প্রকাশিত :  ১১:০০
০৭ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৪
০৭ আগষ্ট ২০২৬

নোনা হাওয়া

নোনা হাওয়া

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

কক্সবাজারের উত্তর কলাতলী জেলেপল্লীর বাতাসে চিরকালই এক অদ্ভুত ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে বেড়ায়। সেই গন্ধে মিশে থাকে সাগরের শুকানো নোনা জল, পচা গলদা ও বাগদার আঁশটে টান এবং বহু যুগের জমানো কুঁড়েঘরের রুদ্ধ নিঃশ্বাসের আর্দ্রতা। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা যখন তটের বালুচরে এসে সজোরে আছড়ে পড়ে, তখন ফেনিল ক্ষোভের সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে বাজে এই জনপদের হাজারো মানুষের গোপন দীর্ঘশ্বাস।

সমুদ্রের একেবারে কোলঘেঁষে, যেখানে জোয়ারের নোনা জল এসে মাঝে মাঝে ভিটে ছুঁয়ে যায়, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর। বাঁশের বাতা, ছেঁড়া প্লাস্টিকের চট আর পুরোনো ছনের বেড়া দিয়ে বানানো সেই ঘরের টিনের চালে অজস্র সূক্ষ্ম ছিদ্র। দিনের বেলা সেই সব ছিদ্র দিয়ে সূর্যের প্রখর রোদের বল্লম মেঝের ভেজা বালুতে এসে বিঁধে, আর রাতের বেলা অন্ধকারের বুক চিরে আকাশের নিঃসঙ্গ তারাগুলো ঘরে আলো ঝরায়।

এই আলো-আঁধারির ভঙ্গুর আশ্রয়েই বসবাস চব্বিশ বছর বয়সী তরুণী মোমেনা এবং তার আট-নয় বছরের ছেলে মোমেনের। মোমেনা একসময় এই কলাতলী উপকূলে অনন্য সুন্দরী নারী হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু অকালবিয়ে, অভাবের নির্মম ঘর্ষণ এবং সমুদ্রের নোনা বাতাসের রুক্ষতায় তার সেই দিনগুলো হারিয়ে গেছে। তার চোখের কোলে এখন গভীর কালচে ছায়া, গাল দুটো সামান্য বসে গেছে। অভাব আর অনাহারের তাড়নায় রূপের ঔজ্জ্বল্য মলিন হলেও, একধরনের নিষ্পাপ ও করুণ সৌন্দর্য এখনও তার ফ্যাকাশে চেহারায় লেগে আছে। আর এই রূপই যেন এই পিতৃহীন কুঁড়েঘরের জন্য এক অলিখিত অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তিন বছর আগের এক অমাবস্যার রাতে মোমেনার স্বামী আলম ট্রলারে করে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সামুদ্রিক ঝড়ের ঘূর্ণিপাকে পড়ে কত জেলে হারিয়ে যায়, আলমও তেমনি নিখোঁজদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। কিন্তু মোমেনা মনের গহীনে এক অন্ধ বিশ্বাস লালন করে চলেছে, আলম একদিন ঠিক ফিরে আসবে। সাগরের প্রতিটি ঢেউ যখন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, মোমেনা চমকে উঠে তটরেখার দিকে তাকায়। সে ভাবে, এই বুঝি আলম ভিজে কাপড় নিয়ে ঘরে ফিরে এল। এই অপেক্ষাকেই বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে সে সন্তান মোমেনকে নিয়ে বেঁচে আছে।

কিন্তু অরক্ষিত যুবতী এবং পরম সুন্দরী হওয়ায় সমাজের কুনজর তার ওপর থেকে সরেনি। এলাকার প্রভাবশালী ফড়িয়া, স্থানীয় শুঁটকি মহালের দালাল আর মাতব্বরদের লালসাঘন দৃষ্টি প্রতিনিয়ত মোমেনার ওপর ছায়া ফেলে। নানান প্রলোভন, টাকার গরম আর বিয়ের মোড়কে আসে কুপ্রস্তাব। কিন্তু মোমেনা পাথর হয়ে থাকে। স্বামীর রেখে যাওয়া সতীত্ব ও স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করে সে কোনো প্রলোভনে পা দেয় না। তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা এখন তার সন্তান মোমেন।

মোমেন বয়স অনুযায়ী বেশ চঞ্চল প্রকৃতির বালক, তবে তার মনের ভেতরটা এক নিঝুম দীঘি। সমুদ্রের পাড়ে একাকী দৌড়ানো, গাংচিলের পেছনে ধাওয়া করা কিংবা চরে পড়ে থাকা ঝিনুক কুড়ানোতেই তার যত আনন্দ। তবে ঘরের ভেতরে ঢুকলেই সে এক শান্ত, গম্ভীর বয়স্ক শিশুর মতো মায়ের মুখপানে চেয়ে থাকে। সে স্থানীয় এক এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। পড়ালেখায় তার মাথা দারুণ তীক্ষ্ণ। সামান্য আলোতেই সে স্কুলের পড়া শেষ করে ফেলে। এই দারিদ্র্যপীড়িত শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য এনজিওর পক্ষ থেকে প্রতিদিন বিনামূল্যে সেদ্ধ ডিম, কলা, রুটি ও প্যাকেটের দুধ দেওয়া হয়। ক্ষুধা সামলানোর এই সামান্য খাদ্য সাহায্যই গরিবের মেধাবী শিশুদের অপুষ্টির হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করে চলেছে।

কলাতলী জেলেপল্লীর শত শত পরিবারের মতো মোমেনা ও তার ছেলের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন ছিল সাগরের বাগদা ও গলদা চিংড়ির পোনা আহরণ করা। প্রতিদিন ভোরে ভাটার টান ধরলে মশারি জাল কিংবা বিহিন্দি জাল নিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুরা সাগরের হাঁটু পানিতে নেমে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোনা জলে দাঁড়িয়ে জাল টেনে দিনশেষে মাত্র কয়েকশো চিংড়ি পোনা পাওয়া যায়। ফড়িয়াদের কাছে এগুলো বিক্রি করে যা মেলে, তা দিয়ে চাল-ডাল কেনাই দুষ্কর হয়ে পড়ে।

বাস্তবতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ২০০১ সালের মৎস্য পোনা আহরণ আইন অনুযায়ী সমুদ্র উপকূল থেকে চিংড়ি পোনা ধরা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ একটি মাত্র বাগদা বা গলদার পোনা ধরতে গিয়ে মশারি জালের সূক্ষ্ম বুননে ধরা পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের আরও ২৫ থেকে ৭০টি অন্যান্য প্রজাতির মূল্যবান মাছ ও জলজ প্রাণীর পোনা ও লার্ভা। কোস্টগার্ড কিংবা মৎস্য বিভাগ প্রায়শই অভিযান চালায়, জাল পুড়িয়ে দেয়, জরিমানা করে। কিন্তু ক্ষুধার কাছে তো আইনের পাতাগুলো বড় মিছে। কলাতলী থেকে শুরু করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষগুলো প্রাণের মায়াকে তুচ্ছ করে সাগরে নামে।

মোমেনাদের ঘরেও এই একই সমীকরণ। সাগরে নেমে পোনা ধরতে পারলে হাঁড়িতে চাল ফোটে, চুলায় আগুন জ্বলে; অন্যথায় জঠরজ্বালা আর অনাহারই হয় রাতের একমাত্র সঙ্গী।

কিন্তু শেষ তিন দিন ধরে মোমেনাদের জরাজীর্ণ চালার নিচে কোনো উনুনে আগুন জ্বলেনি। তিন দিন ধরে মোমেনা তীব্র জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে কাঁথা গায়ে দিয়ে পড়ে আছে। সাগরের কালচে নোনা বাতাসে নেমে পোনা ধরার মতো ন্যূনতম শারীরিক শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, মাথা তুলতে গেলে পুরো পৃথিবী যেন চক্কর দিয়ে ওঠে।

তিন দিন ধরে কাজ নেই, তাই ঘরে এক দানা চালও নেই। প্রথম দুই দিন পাশের ঘরের অন্যান্য দুস্থ জেলেরাও তাদের নিজেদের সামান্য খাবার থেকে এক বাটি জাউ ভাত বা পান্তা ভাত দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই দরিদ্র পল্লীতে প্রতিনিয়ত অভাবের কামড় এতটাই নির্মম যে, নিজের পেটে টান পড়লে অন্যের দিকে হাত বাড়ানোর ক্ষমতা কারও থাকে না। আজ সকাল থেকে সারাদিন গড়িয়ে সাঁঝ নেমে এলেও পাশের কোনো ঘর থেকেই এক দানা খাবার আসেনি। অনাহারের হিংস্র কামড় মা ও ছেলের পেটকে দোমড়ানো-মোচড়ানো শুরু করেছে।

আগামীকাল পবিত্র শবে বরাত, মহিমান্বিত ক্ষমা ও ভাগ্য নির্ধারণের রজনী। মুসলিম সমাজে এই রাতকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ থাকে, ভালো-মন্দ রান্নার প্রস্তুতি চলে। কিন্তু জেলেপল্লীর এই জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরটিতে অন্ধকার যেন আরও ভারী হয়ে জমে উঠছিল।

মোমেনাদের কুঁড়েঘরের ঠিক গা ঘেঁষেই একটি ছোট বাঁশের ছাপড়া। সেখানে থাকেন এক অশীতিপর বৃদ্ধা। এই বিশাল পৃথিবীতে তাঁর নিজের বলতে আর কেউ বেঁচে নেই। স্বামী ও সন্তান বহু আগেই সাগরের পেটে চলে গেছে। লাঠিতে ভর দিয়ে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে তিনি কোনোমতে প্রাণ ধারণ করেন। বার্ধক্যের কারণে চোখে ছানি পড়েছে, এখন কেবল আলোর আবছা ছায়া আর ঝাপসা রূপ দেখতে পান। আজ সারাদিন তিনি ভিক্ষায় বের হতে পারেননি, শরীর চলছে না। ঘরে একবিন্দু খাবার না থাকায় ক্ষুধার চরম যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি বাঁশের বেড়ায় মাথা ঠুকে বিলাপ করছিলেন।

অন্ধকার ছনের ঘরে বসে বৃদ্ধা আকাশের দিকে ঝাপসা চোখ দুটো তুলে তীব্র ক্ষোভে ও আর্তনাদে বলে উঠলেন,

“ও আল্লাহ! তুমি কি চোখে কিচ্ছু দ্যাখো না? আমারে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন? দুনিয়ায় কত তাজা মানুষ মরে যায়, আমারে কেন উঠায় নাও না? আমি আর ক্ষুধা সহ্য করতে পারতেছি না আল্লাহ... আমারে মরণ দাও!”

অনাহারের চোটে এক অসহায় বৃদ্ধার এমন মর্মান্তিক ও করুণ আক্ষেপ পাশের ঘরে শুয়ে শুনছিল ছোট মোমেন। অবুঝ ও সরল হৃদয় শিশুটি এই কথা শুনে থমকে যায়। আল্লাহকে এভাবে আক্ষেপ করতে শুনে তার মনে ভীতি ও বিস্ময় জেগে ওঠে। সে অসুস্থ মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “মা! পাশের ঘরের বুড়ি দাদি আল্লাহরে এত কথা বলতেছে কেন? আল্লাহ কি আমাদের কষ্ট দ্যাখে না?”

জ্বরে কঁকিয়ে ওঠা মোমেনা ফ্যাকাশে হাতটি বাড়িয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে। কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলল, “ছিঃ বাবা! আল্লাহরে গালি দিতে নাই, পাপ হয়। বুড়ি মানুষ, ক্ষুধার কষ্টে মাথা ঠিক নাই। কালকে যে শবে বরাত বাবা, পবিত্র রাত। কাল রাতে পরওয়ারদেগার আল্লাহ তাআলা নিজে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তিনি বান্দার সব আকুতি শোনেন, দুঃখ-কষ্ট দূর করেন আর রিজিক বাড়িয়ে দেন।”

অসুস্থ মায়ের মুখের এই বাণী মোমেনের শিশুমনে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করল। তার নিষ্পাপ মনে জন্ম নিল এক পরম বিশ্বাস। সে মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগল, আল্লাহ যদি কাল রাতে এত কাছে প্রথম আসমানে নেমে আসেন, তবে তাঁর কাছে নিজের কষ্টের কথা পৌঁছানোর একটা পথ তো অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে!

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মোমেনের ক্ষুধার তীব্রতা আর সহ্যসীমার মধ্যে রইল না। তিন দিন ধরে পেট আধপেটা, আর আজ সারাদিন পেটে এক ফোঁটা পানি ছাড়া কিছুই পড়েনি। সে মায়ের ফ্যাকাশে গায়ে হাত বুলিয়ে কেঁদে উঠে বলল, “মা! আমার খুব ক্ষুধা লাগছে... ঘরে কি একটা টাকাও নাই? সামান্য কিছু কিনে খাইতাম...”

মোমেনা চোখ মেলে ছেলের আর্তনাদ দেখে বুক ফেটে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মোচড়ানো শরীরে কষ্ট সহ্য করে ঘরের কোণে অন্ধকার কুলুঙ্গির দিকে আঙুল নির্দেশ করল। সেখানে একটি পুরোনো মাটির পাতিল উল্টানো অবস্থায় রাখা ছিল।

মোমেনা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “বাবাজান... ওই পাতিলটার নিচে কয়েকটা টাকা আছিল... হয়তো ৫০ টাকার মতো হবে। নিয়ে যা বাবা... কিসব কিনে খাইয়া আয়।”

এই ৫০ টাকাই ছিল মা ও ছেলের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। চরম বিপদের দিনে ওষুধ বা একবেলার চাল কেনার জন্য মোমেনা আঁচলে বেঁধে এই টাকা রেখেছিল। মোমেন দৌড়ে গিয়ে মাটির পাতিল সরিয়ে দুমড়ানো ৫০ টাকার নোটটি হাতে তুলে নেয়।

টাকাটা হাতে পেয়েই মোমেনা ভেবেছিল ছেলে হয়তো পাশের মুদির দোকান থেকে বিস্কুট বা মুড়ি কিনে এনে নিজের জঠরজ্বালা মেটাবি। কিন্তু মোমেনের মাথায় তখন অন্য এক অবোধ ও নির্দোষ শিশুর কল্পনার জগৎ ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে দোকানে গিয়ে কোনো খাবার কিনল না।

মোমেন সোজা চলে গেল জেলেপল্লীর মোড়ের দোকানটিতে। সেখান থেকে ১০ টাকা দিয়ে সুতোর দুটি গোলা এবং ২০ টাকা দিয়ে লাল-নীল রঙের একটি পাতলা কাগজের ঘুড়ি কিনল। দোকানদার অবাক হয়ে তাকালেও মোমেন কোনো কথা না বলে বাকি ২০ টাকা পকেটে গুঁজে দৌড়ে চলে গেল ফাঁকা ও নির্জন সমুদ্রসৈকতের দিকে।

এনজিও স্কুলে মাস্টার মশাই তাকে পেন্সিল দিয়ে কাঁচা হাতে বাংলা অক্ষর লেখা শিখিয়েছিলেন। মোমেন বালুর ওপর বসে পকেটে থাকা পেন্সিলের টুকরোটি বের করল। তারপর অতি যত্ন করে, পরম আকুতি দিয়ে ঘুড়ির সেই লাল-নীল পাতলা কাগজের বুকে তার জীবনের প্রথম ও শেষ চিঠিটি লিখল:

“আল্লাহ, আমাদের তিন বেলা খাবার পাঠিয়ে দিও, আমার মার শাড়িটা অনেক ছেঁড়া, আমার মার জন্য তিনটে শাড়ি পাঠাইও।”

এই চিঠি কেবল কাগজের ওপর পেন্সিলের কিছু আঁচড় ছিল না; এটি ছিল বঙ্গোপসাগরের নোনা তটে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃস্ব, পিতৃহীন, ক্ষুধার্ত শিশুর পরম করুণাময়ের দরবারে পাঠানো আত্মার আর্জি।

শেষ বিকেলের রক্তিম আলো যখন বঙ্গোপসাগরের বুক ছুঁয়ে বিলীন হওয়ার উপক্রম করছিল, তখন মোমেন সৈকতের বালুতে দাঁড়িয়ে বাতাসে ঘুড়িটি উড়িয়ে দিল। লাল-নীল রঙের ঘুড়িটি বাতাসের তোড় পেয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল।

ঘুড়ি যত ওপরে উঠতে থাকে, মোমেনের ছোট হৃদয়টি তত বেশি আনন্দে নেচে ওঠে। সে আনমনে ভাবতে থাকে, তার ঘুড়িটি আকাশে উড়তে উড়তে সোজা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ঘুড়িটি যখন অনেক উঁচুতে উঠে গেল, তখন তার হাতের সুতো শেষ হয়ে এল। মোমেন দৌড়ে আবার দোকানে গেল, পকেটের শেষ সম্বল সেই বাকি ২০ টাকা দিয়ে আরও দুটি সুতোর গোলা কিনে আনল।

নতুন সুতোর মুখে একটি সাধারণ গিট্টু দিয়ে মোমেন আবার ঘুড়ি ওড়াতে শুরু করল। ঘুড়ি উঁচুতে উঠতে উঠতে আকাশের নীলিমায় মিশে যেতে লাগল। মোমেন মনে মনে হাসছিল। সে চিন্তা করছিল, আর মাত্র কিছুক্ষণ! ঘুড়িটা আল্লাহর হাতে পৌঁছালেই আর তাদের কোনো অভাব থাকবে না। চাল আসবে, দুধ আসবে, আর মায়ের ছেঁড়া শাড়ির বদলে তিনটে নতুন সুন্দর শাড়ি আসবে!

কিন্তু উপকূলীয় সামুদ্রিক বাতাস ক্ষণে ক্ষণে তার মেজাজ বদলায়। সন্ধ্যার আঁধার ঘন হয়ে আসার সাথে সাথে সমুদ্রের গভীর থেকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রলয়ঙ্করী হাওয়ার ঝাপটা এসে পড়ল। মোমেনের হাত থেকে লাটাই সজোরে টান খেল।

বাতাসের সেই তীব্র টানে ঘুড়ির সুতোর কাঁচা গিট্টুটি এক লহমায় খুলে গেল!

মোমেন হা করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল। সুতোকাটা লাল-নীল ঘুড়িটি মুক্ত বাতাসে গোল হয়ে চক্কর খেতে খেতে গোধূলির আলো পেরিয়ে অসীম অন্ধকার সাগরের দিকে ভেসে চলে গেল।

হাত থেকে কাঠের লাটাইটা বালুতে পড়ে গেল। মোমেন দুই হাঁটুর ভেতর মুখ গুঁজে নিঃসঙ্গ সৈকতে বসে পড়ল। সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল তার বুকফাটা বিলাপ। সে অসীম অন্ধকারের দিকে হাত তুলে পরম হতাশায় ফিসফিস করে বলল,

“আল্লাহর কাছে আমি চিঠিটা পাঠাইতে পারলাম না...”

রাত গভীর হলে বিষণ্ণ ও বিধ্বস্ত মোমেন ঘরের দিকে পা বাড়াল। ঘরের ভেতরে কোনো আলো নেই, অন্ধকার যেন এক বিষাদময় নীরবতা নিয়ে চেপে বসে আছে। মোমেনা তীব্র জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে ছেলের পথ চেয়ে ছটফট করছিল।

মোমেন ঘরে ঢুকে কোনো কথা না বলে অসুস্থ মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মোমেনা তার ফ্যাকাশে, বরফের মতো ঠাণ্ডা হাত দুটো বাড়িয়ে ছেলেকে বুকের গভীরে টেনে নেয়। অন্ধকারের মধ্যেই মায়ের চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল গড়িয়ে পড়তে থাকে মোমেনের চুলে। হয়তো কোনো অলৌকিক অনুভূতির মাধ্যমে মোমেনা বুঝতে পেরেছিল, এই পৃথিবীতে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তার যাত্রার সময় হয়ে গেছে ওপারে। সে নিবিড় মমতায় ছেলেকে আঁকড়ে ধরে গায়ের সাথে চেপে রেখে কান্না চাপতে লাগল।

অনাহার, মানসিক আঘাত আর ক্লান্তিতে মোমেন মায়ের সেই উনুনহীন ঠাণ্ডা বুকে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঘুমের ঘোরে অবুঝ শিশুটি দেখতে পেল এক স্বর্গীয় অপূর্ব স্বপ্ন:

তাদের জরাজীর্ণ ছনের কুঁড়েঘরটি যেন চোখের সামনে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তার জায়গায় উঠে দাঁড়িয়েছে এক বিশাল, শুভ্র রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের আলো ঝলমলে সুন্দর এক ড্রয়িংরুমে সোনালী সিংহাসনে বসে আছে তার মা মোমেনা। মায়ের গায়ে কোনো জোড়াতালি দেওয়া ছেঁড়া শাড়ি নেই, পরনে অপূর্ব সুতি রাজকীয় পোশাক। মায়ের মুখে কোনো রোগ বা অভাবের কালিমা নেই, সে হাসছে, একেবারে আগের মতো স্বাভাবিক ও অনন্য সুন্দরী রূপ নিয়ে!

আসমানের মেঘমালা চিরে তাদের জন্য নেমে আসছে শত শত সুস্বাদু খাবারের থালা, গ্লাস ভরা খাঁটি দুধ আর নতুন নতুন রেশমি শাড়ি। মোমেন রাজপ্রাসাদের মেঝেতে বসে হাততালি দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠছে, “মা! মা দ্যাখো! আল্লাহ আমাদের চিঠি পাইয়া গেছে! আমাদের আর কোনো অভাব নাই মা!”

কিন্তু স্বপ্নের সেই মায়াবী রাজপ্রাসাদ ভোরের প্রথম আলোর সাথে সাথে মিলিয়ে যেতে সময় নিল না।

ভোরের সূর্য যখন বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে উঠল, তখন মোমেনাদের ভাঙা টিনের চালের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে সূর্যের একটি তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল মোমেনার নিষ্পন্দ ফ্যাকাশে মুখের ওপর।

মোমেন ঘুমের ঘোরে হাসতে হাসতে চোখ মেলল। আনন্দিত কণ্ঠে ডেকে উঠল, “মা! মা ওঠো! দ্যাখো সকাল হইয়া গেছে! কাল রাতে আমি কত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছি মা... আমাদের আর কোনো কষ্ট নাই!”

কিন্তু মোমেনা কোনো কথা বলল না।

মোমেন অধৈর্য হয়ে মায়ের গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিতে গেল। স্পর্শ করতেই তার হাত থমকে গেল। মায়ের গা বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা, শরীর শক্ত হয়ে জমে গেছে। মোমেনা আর এই পৃথিবীতে নেই। ক্ষুধা, চিকিৎসা আর অনাহারের যাতনা সইতে না পেরে সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য চলে গেছে ওপারে, যেখানে কোনো শাড়ি ছেঁড়ার অপমান নেই, চুলায় আগুন না জ্বলার কোনো হাহাকার নেই।

অবুঝ মোমেন প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না। সে মায়ের বুকের ওপর মাথা রেখে ধাক্কা দিতে লাগল, “মা কথা বলতেছ না কেন? মা ওঠো না... আমার খুব ক্ষুধা লাগছে...”

চালে জমা থাকা শিশিরবিন্দু টিনের ছিদ্র দিয়ে গড়িয়ে এসে মোমেনার নিষ্প্রাণ চোখের কোণে পড়ল, যেন মনে হচ্ছিল মৃত মোমেনাও বিদায়বেলায় এক ফোঁটা অশ্রু ফেলে গেছে। আর বাইরে, চিরকালের মতো বঙ্গোপসাগরের বিশাল তরঙ্গমালা নিরাসক্ত ও নির্মম গর্জনে তটে আছড়ে পড়তে লাগল।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর