প্রকাশিত :  ১৮:২৫
০৬ আগষ্ট ২০২৬

​মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধে থমকে যাওয়া বাজার: সূচকের পতনের আড়ালে যে বার্তা

​মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধে থমকে যাওয়া বাজার: সূচকের পতনের আড়ালে যে বার্তা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

​পুঁজিবাজারের প্রতিটি উত্থান যেমন আশার জন্ম দেয়, তেমনি প্রতিটি সংশোধন বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলে, বাজার কখনোই একমুখী পথে চলে না। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মাঝেও একসময় বিরতি আসে, আবার সেই বিরতির মধ্য থেকেই পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হয়। বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন অনেকটা সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

​দিনের শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রধান সূচক দ্রুত এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে ডিএসইএক্স ৫,৯০০ পয়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সীমা স্পর্শ করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। অনেকেরই মনে হয়েছিল, হয়তো বাজার এবার নতুন এক ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বেশিক্ষণ টেকেনি। দিনের দ্বিতীয় ভাগে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। বিক্রেতাদের চাপ বাড়তে থাকায় মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত দিনের শুরুতে অর্জিত পুরো অগ্রগতি হারিয়ে সূচক ৩৩.২ পয়েন্ট কমে ৫,৮৬১ পয়েন্টে লেনদেন শেষ করে।

​এ ধরনের ঘটনা পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক নয়, বরং এটি বাজারের স্বাভাবিক আচরণেরই অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পতন কি কেবল প্রযুক্তিগত সংশোধন, নাকি এর ভেতরে আরও গভীর কোনো সংকেত লুকিয়ে আছে?

​প্রথমেই আসে ৫,৯০০ পয়েন্টের বিষয়। পুঁজিবাজারে কিছু নির্দিষ্ট স্তর কেবল সংখ্যাগত নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এসব স্তরকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে সূচক যখন এমন কোনো সীমার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন অনেকেই মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য শেয়ার বিক্রি করে দেন। আবার নতুন বিনিয়োগকারীদের একাংশ অপেক্ষা করেন, বাজার সেই বাধা অতিক্রম করতে পারে কি না তা দেখার জন্য। এর ফলেই ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।

​বৃহস্পতিবারের লেনদেনে ঠিক সেটিই ঘটেছে। কয়েক দিনের ধারাবাহিক উত্থানের পর বাজার এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছিল, যেখানে অনেক স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারী লাভ তুলে নেওয়াকেই নিরাপদ মনে করেছেন। ফলে বিক্রির চাপ দ্রুত বেড়েছে। এই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্রয়চাহিদা তৈরি না হওয়ায় সূচক নিম্নমুখী হয়েছে।

​তবে বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতাও বাজারকে প্রভাবিত করছে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। এটি উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কর্পোরেট মুনাফার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো এই চাপ আরও বেশি অনুভব করছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে বিক্রি কমে, ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রতিফলন দেখা যায় কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে। বিনিয়োগকারীরা তাই আগাম সেই ঝুঁকির হিসাব কষছেন।

​এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এমন পরিস্থিতির প্রভাব দ্রুত অনুভূত হয়। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। ফলে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই আরও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেন।

​এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নীতিগত সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতিতে তারল্য বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। স্বাভাবিক সময়ে এমন সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু মুদ্রানীতির ইতিবাচক বার্তা তখনই কার্যকর হয়, যখন বাস্তব অর্থনীতির অন্যান্য সূচকও শক্তিশালী থাকে। শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে কিংবা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়লে শুধু সুদের হার কমিয়ে বাজারকে দীর্ঘ সময় চাঙ্গা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

​বৃহস্পতিবারের লেনদেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর ভূমিকা। ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, বিএসআরএম স্টিলস এবং অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিক্রির চাপ সূচকের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। এই কোম্পানিগুলোর বাজারমূলধন বেশি হওয়ায় তাদের শেয়ারের দামে সামান্য পরিবর্তনও পুরো সূচককে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। ফলে অনেক সময় সূচকের পতন দেখে বাজারের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

​প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভাষায় দিনের ক্যান্ডেলটি ক্রেতাদের দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়। দিনের শুরুতে সূচক সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠলেও সেই অবস্থান ধরে রাখতে না পারা সাধারণত বিক্রেতাদের শক্তিশালী উপস্থিতিরই প্রতিফলন। একই সঙ্গে আপেক্ষিক শক্তি সূচক বা আরএসআই (RSI) কিছুটা নিচের দিকে নেমেছে, যা ক্রয়চাপ কমার ইঙ্গিত বহন করে। তবে এটিকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রবণতার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ বাজার এখনও তার মধ্যমেয়াদি গড় অবস্থানের ওপরে রয়েছে।

​আরও একটি বিষয় আশাব্যঞ্জক; সূচক কমলেও লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। মোট লেনদেন প্রায় ১,১৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের দিনের তুলনায় বেশি। সাধারণভাবে পতনের দিনে লেনদেন বেড়ে যাওয়া দুই ধরনের ইঙ্গিত দেয়। একদিকে কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষাকৃত কম দামে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার সংগ্রহ করছেন। অর্থাৎ বাজারে এখনও অংশগ্রহণের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

​খাতভিত্তিক চিত্রও একই ধরনের মিশ্র বার্তা দিয়েছে। বস্ত্র ও সাধারণ বিমা খাতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিমা খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে দেখা গেছে। কিন্তু সামগ্রিক বাজারে বিক্রির চাপ এতটাই প্রবল ছিল যে, সেই ইতিবাচক প্রবণতা পুরো বাজারকে টেনে তুলতে পারেনি। অন্যদিকে মিউচুয়াল ফান্ড, সেবা এবং খাদ্য খাতে দরপতন বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানেরই প্রতিফলন।

​এখন সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাজার কোন পথে যাবে?

​এর উত্তর নির্ভর করবে আগামী কয়েকটি লেনদেন সেশনের ওপর। যদি ৫,৮২০ থেকে ৫,৮৩০ পয়েন্টের সহায়ক (Support) অঞ্চল অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে বাজার আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। সে ক্ষেত্রে ৫,৯০০ পয়েন্টের বাধা পুনরায় পরীক্ষা করা হতে পারে। কিন্তু এই স্তর ভেঙে গেলে সূচক আরও নিচে নেমে ৫,৭৫০ থেকে ৫,৭৮০ পয়েন্টের দিকে যেতে পারে। তাই আগামী কয়েকটি সেশন শুধু দৈনন্দিন ওঠানামার জন্য নয়, বাজারের মধ্যমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

​তবে পুঁজিবাজারের ইতিহাস একটি শিক্ষা বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা কখনোই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একমাত্র নির্দেশক নয়। যেসব বিনিয়োগকারী গুজব, আবেগ কিংবা সাময়িক আতঙ্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়েন। বিপরীতে যাঁরা কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি, ব্যবস্থাপনা, নগদ প্রবাহ, আয় বৃদ্ধির সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাই তুলনামূলক ভালো ফল পান।

​বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও বিকাশমান। এখানে অস্থিরতা থাকবে, সংশোধনও আসবে। কিন্তু প্রতিটি সংশোধনের ভেতরেই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন।

​বৃহস্পতিবারের দরপতন তাই আতঙ্কের নয়, বরং সতর্ক হওয়ার বার্তা। বাজার হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মোড় থেকে কোন পথে যাত্রা শুরু হবে, তার উত্তর মিলবে খুব শিগগিরই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে উঠবে তখনই, যখন শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানি, স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা একই স্রোতে মিলিত হবে। পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত সেই আস্থার ওপরই নির্ভর করবে।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর