাচক উদ্যোগ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারকে শৃঙ্খলিত করবে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করবে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবে। বিনিয়োগকারীরা গুজবের পরিবর্তে তথ্যের ওপর সিদ্ধান্ত নেবেন। আর সংবাদমাধ্যম সত্য ও ভারসাম্যের সঙ্গে বাজারের খবর তুলে ধরবে।
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার কেবল শেয়ারবাজারের উন্নতি নয়। এর সঙ্গে দেশের শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্নও জড়িত। একটি কার্যকর পুঁজিবাজার ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তাই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি পুরোনো হতাশার চক্রে ফিরে যাব, নাকি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাব?
উত্তরটি দ্বিতীয়টিই হওয়া উচিত।
বাজারে অনিয়ম থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু সেই ব্যবস্থা যেন বাজারের আস্থা নষ্ট না করে। ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে, কিন্তু ইচ্ছাকৃত অনিয়মের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া যাবে না। সমালোচনা করতে হবে, কিন্তু সমালোচনার সঙ্গে সমাধানের পথও দেখাতে হবে।
পুঁজিবাজার কারও একার সম্পদ নয়। এটি বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, নিয়ন্ত্রক, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত দায়িত্বের জায়গা।
এখন প্রয়োজন ভয় নয়, আস্থা। বিভাজন নয়, সহযোগিতা। নেতিবাচকতা নয়, তথ্যভিত্তিক ইতিবাচক উদ্যোগ।
কারণ একটি বাজার শুধু সূচকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। বাজার দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং ধরে রাখাই এখন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।