প্রকাশিত :  ০৭:২০
১১ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৭:৩৪
১১ আগষ্ট ২০২৬

পুঁজিবাজারে বড় সংস্কার, বাড়ছে মার্জিন ঋণের সুযোগ

‘এ’ ও ‘বি’ শ্রেণির সব শেয়ারে ঋণ, ১:১ অনুপাতে মার্জিন সুবিধার প্রস্তাব

পুঁজিবাজারে বড় সংস্কার, বাড়ছে মার্জিন ঋণের সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়ানো ও লেনদেনে গতি আনতে মার্জিন ঋণনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে তালিকাভুক্ত ‘এ’ ও ‘বি’ শ্রেণির সব শেয়ারে মার্জিন ঋণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ‘বি’ শ্রেণির কোম্পানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার শর্ত এবং ফ্রি-ফ্লোট মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকার শর্ত তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাজারের মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও বিবেচনায় না নিয়ে ১:১ অনুপাতে মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী নিজের মূলধনের সমপরিমাণ ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

ডিএসইর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থনীতিকে বলেন, “প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর বড় অংশই বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে খসড়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো শর্তকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।”

বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে কমিশনের ১,০২০তম সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া সংশোধনী নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে গেজেট আকারে প্রকাশিত মার্জিন বিধিমালা নিয়ে বিনিয়োগকারী ও বাজারের বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও আপত্তি পর্যালোচনার পর বিধিমালাটি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয় কমিশন। বিএসইসির ভাষ্য, প্রস্তাবিত সংশোধনীর উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করা, বাজারে তারল্য বাড়ানো এবং লেনদেনে গতি আনা।

‘এ’ ও ‘বি’ শ্রেণির সব শেয়ারে মার্জিন ঋণ

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তালিকাভুক্ত ‘এ’ ও ‘বি’ শ্রেণির সব শেয়ারে মার্জিন ঋণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে ‘বি’ শ্রেণির কোনো কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ পেতে অন্তত ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার শর্ত রয়েছে।

নতুন প্রস্তাবে এই শর্ত বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো কোম্পানির ফ্রি-ফ্লোট মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা হতে হবে, এমন শর্তও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব শর্ত শিথিল হলে ছোট ও মাঝারি মূলধনের কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। এতে এসব শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও লেনদেন বাড়তে পারে।

১:১ অনুপাতে মার্জিন ঋণের প্রস্তাব

মার্জিন ঋণের অনুপাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় বাজারের সামগ্রিক পিই অনুপাত বাড়লে মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:০.৫ বা ১:০.২৫ পর্যন্ত কমে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নতুন খসড়ায় বাজারের পিই অনুপাত বিবেচনায় না নিয়ে ১:১ অনুপাতে মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর অর্থ হলো, একজন বিনিয়োগকারী নিজের ১০ লাখ টাকা মূলধনের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা মার্জিন ঋণ নিতে পারবেন, যদি অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়।

সাধারণ সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে মার্জিন সুবিধার জন্য সর্বোচ্চ পিই অনুপাত ৩০ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পি/বি রেশিও

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ক্ষেত্রে পিই অনুপাতের পরিবর্তে মূল্য-বই অনুপাত বা পি/বি রেশিও বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ ৩ পি/বি রেশিও থাকা শেয়ারকে মার্জিন সুবিধার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্যায়নে পি/বি রেশিও ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে।

মার্জিন কলের সীমা কমানোর প্রস্তাব

বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে কোনো বিনিয়োগকারীর ইকুইটি ৭৫ শতাংশে নেমে এলে মার্জিন কল দেওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে এই সীমা ৭০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

তবে ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংকের বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার বিধান বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিবছর ম্যানুয়ালি মার্জিন চুক্তি নবায়নের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় নবায়নের সুযোগ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী ও গৃহিণীদের মার্জিন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি বিও হিসাবে সিকিউরিটিজ ধারণের ন্যূনতম অর্থের সীমা ৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্রোকারদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে

মার্জিন ঋণের জোগান বাড়াতে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে পরিশোধিত মূলধন বা নিট সম্পদের সর্বোচ্চ তিন গুণ পর্যন্ত মার্জিন ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে এই সীমা পাঁচ গুণ করার কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে কোনো একটি শেয়ারে ঋণের সর্বোচ্চ এক্সপোজার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহও বাড়তে পারে।

স্ক্রিপ নেটিং চালুর উদ্যোগ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ‘স্ক্রিপ নেটিং’ সুবিধা চালুর নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে বিএসইসি।

এই সুবিধা চালু হলে একজন বিনিয়োগকারী একই কার্যদিবসে একটি নির্দিষ্ট শেয়ার একাধিকবার কেনাবেচা করতে পারবেন। এতে লেনদেনের গতি ও বাজারের তারল্য বাড়তে পারে।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদারের বক্তব্য অনুযায়ী, দিনের শুরুতে কেনাকাটার চাপ থাকলেও দিনের শেষভাগে বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্ক্রিপ নেটিং বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

তারল্য বাড়বে, ঝুঁকিও বাড়তে পারে

মার্জিন ঋণের সুযোগ বাড়লে বাজারে তারল্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে দুর্বল মৌলভিত্তির কোনো কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হলে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি এবং পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের দরপতনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

একজন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলেন, “মার্জিন ঋণের সুযোগ বাড়ানো বাজারের তারল্যের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে ঋণের অর্থ যেন দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারে কৃত্রিম দরবৃদ্ধির হাতিয়ার না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।”

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মার্জিন ঋণের সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি অস্বাভাবিক লেনদেন, বাজার কারসাজি ও কৃত্রিম দরবৃদ্ধি শনাক্ত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা, করপোরেট সুশাসন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে প্রস্তাবিত সংস্কারের সুফল আরও বাড়তে পারে।

এখনো চূড়ান্ত নয়

বিএসইসির নীতিগতভাবে অনুমোদিত খসড়া সংশোধনী এখন সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের মতামতের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। প্রাপ্ত মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

তাই প্রস্তাবিত সব শর্ত শেষ পর্যন্ত একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সম্প্রসারণ এবং লেনদেনে গতি আনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল নিশ্চিত করতে হলে তারল্যের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা, স্বচ্ছতা, সুশাসন ও কার্যকর বাজার তদারকির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর