প্রকাশিত :  ১৬:৩৩
০৭ আগষ্ট ২০২৬

আস্থার বাজার, আতঙ্কের নয়: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ কার হাতে?

আস্থার বাজার, আতঙ্কের নয়: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ কার হাতে?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

একটি দেশের পুঁজিবাজার কেবল শুষ্ক গাণিতিক বা সূচকের খেলা নয়। এটি মানুষের স্বপ্ন, আস্থা, সম্মিলিত আশা এবং জাতীয় অর্থনীতির গতিপথের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন শেয়ারের দর ওঠানামা করে, সূচকের রেখা ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী হয়, হাতবদল হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু দৃশ্যমান এই চঞ্চলতার অন্তরালে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে মানুষের মনস্তত্ত্ব। বিনিয়োগকারীর মন যদি স্থির ও বিচক্ষণ থাকে, তবে ক্ষণিকের ঝড় কাটিয়ে বাজার একসময় স্বাভাবিক স্থিতিশীলতায় ফিরে আসে। পক্ষান্তরে সেই মন যদি গুজব, ভীতি ও অনিশ্চয়তার কাছে নতিস্বীকার করে, তবে পরম সম্ভাবনাময় বাজারও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে কেন্দ্র করে বহুবিধ আলোচনা-সমালোচনা নিত্যদিনের বিষয়। কখনো সূচকের উল্লম্ফন সাধারণের মাঝে আশার প্রদীপ জ্বালায়, আবার কখনো কয়েকদিনের টানা পতনে চারপাশে ঘনিয়ে আসে তীব্র হতাশা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে নানা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। কেউ আক্ষেপ করে বলেন, বাজার একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল; কেউ দাবি করেন, সবকিছু অদৃশ্য সুতোয় নিয়ন্ত্রিত; আবার কেউ বা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। বিপরীতমুখী এই মতের আবর্তে একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে: একটি পুঁজিবাজারকে সত্যিকার অর্থে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় কে?

এই অনুসন্ধানের গভীরে প্রবেশ করতে হলে প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। সাধারণের ধারণা, পুঁজিবাজারের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয় কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা বিশাল মূলধনের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরলরেখায় চলে না। একটি বাজারের মূল প্রাণশক্তি গড়ে ওঠে হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারীর সম্মিলিত মানসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের শক্তিতে। প্রতিটি ক্রয়-বিক্রয়, ধৈর্যশীল অপেক্ষা এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই গড়ে তোলে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক চরিত্র।

এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে আমরা অনেক সময়ই উপেক্ষা করি। বাজারে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই শুরু হয় দোষারোপের সংস্কৃতি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাযোগ্য দায়িত্ব পালন করছে কি না, স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকা কী কিংবা ব্রোকারেজ হাউসগুলো ঠিক কী করছে, এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, একটি সুস্থ ও শৃঙ্খলিত পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে সুশাসন, শক্তিশালী নীতিমালা এবং কার্যকর তদারকির কোনো বিকল্প নেই। তবে পাশাপাশি এটিও সত্য যে, প্রতিটি বিনিয়োগের অন্তিম সিদ্ধান্ত নেন একজন সচেতন ব্যক্তি। সেই ব্যক্তি যদি সঠিক বিশ্লেষণের বদলে গুজবকে আঁকড়ে ধরেন এবং যুক্তির স্থলাভিষিক্ত করেন ক্ষণিকের আবেগ, তবে সুকঠিন কোনো নীতিমালাই বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে পারবে না।

শেয়ারবাজারে এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক খেলা প্রতিনিয়ত বিরাজ করে। মূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখলে অনেকেই বিচার-বিবেচনা না করে শেয়ার কেনার হিড়িকে মেতে ওঠেন; আবার সামান্য দরপতন হলেই চরম আতঙ্কে বিক্রি করে বেরিয়ে যেতে চান। মনস্তাত্ত্বিক অর্থনীতির গবেষকেরা বহু আগেই মানুষের এই আচরণ ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষের সব সিদ্ধান্ত সবসময় যুক্তিনির্ভর হয় না। ভয় এবং লোভ অনেক সময়ই শৃঙ্খলিত চিন্তা ও যুক্তিকে গ্রাস করে নেয়। আর পুঁজিবাজারে এই দুটি মানবিক আবেগই সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও এই আন্তর্জাতিক মনস্তাত্ত্বিক নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। বহুবার দেখা গেছে, কোম্পানির ব্যবসায়িক ভিত্তির কোনো মৌলিক পরিবর্তন না হওয়া সত্ত্বেও নিছক কাল্পনিক গুজবে শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, চমৎকার আর্থিক ফলাফল এবং লভ্যাংশ ঘোষণার পরও বহু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পায়নি; কারণ, তৎকালীন বাজারজুড়ে বিরাজ করছিল নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক আবহ। অর্থাৎ, বাজার অনেক সময় তথ্যের চেয়ে অনুভূতির অনুগামী হতে পছন্দ করে।

এই অনুভূতির নেপথ্যে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে গুজব। গুজবের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় কিংবা সুনির্দিষ্ট উৎস থাকে না। কখনো সামাজিক মাধ্যমের কোনো অনিশ্চিত মন্তব্য, কখনো একটি বেনামী অডিও বার্তা, আবার কখনো লেনদেন কক্ষের অলিন্দে ভাসমান ফিসফাস মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মানুষের মাঝে। প্রমাণের সত্যতা কিংবা তথ্যের উৎস যাচাই করার অবকাশ কেউ পান না। অথচ সেই ভিত্তিহীন আলাপের ওপর নির্ভর করেই মানুষ তাঁদের সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় বাজি ধরে বসেন।

এটি কেবল একটি আর্থিক ভুল নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ট্র্যাজেডি। পুঁজিবাজারে নিয়োজিত অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন, শেষ বয়সের অবলম্বন কিংবা কঠোর পরিশ্রমের সঞ্চিত ফসল। ফলে গুজবের ওপর ভর করে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত চোখের পলকে বহু পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার ভিত কাঁপিয়ে দেয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। বিশ্বের যেসকল দেশে পুঁজিবাজার পরিণত ও শক্তিশালী, সেখানকার বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে অভ্যস্ত। তাঁরা প্রতিদিনের শেয়ার দর ওঠানামা দেখে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেন না। বরং তাঁরা কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেল, মুনাফা অর্জনের ধারাবাহিকতা, সুশাসন, ভবিষ্যতের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা এবং জাতীয় অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে তদারকি করেন। এই বিনিয়োগ সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি; এটি শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের চর্চার সুফল।

বাংলাদেশেও এই সুশীল বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব। এর জন্য একদিকে যেমন প্রয়োজন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর ও নিরপেক্ষ তদারকি, অন্যদিকে প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষার বিস্তার। শেয়ার কেনা মানে লটারির টিকিট কাটা নয়; এটি একটি কার্যকর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানা, শিল্পখাতকে বোঝা, আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা এবং নিজের ঝুঁকিসহনশীলতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক।

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের অভাব নেই, বরং অতিরিক্ত তথ্যের ভিড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগই বেশি। সত্য ও অসত্যের মেলবন্ধনে তৈরি হয় কুয়াশা। এই জটিল পরিস্থিতিতে একজন সচেতন বিনিয়োগকারীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঢাল হলো সঠিক তথ্য যাচাইয়ের মানসিকতা। যিনি নিজে পড়েন, অনুধাবন করেন এবং নিজস্ব বিশ্লেষণে ভরসা রাখেন, তিনি সাময়িক অস্থিরতায় পথ হারান না। পক্ষান্তরে যিনি অন্যের পরামর্শে অন্ধভাবে চালিত হন, তাঁর পুঁজির ভাগ্যও অন্যের ইচ্ছার ওপর বন্দি হয়ে থাকে।

পুঁজিবাজারের ইতিহাস আমাদের এক অবিনশ্বর শিক্ষা দেয়: বাজার কেবল সূচকের গাণিতিক হিসাব নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক বিশ্বাসের ইতিহাস। সেই বিশ্বাস যেমন একদিনে নির্মিত হয় না, তেমনি একদিনে তা ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু সমাজ যখন বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে অবাস্তব গুজবকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে, তখন আস্থার সেই মজবুত ভিত নড়বড়ে হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে কেবল হতাশা নয়, বরং প্রবৃদ্ধির প্রচুর ইতিবাচক উপাদান উপস্থিত। দেশের অর্থনীতিতে নতুন নতুন খাতের বিকাশ ঘটছে; অবকাঠামো, প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, আর্থিক সেবা ও রপ্তানিমুখী খাতে উন্মোচিত হচ্ছে নিত্যনতুন দিগন্ত। জাতীয় প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক প্রতিফলন পুঁজিবাজারেও দেখা যাওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাজারের প্রতিটি অংশীজনকে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পুঁজিবাজারকে প্রায়শই অর্থনীতির আয়না হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেই আয়নায় প্রতিফলিত হয় একটি দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কিন্তু আয়নাটি যদি বারবার গুজবের ধুলায় আচ্ছন্ন হয়, তবে মূল প্রতিচ্ছবি অস্পষ্ট হতে বাধ্য। আমাদের বাজারেও এই দৃশ্য বহুবার দেখা গেছে। এখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে গুঞ্জন দ্রুত ছড়ায়, গভীর বিশ্লেষণের স্থান দখল করে হুজুগ, আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভের চঞ্চলতা বেশি প্রাধান্য পায়।

একটি সুস্থ ও পরিণত পুঁজিবাজারকে কেবল দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তার প্রকৃত পরিমাপক হলো বিনিয়োগকারীর যৌক্তিক আচরণ, ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের অবিচল আস্থা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা। বাজারের আসল সম্পদ মূলধন নয়, আস্থা। মূলধন হারিয়ে গেলে পুনরায় উপার্জন করা যায়, কিন্তু আস্থার সংকট তৈরি হলে তা পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর কেটে যায়।

আমাদের দেশে শেয়ারবাজারে সামান্য সংশোধন এলেই চারপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন, যেন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের যেকোনো পরিণত পুঁজিবাজারে মূল্য সংশোধন একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া। কোনো বাজারই অবিরত ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে না; প্রবৃদ্ধির মাঝে মাঝে স্থিতি ও সংশোধন বাজারকে পরিপক্কতা দেয়। এই স্বাভাবিক চক্রকে সংকট মনে করার মানসিকতাই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়।

এখানে বিনিয়োগকারীর মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মসংযম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যিনি প্রতিদিনের দরপতনকে নিজের Futures বা ভবিষ্যতের একমাত্র নির্ধারক ভাবেন, তিনি সামান্য দোলাচলেই আতঙ্কিত হবেন। কিন্তু যিনি কোনো কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর ভরসা রেখে বিনিয়োগ করেছেন, তিনি সাময়িক এই পতনকে বাজারের স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করার ধীরতা দেখাতে পারবেন।

ব্রোকারেজ হাউসগুলোর পরামর্শ অনুসরণের বিষয়টি প্রায়শই আলোচনায় আসে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তারা প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদান করে, তথ্য সরবরাহ করে এবং লেনদেন সহজতর করে তোলে। তাদের সহযোগিতামূলক ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে বিনিয়োগের চূড়ান্ত দায়িত্ব একান্তই ব্যক্তিগত। কোনো পরামর্শকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। পরামর্শ পর্যালোচনা করা যায়, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ কখনোই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হতে পারে না। কারণ লাভের আনন্দ যেমন ব্যক্তিগত, ক্ষতির ভারও শেষ পর্যন্ত এককভাবেই বহন করতে হয়।

বাজারের একটি প্রচলিত ভুল ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়; যে শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ে, সবাই সেটির পেছনে ছুটতে থাকেন। আবার দাম কমতে থাকলে চরম আতঙ্কে তা বিক্রি করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অথচ বিনিয়োগের ইতিহাস প্রমাণ করে, জনস্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় নেওয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত সাফল্য এনে দেয়। পুঁজিবাজারে আসল লড়াই অন্য কারো সাথে নয়, বরং নিজের অনিয়ন্ত্রিত আবেগের সাথে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আর্থিক সচেতনতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক নতুন বিনিয়োগকারী কোম্পানির মৌলভিত্তি, ক্যাশ ফ্লো, পিই রেশিও, আয়-ব্যয়ের হিসাব কিংবা করপোরেট সুশাসন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না নিয়েই বাজারে প্রবেশ করেন। ফলে সাময়িক অস্থিরতাতেই তাঁরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অথচ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ এক সূক্ষ্ম শিল্প ও দক্ষতা, যা অর্জন করতে সময়, অধ্যয়ন এবং চর্চার প্রয়োজন হয়।

উন্নত বিশ্বের বাজারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার সচেতন বিনিয়োগকারীরা নিছক শেয়ারের দাম পরিমাপ করেন না, বরং ব্যবসার মান বিচার করেন। তাঁরা একটি কোম্পানির আগামী পাঁচ বা দশ বছরের রূপরেখা অনুধাবন করার চেষ্টা করেন। কারণ ভালো ব্যবসায়িক ভিত্তির আসল সুফল পেতে ধৈর্যের বিকল্প নেই। ধৈর্যই সেখানে সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ।

বাংলাদেশেও এমন বহু সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বছরের পর বছর ব্যবসায়িক দক্ষতা দেখিয়ে নিজেদের সম্প্রসারিত করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই সকল সুশাসিত কোম্পানিকে মূল্যায়ন করতে হলে সাময়িক সূচকের বাইরে গিয়ে তাদের মূল সক্ষমতা বোঝার দূরদর্শিতা থাকতে হবে।

একই সাথে বাজারের সব অংশীজনের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক হতে হবে, নিয়মিত নির্ভুল প্রতিবেদন প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রযুক্তিবান্ধব ও আধুনিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। আর গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে ভুয়া গুজবের বদলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও গভীর বিশ্লেষণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।

তবে সকল ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী। তাঁদের সিদ্ধান্ত, ধৈর্য ও সচেতনতাই একটি সুস্থ বাজারের প্রধান স্থপতি। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও ব্যক্তিগত সচেতনতার যুগলবন্দিতেই পুঁজিবাজারের প্রকৃত গতি নির্ধারিত হয়।

পুঁজিবাজারের শক্তি কেবল মূলধনের অংকে মাপা যায় না; তার আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে মানুষের সম্মিলিত আস্থায়। আস্থা থাকলে প্রতিটি সংকট কাটিয়ে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহিত হয়, নতুন মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় এবং জাতীয় অর্থনীতি পায় নতুন গতি। পক্ষান্তরে আস্থার সংকট তৈরি হলে পরম সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানও তার ন্যায্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়।

তাই এখন সময় এসেছে আক্ষেপ ও দোষারোপের নিষ্ফল সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি কখনো বাজারকে শক্তিশালী করে না; বাজারকে সমৃদ্ধ করে সততা, আর্থিক শিক্ষা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। যদি আমরা আতঙ্ককে দূরে ঠেলে আস্থাকে গ্রহণ করতে পারি, নিছক গুজবের বদলে সত্য তথ্যকে অনুসরণ করি এবং ক্ষণিকের চঞ্চলতার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি মান সৃষ্টিকে প্রাধান্য দিই, তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কেবল একটি আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্র থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি।

গাছের আসল শক্তি যেমন তার দৃশ্যমান ডালে নয়, মাটির গভীরে প্রোথিত শিকড়ে থাকে; তীব্র ঝড়ে ডালপালা ভাঙতে পারে, পাতা ঝরে যেতে পারে, কিন্তু শিকড় যদি অক্ষত ও সুগঠিত থাকে, তবে নতুন ঋতুতে সেই বৃক্ষ আবারো নতুন পত্রে ও পুষ্পে বিকশিত হয়। আমাদের পুঁজিবাজারও ঠিক তেমনই। প্রতিদিনের সূচক ও লেনদেনের অংক এর দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ মাত্র; কিন্তু এর আসল শক্তি নিহিত রয়েছে বিনিয়োগকারীর দৃঢ় আস্থা, বাজারের ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার গভীরে। সেই গভীরে আলো ফুটলেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পাবে তার কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব ও সাফল্য।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর